Wednesday, May 13, 2009
পিছন ফিরে দেখা ১৯৭১:বিদেশী সংবাদপত্রে ১৩ই মার্চ (দি ইকোনমিস্ট)
প্রকাশকাল: ১৩ মার্চ, ১৯৭১
অনুবাদ করেছেন: ফাহমিদুল হক
শিরোনাম ছিল: প্রান্তসীমায় টলমল
এই সপ্তাহের শুরুতে ঢাকার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবার সঙ্গে সঙ্গে এখানে অবস্থিত প্রবাসী নাগরিকেরা তাদের ব্যাগ গোছানো শুরু করে দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারসহ অন্য অনেক দেশ তার দেশের নাগরিকদের অতি প্রয়োজন ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন সামরিক শাসন পুনঃপ্রয়োগের ফলে সৃষ্ট দাঙ্গা বোধহয় শেষ হলো। কিন্তু বিদেশীরা মনে করছেন এই শান্ত অবস্থা হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবারই পূর্বলক্ষণ।
এটা সত্যি যে গত রোববারে (৭ মার্চ) শেখ মুজিবের পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার যে ‘ঐতিহাসিক ঘোষণা’ দেবার কথা ছিল তা তিনি দেন নি। ইয়াহিয়া খান রোববার কঠোরভাবে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন যে তিনি বা তার সেনাবাহিনী এরকম কোনো ঘোষণাকে সহ্য করবে না, সম্ভবত সেই সতর্কবাণী তাকে ওরকম ঘোষণা দেয়া থেকে বিরত রাখে। কিন্তু শেখ মুজিব এরপরই কাজের কাজটি করলেন। প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চে আইনসভার অধিবেশনের যে তারিখ ঘোষণা করেন, তার প্রত্যুত্তরে মুজিব জানান যে তিনি বা তার আওয়ামী লীগ অধিবেশনে যোগ দেবে না যদি না চারটি শর্ত মানা হয়। এরমধ্যে দু-টি শর্ত হলো যত দ্রুত সম্ভব সামরিক শাসন উঠিয়ে নিতে হবে এবং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে — যে-শর্তগুলো প্রেসিডেন্টের মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খুব শিগগীরই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন, এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এটাই হয়তো মুজিবের সঙ্গে তার শেষ আলোচনা।
পশ্চিম পাকিস্তানের মি. জুলফিকার আলি ভুট্টো অবশেষে কোনো রকম পূর্বশর্ত ছাড়াই যে ২৫ মার্চের অধিবেশনে বসতে রাজি হয়েছেন, এখন তার সামান্যই মূল্য রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসনের প্রভাব মুজিবকে একটি নতুন জমিনে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। এমনকি তিনি অপেক্ষাকৃত ধীরে ধীরে সামনে এগুচ্ছেন বলতে হবে, তার আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে যেসব চরমপন্থী লোক রয়েছেন তারা শনিবার রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব আপাতভাবে আট ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন তাদের এটা বোঝাতে যে, প্রেসিডেন্ট নতুন তারিখের যে-প্রস্তাব দিয়েছেন তার তা গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু তিনি অবশ্যই সেক্ষেত্রে শক্ত শর্ত দেবেন।
ঢাকার মতোই কিছু পদক্ষেপ অন্যান্য শহর থেকে এসেছে — কিন্তু এতে সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ দেবার কিছু নেই। তারা ঢাকা ও অন্যান্য শহর পরিচালনার দায়িত্ব একরকম মুজিবের হাতেই যেন ছেড়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা ছয় দফার প্রতীক ছয়টি রূপালি তকমা-বিশিষ্ট সবুজ টুপি পরে ‘শান্তি রক্ষা’-র কাজ করছে যা পুলিশের চেয়েও ভালো কাজে দিচ্ছে। গত সপ্তাহে পাঁচ দিনের সর্বাত্মক ধর্মঘট মুজিবের জন্য বিরাট সাফল্য ছিল। রোববারে তিনি এ সপ্তাহের প্রতিরোধ-কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে আছে রাজস্ব প্রদান না করা, সরকারী অফিস-আদালত-স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা এবং সব ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন করা। তিনি হুমকি দেন যে নতুন সর্বাত্মক ধর্মঘটের মাধ্যমে তিনি এই কর্মসূচিকে সম্প্রসারিত করবেন।
এখন পর্যন্তও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসনের কল্পব্যবস্থা বজায় রাখতে চান। যাত্রীপরিবাহী বিমানগুলোর মাধ্যমে তিনি ঢাকায় সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে চলেছেন এবং ট্যাংকগুলোতে চাকা লাগিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে রাজপথে লড়াই করার জন্য। কিন্তু জনগণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তা থেকে এটা বোঝা কঠিন যে শেখ মুজিব কীভাবে অহিংস নীতি কার্যকর করবেন। প্রেসিডেন্টের জন্য বাস্তবানুগ ভাবনা এটা হতে পারে যে এই মুহূর্তেই শেখ মুজিবের সঙ্গে একটি রফা করে ফেলা, কারণ কেবল তিনিই স্বাধীনতার ঘোষণাকে আটকে রেখেছেন।
তাহলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কী মেনে নেবেন? আইনসভা অধিবেশনে যোগ দেবার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের বেঁধে দেয়া চারটি শর্তের মধ্যে দু-টি সহজেই মেনে নেয়া যায়। সেগুলো হলো সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনা এবং গত সপ্তাহের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করা। সেনাবাহিনী ব্যারাকে থেকেও এখন যে কাজ করছে তা চালিয়ে নিতে পারবে এবং তদন্তের ফলাফল হয়তো তাদের জন্য খুব খারাপ কিছু হবে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সরকারীভাবে সামরিক শাসন উঠিয়ে নেয়া এবং নির্বাচিত বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। সামরিক শাসন পুরোপুরি ওঠানো সম্ভব নয় যতক্ষণ না তার বিকল্প কিছু দাঁড়াচ্ছে এবং যতক্ষণ না কোনো প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়াচ্ছে, বেসামরিক সরকার ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসন চালাতে পারবে না। কিন্তু এই কাজটা আইনসভা অধিবেশন না বসা পর্যন্ত প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। যত দ্রুত অধিবেশন বসবে তত দ্রুত এই কাজটা সমাধা করা যায়।
এর ফলে নতুন আইনসভা সার্বভৌম একটি প্রতিষ্ঠান হবে এবং নতুন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ভেটো দেবার মতা বিলোপ করবে; কিন্তু সেই ক্ষমতা ইতোমধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে কারণ শেখ মুজিব খুব সহজেই এমনকি সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করতে পারেন। পূর্ব পাকিস্তানের ছয় দফা পরিকল্পনা তখন নতুন সংবিধানে প্রায় নিশ্চিতভাবেই লিখিত হবে। এই ধরনের শিথিল ফেডারেশন — যেমন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মনে করেন — পাকিস্তানের সমাপ্তি ঘটাবে; কিন্তু একমাত্র বাস্তবানুগ বিকল্প হলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা। যদি প্রেসিডেন্ট পূর্ব পাকিস্তানে বলপূর্বক দমনপ্রক্রিয়া চালান তবে তাতে সফল হবার সামান্যই সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তার জাতির উদ্দেশ্যে শনিবারে দেয়া ভাষণে তিনি সেই পথেই যাবেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি যদি তা করেন তবে এই কমনওয়েলথভুক্ত দেশটিতে নতুন একটি গৃহযুদ্ধের সূচনা হবে যা বিশেষত ব্রিটেনের জন্য সমস্যাজনক হয়ে দেখা দেবে। পাকিস্তানের সঙ্গে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অন্য খাতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বায়াফ্রার যুদ্ধে ব্রিটেন নাইজেরিয়ার সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল যেগুলো বিচ্ছিন্নতবাদীদের নির্মূল করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধকে কেন ব্রিটেনের ভিন্নভাবে দেখা উচিত তার কারণ রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান এমন এলাকা যার সীমান্ত ইতোমধ্যে রয়েছে। বায়াফ্রার জন্য দাবিকৃত ভূখণ্ডে জেনারেল ওজুকুর যে-সমর্থন ছিল শেখ মুজিবের তার চাইতে অনেক বেশি সমর্থন রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের ৭০ মিলিয়ন বাঙালিরা কেবল পশ্চিম পাকিস্তানীদের থেকে সাংস্কৃতিকভাবেই আলাদা নয়, তারা কেবল আত্মসচেতন ও দৃঢ়চেতা জাতি হিসেবেই বিকাশ লাভ করে নি, পাকিস্তানের পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কোনো ব্রিটিশ সরকারেরই উচিত হবে না, পাকিস্তানের সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধে অংশ নেয়া — আর ব্রিটেন পাকিস্তানের মূল অস্ত্রসরবরাহকারীও নয়।
উবানের চোখে মুজিববাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনী
নিকট ইতিহাস
উবানের চোখে মুজিববাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনী
মাহমুদ হাসান
প্রাসঙ্গিক অধ্যায়টি এভাবে শুরু করেছেন মেজর জেনারেল উবান, 'কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চিফ অফ স্টাফ এবং সে-পদমর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও প্রধান৷ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানী সামরিক কতর্ৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাদেরকে প্রয়োগ করার ব্যবস্থাদি সম্পর্কে অস্থায়ী সরকারকে পরামর্শ দিতেন৷ পরবতর্ীকালে ভারত সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কর্নেল ওসমানী তখন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জি.ও.সি. লেফটেনান্ট জেনারেল জে. এস. অরোরার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোর তত্ত্বাবধান করতেন৷'
বলাবাহুল্য এ সমস্ত ঘটনা ঘটে ১৯৭১-এর ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হবার পর৷
উবান অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের বাহিনীতে বাছাই করে নেবার পদ্ধতি যুক্তিযুক্ত ছিল না৷ উবান লিখেছেন, 'এ সময় হাজার হাজার তরুণ-যুবা প্রশিক্ষণ নিতে আসছিল৷ কিন্তু প্রশিক্ষণাথর্ীদের সবার উদ্দেশ্য এবং আন্তরিকতা যাচাই করার কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা ছিল না৷ অস্থায়ী সরকার কতর্ৃক নিয়োজিত জাতীয় পরিষদ সদস্যদের (এম এন এ) দেওয়া সার্টিফিকেটের উপর প্রশিক্ষণাথর্ীদের অকৃত্রিমতা সম্পর্কে ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোকে নির্ভর করতে হতো৷ এম এন এ-রা বাঙালী অফিসারদের প্রস্তুত করা তালিকা অনুযায়ী অন্ধভাবে সার্টিফিকেট দিতেন, এদের কারো কারো ভিতর ছিল পরিকল্পিত কিছু ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য৷ ফলে কয়েকটা দল অস্ত্রসমেত বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উধাও হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ অস্ত্র লুকিয়ে রেখে ফিরে এসে রিপোর্ট করে যে, শত্রুর আক্রমণে অস্ত্র বেদখল হয়ে গেছে৷ এই অশুভ তত্পরতা নিমর্ূল করার জন্য একটা নিশ্ছিদ্র সমাধান বাতলানো হয়, কিন্তু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় নি, কারণ পদমর্যাদার কারণে তাঁরা তাঁদের জ্ঞানকেও উন্নততর মনে করতেন৷'
এ সময়ে দৃশ্যপটে আবিভর্ূত হলেন মুজিব বাহিনীর চারজন স্রষ্টা৷ অবস্থার পুরো সুযোগ তাঁরা গ্রহণ করলেন এবং পরিস্থিতিকে তাদের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করলেন৷ এই নেতাদের সঙ্গে এভাবে পাঠককে পরিচিত করান উবান, 'এই গোলযোগপূর্ণ সময়ে আমরা কয়েকজন উত্সগর্ীকৃত যুবনেতার সাক্ষাত্ পাই যাদের নাম বাংলাদেশে সুপরিচিত ছিল৷' মেজর জেনারেল উবান এদের সম্পর্কে অতিউচ্চ ধারণা পোষণ করেন, 'এদেরকে প্রেরণাময় মরণপণ অঙ্গীকার আবদ্ধ মনে হল৷' এবং উবানের মতো 'সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, এঁদের নেতৃত্ব বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গ্রহণযোগ্য৷ দুর্ভাগ্যজনক হল অস্থায়ী সরকারের ভেতর এদের এরকম কোনো মর্যাদা মেনে নেওয়ার মত মনোভাব ছিল না৷ সরকার চাইছিলেন এদের, মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বের অধীনে রেখে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ করাতে৷' কিন্তু চার যুবনেতা মোটেই তা চান নি৷ "মুজিবের প্রতি এঁদের একনিষ্ঠ আনুগত্য এবং তাঁর সঙ্গে নৈকট্যের কারণে এঁরা 'মুজিববাহিনী' হিসেবে পরিচিত হতে অধিকতর আগ্রহী ছিলেন৷ ওরা এঁদের পুরনো সহকমর্ীদের বাছাই করে তাদের অকৃত্রিমতা সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিচ্ছিলেন৷ বাংলাদেশের ভিতর থেকে যথেষ্ট ত্যাগী, দৃঢ়চেতা এবং বিশ্বস্ত লোকদের এঁরা বাছাই করে এনে চাপ দিতেই থাকে যাতে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যেরকম কমান্ডো ট্রেনিং পাচ্ছিল তার বদলে এই দলকে যেন অপ্রথাগত যুদ্ধের আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷"
আসল জিনিসটি এখানে স্পষ্ট৷ যুবনেতারা চাইছিলেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব৷ এবং কোন্দল ছিল এই নেতৃত্ব নিয়েই৷ তবে মতানৈক্য একদিনেইত হয় নি৷ আগে থেকেই চলছিল৷ মনে হয় না উবান পুরো জিনিসটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন৷ মুজিববাদী ও মুজিববাদ-বিরোধী আওয়ামীদের ভেতর দ্বন্দ্ব তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেশ ও জাতির চরম মুহূর্তেও দেশের মানুষ এই দলাদলির হাত থেকে নিষ্কৃতি পায় নি৷ মুজিব নিজে মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে সংগ্রামে উপস্থিত ছিলেন না৷
এবার আবার আমরা ফিরে আসি আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে, মুজিব বাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনীর আলোচনায়৷ মুজিব নিজে মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর উপস্থিত না থাকলেও তাঁর ভক্ত ও সুযোগ্য অনুগামীরা ছিলেন৷ পক্ষান্তরে তাজউদ্দিন ছিলেন অন্য রকম৷ চার যুব নেতা তা জানতেন এবং এজন্য তাজউদ্দিনের প্রতি তাঁদের আস্থা ছিল না৷ তাজউদ্দিনকে তাঁরা শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করতেন৷ মুজিবও তাই মনে করা শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর দেশে ফিরে৷ যার ফলে প্রথম সুযোগেই মুজিব তাজউদ্দিনকে তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করেন৷ তিনি অজুহাত দেখিয়েছিলেন তাজউদ্দিনের ভারত-প্রীতির৷ আসল কারণ ছিল ভিন্ন৷ মুক্তি-সংগ্রামে হাটে-মাঠে-ঘাটে কাজ-করা কমর্ী তাজউদ্দিনের মুখোমুখি দাঁড়াতে অসুবিধা বোধ করছিলেন শেখ মুজিব৷ মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যক্ষভাবে জানত সহযোদ্ধা তাজউদ্দিনকে, শেখ মুজিবকে নয়৷
মুজিবের অবর্তমানে ১৯৭১-এর সমরাঙ্গনে মুজিবের লাঠি হাতে তুলে নেন মুজিব বাহিনীর চার যুব নেতা৷ তাঁরা কেবল তাজউদ্দিন-বিরোধী ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ওসমানী-বিরোধীও৷ অস্থায়ী সরকারকেও তাঁরা সুনজরে দেখতেন না, কেন না তাজউদ্দিন ছিলেন তার প্রধান৷ বরং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি এই চার নেতা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন৷ তাজউদ্দিন ও তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারত সরকার ও জেনারেল অরোরার যে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল চার যুবনেতা তা পছন্দ করতেন না৷ উবান এ-সম্পর্কে লিখেছেন, "যুবনেতারা সবসময় অভিযোগ করছিলেন যে, তাজউদ্দিনের সঙ্গে জেনারেল অরোরার কোনো বিশেষ ধরনের যোগসাজশ আছে, কারণ তারা দুজনই চাপ দিচ্ছিলেন যাতে মুজিববাহিনী তাদের কমান্ডের অধীন থেকে পরিচালিত হয়, তাজউদ্দিনের প্রতি আনুগত্যহীন এই যুবনেতাদের অধীনে নয়৷" এ-বিষয়ে উবান আরো বলেন, 'আমি এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি কিন্তু এর মূল ছিল অতীতের গভীরে, তাই পুরোনো মনোভাব মুছে ফেলার জন্য কিছুই করা যায় নি৷'
যুবনেতারা কিন্তু চুপ করে থাকেন নি৷ মেজর জেনারেল উবানের ভাষ্য অনুযায়ী, "যুবনেতারা যে-কোনোভাবে হোক বয়োজ্যেষ্ঠ এম এন এ এবং এম পি-দের একটা দলকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন এবং তাজউদ্দিনবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালান যে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদটি বেদখল করা হয়েছে, যা তাদের মতে অন্যকারো পাওয়া উচিত ছিল৷ আমার মনে হয় ওরা সৈয়দ নজরুল ইসলামের কথা মনে রেখে এ কথা বলছিল৷ ব্যাপারটা একটা বিশ্রী রূপ নিতে পারতো, যেহেতু যুবনেতারা তাজউদ্দিনকে তাঁর নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে দেওয়ার জন্য পাগলপ্রায় ছিলেন৷ এ পর্যায়ে অস্থায়ী সরকারের মধ্যে একটা ভাঙন পুরো আন্দোলনের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনতে পারতো৷ আমার মনে হয় আমি যুবনেতাদের বোঝাতে সক্ষম হই যে, এ রকম কোনো পদক্ষেপ তাদের মিশনের জন্য বড়ো ধরনের বিপদের ঝুঁকিপূর্ণ, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা-পরবতর্ী সময়ের জন্য আরো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে৷ আমার সঙ্গে তারা একমত হন৷ আমার মনে হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামও এঁদেরকে সাবধান হতে পরামর্শ দেন এবং এভাবেই একটা মারাত্মক রাজনৈতিক হুমকি এড়ানো সম্ভব হয়৷"
আওয়ামী লীগ এবং বিশেষ করে মুজিববাদীরা পাকিস্তানীদের যতটা শত্রু বলে মনে করত তার চেয়ে বোধহয় বেশী শত্রু মনে করত কমিউনিস্টদের_বিশেষ করে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের৷ এ-বিষয়ে উবান বলেন, 'এই চার নেতা আমাদের জানান যে বাংলাদেশে নকশাল বাহিনীর অনুরূপ বহু অবাঞ্ছিত ব্যক্তি (মুক্তিবাহিনীতে ঢুকে) প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাচ্ছে৷ এঁরা সতর্ক করে দেন যে, এসব অস্ত্র পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না, বরং স্বাধীনতার পর নকশাল আন্দোলনের অনুরূপ কিছু করার জন্য বাংলাদেশে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে৷ এরা মুক্তিবাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশের কিছু সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্কিত চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতাদের নামও উল্লেখ করে, যাঁদের অনুমোদনক্রমে বিপুলসংখ্যক কমিউনিস্ট ক্যাডারকে রিক্রুট করে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অস্ত্রসজ্জিত করা হচ্ছিল৷ ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে কতর্ৃপক্ষের গোচরে আনা হয়, তবে ফলাফল ছিল শূন্য৷"
এতে মনে হয় উবানের মত চার যুবনেতাও নিরাশ হয়েছিলেন৷ ভাবতে একটু আশ্চর্যই লাগে৷ কেন না তাজউদ্দিন বা তাঁর সরকার বা ভারত সরকার কমিউনিস্টদেরকে তাদের মোটেই মিত্র বলে মনে করতেন না৷ এজন্য মুজিববাদী নেতাদের সরবরাহকৃত খবরের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ হয়৷ তাছাড়া, কমিউনিস্টরা দেশপ্রেমিক হতে পারবে না কেন? মনে হয় সমস্ত জিনিসটাতে কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের প্রতি মুজিববাদীদের মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে৷
এবার আসা যাক বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মুজিববাহিনী সম্বন্ধে কী মনে করত সে-বিষয়ে৷ এ-ব্যাপারে মেজর জেনারেল উবান লিখেছেন, "বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার, যা বলতে তাজউদ্দিনকেই বোঝাতো, কোনোভাবেই মুজিববাহিনীর নেতাদের সঙ্গে অভিন্নমত পোষণ করতেন না এবং তাদের সব অভিযোগই দেখতেন হালকাভাবে৷ কর্নেল ওসমানী তাঁর সরকারের কাছ থেকেই নির্দেশ গ্রহণ করতেন এবং এই যুবনেতাদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে বন্ধুভাবাপন্ন হলেও মুজিববাহিনী নামের আলাদা কোনো বাহিনী পরিচালনার ব্যাপারটা আগ্রহী ছিলেন না৷ বিশেষ করে যে-বাহিনী তাঁর সার্বিক কমান্ডের অধীনে থাকবে না৷ সামগ্রিক অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জেনারেল আরোরাও ব্যাপারটা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ মুজিববাহিনী সরাসরি তাঁর কমান্ডের অধীনে ছিল না৷"
আর এক দিক থেকেও যুবনেতাদের মনে কমিউনিস্ট-ভীতির একটি নতুন মাত্রা এসে যুক্ত হয়৷ "যুবনেতারা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নকশালপন্থী লোকজনদের গল্পগুজব করতে দেখে৷ শেষোক্তরা হোটেলেই থাকতো বলে মনে হয়৷ যুবনেতারা জানতেন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসনামলে এরাই তাদের শত্রু ছিল৷ মূলত এদের বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা৷ যুবনেতারা বুঝতে পারছিলেন না যে তাঁদের চিহ্নিত শত্রুর সঙ্গে ভারত কেন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে৷ ওঁরা তাই ভুলভাবে এর সারার্থ করেন যে, বাংলাদেশে শক্ত ভিত্তির ওপর একটা কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড় করানোই সরকারের উদ্দেশ্য৷ ওরা বিশ্বস্তসূত্রে এ খবরও পায় যে, মার্কসবাদী কমর্ী ও মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের আলাদা প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে৷" এ-খবর পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে যুবনেতারা উবানের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে বলেন, "আমরা আশা করি নি গত ২৫ বছরে আমাদের অর্জনকে নস্যাত্ করার জন্য আপনারা মার্কসবাদী এবং নকশালীদের ট্রেনিং ও অস্ত্র দেবেন৷" উবান যুবনেতাদের কথায় বিরক্ত হয়ে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যান সেক্রেটারি আর এন কাউলের কাছে৷ কাউল তাঁকে জানান, উবানের ভাষায়, "মওলানা ভাসানীর নকশালীরা অন্য আরেক জায়গায় প্রশিক্ষণরত৷ তাদের আমার হেফাজতে দেওয়া হয় নি কারণ তিনি নিশ্চিত জানতেন যে, এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি আমি (উবান) রক্ষা করবো না এবং যুবনেতারা খুব দ্রুত তাদের খোঁজ পেয়ে যেতো, আর এতে একটা মারাত্মক গোলযোগ সৃষ্টি হতো৷" কাউলের জবাবে বিস্মিত হন উবান৷ উবান এই আবিষ্কারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না৷ কাউল পরে তাঁকে আরো বলেন, "আমরা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করি নি, ওই সরকার ভাসানীর লোকদেরকে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বড়ো ধরনের সম্পদ মনে করে৷ আমরা ওদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করি কীভাবে? তোমার যুবনেতাদেরকে বলো যে, ব্যাপারটা ওরা পছন্দ না করলেও এটা ওদেরকে গিলতে হবে৷ সার্বিক পরিকল্পনায় আমরা ওদেরকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে সমর্থন জানাবো, কিন্তু কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে নয়৷ ওরা যদি ঠিকমত না চলে আমাদের কিছু করার নেই৷ গোল্লায় যাক ওরা৷"
এরপর আরো সতর্ক হয়ে যান মুজিববাদী নেতারা৷ "ওরা ওদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, এমন কি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের কাছেও ওদের গোপন তথ্য প্রকাশ করতেন না৷ তাজউদ্দিনকে ওরা দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করতেন যে, স্বাধীনতার পর তিনি শেখ মুজিবকে সরিয়ে দিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করবেন৷ পরে তাঁরা আমাকে অকপটে বলেন, 'তাজউদ্দিন আপনাদের কমিউনিস্ট মন্ত্রী ডি পি ধরের সঙ্গে একজোট৷ আমরা দুজনের কাউকেই বিশ্বাস করি না৷ আমাদের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ব্যাপারে ওদের কী যে পরিকল্পনা আছে সেটা আপনাদের সরকারও জানে না৷' "
যুবনেতারা অস্থায়ী সরকার বা ঐ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কাউকেও বিশ্বাস করতেন না৷ মেজর জেনারেল উবান জানাচ্ছেন, "ওরা কর্নেল ওসমানীকেও, যিনি তাজউদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিলেন তাঁকেও কোনো তথ্য জানাতো না, অথবা লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকেও নয়, যিনি তাদের বিচারে ধারণাতীত কোনো কারণে ওঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে খেলছেন৷ আমাকে ওঁরা প্রায়ই বলতেন যে জেনারেল অরোরা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তাজউদ্দিনকে প্ররোচিত করছেন এবং চাপ দিচ্ছেন মুজিববাহিনীকে যাতে তাঁর কমান্ডের অধীনস্ত করা হয়৷"
মুজিববাহিনীর নামকরণ নিয়েও একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়৷ অস্থায়ী সরকার বা সামরিক হাই-কমান্ড কেউই এই নাম সমর্থন করছিলেন না৷ ঐ সময় অবস্থার একটা সুযোগ নিয়ে যুবনেতারা 'মুজিববাহিনী' নামটি সামনে নিয়ে আসেন৷ যদিও মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের সীমান্তে ও অভ্যন্তরে চমত্কারভাবে কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তিরস্কারযোগ্য কাজ করে পুরো বাহিনীর জন্য বদনাম কুড়াচ্ছিল৷ তাই, ঐ সুযোগ নিয়ে, যুবনেতারা দৃঢ় মত পোষণ করেন যে ওঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত বাছাই করা গেরিলা নেতাদের বাহিনীর নাম হওয়া উচিত 'মুজিববাহিনী', যাতে তাদেরকে 'মুক্তিবাহিনী' থেকে আলাদা করে চেনা যায়৷ কোনো সন্দেহ নেই মুজিব নামটির প্রতিও তাঁদের ছিল বড় আকর্ষণ৷
উবান যখন এই বিশেষ বাহিনীর নাম 'মুজিববাহিনী' রাখার প্রস্তাব দিলেন তখন তা হাইকমান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো না৷ তাদের মতে, এটা হলে বাংলাদেশের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হবে, এমনকি মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর ভেতরও সম্পর্কের ফাটলও দেখা দিতে পারে৷ যুবনেতারা হাইকমান্ডের এ-সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হলেন না৷
এরপর এল দুই বাহিনীর মধ্যে অভিযান-কর্ম কীভাবে বণ্টন হবে, সে-প্রশ্ন৷ এ-সমস্যার সমাধান করে দিলেন জেনারেল অরোরা৷ তিনি দায়িত্বটা ভাগ করে দিলেন এভাবে৷ সীমান্তের ২০ মাইল ভিতর পর্যন্ত আক্রমণের দায়িত্ব মুক্তিবাহিনীর এবং আরো ভিতরের অঞ্চলের দায়িত্ব মুজিববাহিনীর৷ যুবনেতারাও এটাই চাইছিলেন৷ সুতরাং সেখানে মতবিরোধ হল না৷ তবে অরোরা চাইছিলেন মুজিববাহিনী তাঁর কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হোক, কিন্তু ওঁরা তা মেনে নিচ্ছিলেন না৷ এভাবে আমরা দেখতে পাই মুজিববাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনী, মুজিব বনাম তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বকে!
উবান তাঁর বইটির প্রাসঙ্গিক অধ্যায়টি শেষ করেন এভাবে, "বাংলাদেশ এখন মুক্ত৷ ত্যাগী নেতা তাজউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রিত্বে অস্থায়ী সরকার ঢাকায় পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছে৷ বাংলাদেশের নবীন সরকার সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দেয়৷ সর্বপ্রথম যাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে বলা হলো তারা হচ্ছে মুজিববাহিনীর যুবকেরা৷ শেখ মণি এ ব্যাপারে খুব ক্ষেপে গেলেন৷ তাজউদ্দিন কতর্ৃক গৃহীত নীতি সম্পর্কে তিনি আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন, যা তাঁর মতে তাজউদ্দিনের ক্ষমতায় থেকে যাওয়া এবং একটা বামপন্থী বাহিনী তৈরি করা৷ এমনকি তিনি আমাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের করিডোরে মাথায় কালো কাপড় বাঁধা সশস্ত্র কমিউনিস্ট যুবকদের দেখান৷ অস্ত্রসমর্পণের ব্যাপারে আমি শ্রী ডি পি ধর এবং শেখ মণির মধ্যকার এক তপ্ত বাদানুবাদের সাক্ষী হই৷ মণি শ্রী ধরকে বলেন যে, 'ঢাকায় শেখ মুজিবের উপস্থিতির আগে তারা কিছুতেই অস্ত্র ত্যাগ করবেন না এবং প্রয়োজনে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবেন৷' "
১৯৭২-এর ১০ই জানুয়ারী শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে এলে মুজিববাদীরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে৷ মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দিন বহিষ্কৃত হন৷ ওসমানী বাংলাদেশ আর্মি থেকে সরে আসেন৷ শেখ মুজিব তাঁর ভক্ত ও উদ্যমী অনুচরবর্গ এবং বাহিনী নিয়ে দেশ চালাতে থাকেন৷ সেই তিন বাহিনী হচ্ছে রক্ষীবাহিনী, যুব লীগ ও লাল বাহিনী৷
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে?
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (১০)
আট)
১৪ মার্চ শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত। অতপর ১৫ মার্চই ইয়াহিয়া খান ঢাকা চলে আসেন এবং ১৬ মার্চ ১১টায় জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিব দেড় ঘন্টা কোন সাহায্যকারী ছাড়া 'রুদ্ধদ্বার' বৈঠক করেন। ১৭ মার্চ একই ভাবে একান্ত বৈঠক হয়- সাহায্যকারী ছাড়া। মুজিব- ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা 'রুদ্ধদ্বার' বৈঠক হয় ১৯ মার্চ শুক্রবার। এ দিন রাতে দুই পক্ষের ৩ জন করে উপদেষ্টা আলাদা বৈঠকে মিলিত হন। পরদিন অথ্যাৎ ২০ মার্চ শনিবার আওয়ামীলীগের ৬ জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী নিয়ে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ১৩০ মিনিট আলোচনা করেন এবং পরে তাঁর বাসভবনে সাংবাদিকদের শেখ মুজিব বলেন, "আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।" তিনি বলেন, "রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে তিনি এগুচ্ছেন।" ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকা আসেন ১২ জন উপদেষ্টা নিয়ে। জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা শেষে সাবংবাদিকদের তিনি বলেন, "সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।" ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেন। এ সংক্রান্ত দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদনটি লক্ষণীয়:
'গতকাল সোমবার ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়া বৈঠক চলাকালে প্রেসিডেন্ট জনসংযোগ অফিসার বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে প্রেসিডেন্টের উপরোক্ত ঘোষণা প্রকাশ করেন।'
অর্থটা পরিষ্কার। আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার সমঝোতার ভিত্তিতেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। লক্ষনীয়, গোলমালটা কিন্তি লেগেছিলো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা নিয়েই। প্রথমবার স্থগিতে ছিল আপত্তি। এবার সম্মতি। একই দিনে জেনারেল ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা হিশাবে আগত বিশিষ্ট আইনজীবী এ কে ব্রোহী লিখিতভাবে মতামত দেন যে, সামরিক আইন প্রত্যাহার ও ক্ষমতা হস্তান্তরে কোন আইনগত বাধা নেই।
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (৯)
পাঁচ)
২ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুব সমাজের পক্ষ থেকে ডাকসু ভিপি আ.স.ম আবদুর রব বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। এই পতাকা উত্তোলনের জন্য শেখ মুজিব ছাত্র নেতাদের যে র্ভৎসনা করেছিলেন- তার প্রত্যক্ষ শ্রোতা ও দর্শক অনেকেই আছেন।
ছয়)
৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্র লীগের জনসভায় ছাত্র লীগের সাধারন সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন। আগে ঘোষণা করা হয়েছিল, এই জনসভার পর শেখ মুজিব মিছিলে নেতৃত্ব দিবেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে বক্তৃতার পর্যায়ে তিনি মিছিল কর্মসূচী বাতিল করেন। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠই তার কারন কি-না, সেটা গবেষনার বিষয়।
সাত)
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব ভাষণ দেন এবং এই প্রথম স্বাধীনতা কথাটি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন: এবাের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। অবশ্য, ভাষণ সমাপ্তিতেই আবার তিনি এর ব্যালান্স করার চেষ্টা করেন- একই সাথে 'জয় বাংলা, জয় পাঞ্জাব, জয় সিন্ধু, জয় বেলুচিস্তান, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় পাকিস্তান' শ্লোগান দিয়ে। (স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস: দলিলপত্র-এ জয় পাঞ্জাব, জয় সিন্ধু, জয় বেলুচিস্তান, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় পাকিস্তান- এ কটি স্লোগানের উল্লেখ নেই। এর রহস্য কি? তবে, সে সময়কার পত্র-পত্রিকা এবং যারা জনসমাবেশে ছিলেন, তারাই সাক্ষ্য দিবেন এ সম্পর্কে।)
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (৮)
চার)
২৮ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, "৬ দফা কারো উপর চাপিয়ে দেয়া হবে না।" (He also reiterated his assurance that six point would not be imposed on any one. (Daily The Dawn, 1 March 1971)। উল্লেখ্য, ডন পত্রিকাটির মালিক হচ্ছে কুখ্যাত ২২ পরিবারের অন্যতম হারুন পরিবার। আরো উল্লেখ্য, এই হারুন পরিবারেরই আর একটি প্রতিষ্ঠান আলা ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে শেখ মুজিব বিনা কাজে কিন্তু মোটা বেতনে একটা চাকরি(!) করতেন।
সে যা-ই হোক, ৬ দফার প্রশ্নে শেখ মুজিবের এই নমনীয়তা কেবল যে এ সংক্রান্ত তাঁর পূর্ববর্তী বক্তব্য কিংবা আন্দোলনকারী শক্তির আশা-আকাংক্ষারই পরিপন্থী, তাই নয়, বরঞ্চ পশ্চিম পাকিস্থানীদের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলারও একটা প্রয়াস এর মধ্যে লক্ষ্য করার মত। অথ্যাৎ, এটা হচ্ছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি বিশেষ।
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (৭)
পাকিস্থান প্রশ্নে শেখ মুজিব
অসংগতি, স্ববিরোধীতা, কথা ও কাজে গরমিল শেখ মুজিবের সমগ্র রাজনৈতিক জীবনেরই একটি বৈশিষ্ট। তবে, আপাতত: একাত্তর থেকেই শুরু করা যাক:
এক)
১৯৭০-এর নির্বাচনের পরে আওয়ামীলীগের পক্ষে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বড় সমাবেশ প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১-এর ৩ জানুয়ারী রমনা রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে। এদিন আওয়ামীলীগের টিকেটে নির্বাচিত জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান শেখ মুজিব। এই শপথের শেষ বাক্যটি ছিল: জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান
(সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান, ৪ জানুয়ারী, ১৯৭১)
দুই)
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে দৈনিক পাকিস্তানের ভাষ্য:
"দেশের সর্বত্র শান্তি-শৃংঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়া মেখ মুজিব গণতান্ত্রিক বিজয়কে সুসংহত করার স্বার্থে সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের দালালদের বাড়াবাড়ি দমনের জন্য দেশবাসীকে সদাপ্রস্তুত থাকার আহবান জানান। তিনি বলেন, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, মহল্লায় মহল্লাহ আওয়ামীলীগ গঠন করুন এবং রাতের অন্ধকারে যাহারা ছোরা মারে তাহাদের খতম করার জন্য প্রস্তুত হোন। রাতের অন্ধকারে যাহারা মানুষ হত্যা করে, সেইসব বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, চোরের মত রাতের অন্ধকারে মানুষ হত্যা করিয়া বিপ্লব হয় না। বিপ্লব চোরের কাজ নয়। সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদের দালালদের খতম করার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের বাঁশের এবং সুন্দরী কাঠের লাঠি বানাইবার পরামর্শ দিয়া শেখ সাহেব বলেন, প্রত্যেকের হাতে আমি হয় বাঁশের নয় সুন্দরী কাঠের লাঠি দেখতে চাই।"
উপরোক্ত দুটো ঘটনার প্রথমটিতে অর্থ্যাৎ শপথে 'জয় পাকিস্তান' শ্লোগান দিয়ে স্টষ্টত তিনি পাকিস্তানের প্রতি তার আনুগত্য অক্ষুন্ন রেখেছেন। দ্বিতীয় ঘটনাটিও এই আনুগত্যেরই বর্ধিতাংশ। কেননা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তথা 'স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা' কায়েমের প্রস্তাব তুলে সশস্ত্র যুদ্ধের কর্মসূচী দিয়েছিল যে বিপ্লবীরা, শেখ মুজিবের কাছে তারা হয়েছেন 'সন্ত্রাসবাদী' ও 'সান্ত্রাসবাদের দালাল' এবং স্বাধীনতাকামী এই সন্ত্রাসবাদীদের 'খতম' করার জন্য বাঁশ ও সুন্দরী কাঠের ব্যাপক আয়োজন করেছেন তিনি।
তিন)
একই ভাষণে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য "ধন্যবাদ" জানান। এ সম্পর্কে ঐদিনের পাকিস্তান অবজারভারের প্রতিবেদন:
Sheikh Muzib thanked President Yahiya for fulfilling his (Yahiya's) commitment in holding the elections. However, he said that there was a section among his (Yahiya's) subordinates who are still conspiring to undo the election results.
বক্তব্যটা পরিষ্কার। নির্বাচনি ফলাফল বাস্তবায়নে অর্থাৎ শেখ মুজিব তথা আওয়ামীলীগের কাছে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খান প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। তার কিছু অধ:স্তন এটা বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে মাত্র। শেখ মুজিবের এ অভিনন্দন যে যথার্থই অভিনন্দন ছিল তার প্রমাণ জেনারেল ইয়াহিয়াও রেখেছেন- ৩ মার্চ ঢাকার জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবানের নির্দেশ দিয়ে (১৩ ফেব্রুয়ারি) এবং মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করে (২২ ফেব্রুয়ারী)।
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (৬)
স্বাধীনতা: গণহত্যা: শেখ মুজিব
স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি আর গণতন্ত্র- এই তিন শাশ্বত আকাংক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ একাত্তরে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সুতরাং এ জাতির পিতৃত্বের দাবিদার কোন নেতার মূল্যায়নের জন্য এ তিনটি বিষয়ে তাঁর অবদান অবশ্যই পর্যালোচনার দাবী রাখে।
অতীত ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসটি যদি ১৯৭১ সালের সমতলে স্থাপন করে বিচার করা হয়, তাহলে, একথা অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধে 'শেখ মুজিব' এই নামটির অসামান্য অবদান রয়েছে। গ্রেফতার বরণ নিয়ে নানা কথা উঠলেও তাঁর 'নাম' তথা তাঁর ভাবমূর্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণা হিশাবে কাজ করেছে। কিন্তু তার পাশাপাশি ব্যাক্তি শেখ মুজিবের ভূমিকা কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রশ্নের উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কেন পারেনি? কারন ঘটনাপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে যে অসংগতি ও স্ববিরোধীতা স্বয়ং শেখ মুজিব তৈরি করে রেখেছেন তার গ্রন্থী উন্মোচিত হয়নি।
একাত্তরের গণহত্যা: আসল নায়ক কে? (5)
এটা ঠিক যে, আওয়ামী লীগের এক বিরাট অংশ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ৬-দফার সঙ্গে আপোষ করে পাকিস্থান রেখেই ক্ষমতায় যাওয়ার পদক্ষেপ গ্রহন করে এবং এক পর্যায়ে আমাদের অজ্ঞাতে শেখ মুজিবকেও তাদের প্রস্তাব মানতে বাধ্য করে। গোলটেবিলের আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্থানের কেন্দ্রে আওয়ামীলীগ ও পিপলস পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠনের সি্দ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত গোপন থাকলেও সেদিন আমরা এই সিদ্ধান্ত জেনে ফেলি। সেদিনই রাত ১০ টায় আমরা কয়েকজন ধানমন্ডির এক বাসায় বৈঠক করি এবং দীর্ঘ আলোচনার পর রাত ১টায় আমরা কোরান স্পর্শ করে শপথ গ্রহণ করি যে, কোন অবস্থাতেই কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে দেব না। যে স্বাধীন বাংলার পতাকা একবার তুলেছি- তা আর নামানো যাবে না। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাত দেড়টায় শেখ মুজিবের বাসভবনে যাই ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে সরাসরি একথাই বলি, আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ না করলে আপনার সাথেও আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।
......... আওয়ামী লীগের সবাই যে পালিয়ে গেছে এটা আমি মনে করি না। বাধ্য হয়েই ভারতে যাওয়ার পর অনেকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে কাজ করেছেন- অনেকেই আবার মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন।
- শাহজাহান সিরাজ
(মুক্তিযুদ্ধকালীন 'স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের' সাধারন সম্পাদক এবং বর্তমান জাসদ (সি) নেতা)
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কে কি বলেন? (২)
আসলে পাকিস্থান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
- তোফায়েল আহমদ
২৫ মার্চ 'ক্রাক ডাউনে'র অনেক আগে থেকেই আমরা অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরি শুরু করি।
- আবদুল মান্নান ভূইয়া
আওয়ামীলীগ নেতৃপৃন্দ দেশকে স্বাধীন করার কোন চিন্তা-ভাবনা করেননি- শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চিন্তা করেছিলেন।
- মেজর (অব:) জলিল
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কোন ব্যাক্তি বা দলের একক অবদান ছিল না।
- আ স ম আবদুর রব
মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামীলীগ দলীয়করন করে ফেলিছিল।
- সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
আওয়ামীলীগের পালানোর প্রস্তুতি ছিল।
- সানজিদা খাতুন
পরিস্থিতি আমাদের যুদ্ধের দিকে এগিয়ে দেয়।
- হাসান ইমাম
২৫ মার্চের আগে পর্যন্ত আওয়ামীলীগ স্বাধীনতাই চায়নি।
- নাসির উদ্দিন ইউসুফ
শিল্পমন্ত্রী থাকাকালে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ১৫শ টাকা চাঁদা গ্রহণের মামলা : আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস
দীনেশ দাস: শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক বাণিজ্য, শিল্প ও শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে এবং সুবিধা দিয়ে ১৫শ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল৷ কিন\’ আদালতের রায়ে তিনি সেই মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান৷
সে সময়ের দুর্নীতি দমন বুরোর দায়ের করা মামলার নথিপত্র অনুসন্ধান করে অভিযোগে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ জেলার সতীহাটিতে ‘আল আমিন ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে একটি কাপড় ক্যালেন্ডারিং কারখানা স্থাপনের জন্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আনওয়ার আলী, হাজী সেকেন্দার আলী ও গোলাম হায়দার চৌধুরী ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে একটি আবদন করেন৷ তারপর তারা ৭ সেপ্টেম্বর ১৫ আব্দুল গণি রোডের সরকারি বাসভবনে গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করে লাইসেন্স প্রদানের অনুরোধ করেন৷ বিনিময়ে তিনি আবেদনকারীদের কাছে আওয়ামী লীগের তহবিলে ১৫শ টাকা চাঁদা দেয়ার এবং তার ভাই শেখ আবু নাসেরকে বিনামূল্যে ৩ আনা মালিকানা দেয়ার দাবি করেন৷ উপায়নত্মর না দেখে আবেদনকারী ১৯৫৭ সালের ২ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কিসত্মিতে সেই টাকা পরিশোধ এবং মালিকানা দলিল প্রদান করেন৷
রাষ্ট্রীয় পদে থেকে এহেন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ আবু নাসের ১৯৪৭ সালের ২ নং আইনের ৫(২) ধারা এবং পাকিসত্মান দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা অনুযায়ী শাসত্মিযোগ্য অপরাধ করেছেন৷ দুর্নীতি দমন বুরো ইন্সপেক্টর আবদুল জলিল বাদী হয়ে ১৯৫৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি রমনা থানায় এজাহার দায়ের করেন এবং বুরোর অপর ইন্সপেক্টর মেহরাব আলী চৌধুরীর তদনত্ম কাজের জন্য ভারপ্রাপ্ত হয়ে একই বছরের ৯ নভেম্বর চার্জশিট দাখিল করেন৷
দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ঢাকা বিভাগের স্পেশাল জজ এএসএম রাশেদ ১৫ জনের সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিচার করে ১৯৬০ সালের ৩১ মে মঙ্গলবার প্রদত্ত এক রায়ে অভিযোগ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ আবু নাসেরকে বেকসুর খালাস দেন৷ মামলায় প্রধান কেঁৗসুলী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী৷ তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, অ্যাডভোকেট জহীরউদ্দিন প্রমুখ৷ বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজউদ্দিন আহমদ৷ তাকে সহায়তা করেন মোয়াজ্জেম হোসেন খান৷
শেখ মুজিব এজেন্সি কন্ট্রোলার নিযুক্ত হওয়ায় আলফা -ইন্সুরেন্সের উদ্দেশ্য তদনত্মের নির্দেশ দেন মুখ্য সচিব
|

দীনেশ দাস: শেখ মুজিবুর রহমান আলফা ইন্সুরেন্সের এজেন্সি কন্ট্রোলার নিযুক্ত হওয়ায় সরকারের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়৷ ফলে তত্কালীন মুখ্য সচিবের নির্দেশে ১৯৬১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এই ইন্সুরেন্সের পূর্ব পাকিসত্মানে ব্যবসায় প্রসার, রাজনৈতিক নেতাদের একচেটিয়া আধিপত্য ও এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে তদনত্ম প্রতিবেদন দিতে বলা হয়৷
নির্দেশ মোতাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ডিআইজি এএমএ কবির ৭ মার্চ ১৯৬১ আড়াই পৃষ্ঠার একটি তদনত্ম প্রতিবেদন দাখিল করেন৷ এতে বলা হয়, ১৯৬০ সালের মার্চে শেখ মুজিবুর রহমান আলফা ইন্সুরেন্সের এজেন্সি কন্ট্রেলার হিসেবে যোগদান করেন৷ ১৯৫২ সালে ১৩৪-৩৫ রাইটার্স চেম্বার, দুনলি রোড, করাচিতে প্রধান কার্যালয় স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়৷ ১৯৬৫ সালে করাচিতে রাজনীতিক ও বিজনেস ম্যাগনেট ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন এর পরিচালক নিযুক্ত হন৷ একই বছর ঢাকার ১২ জিন্নাহ এভিনিউতে-এর একটি শাখা চালু করা হয়৷ তিনি আলফা ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান৷ এই ইন্সুরেন্সে ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোসত্মফা, কুমিল্লার চাঁদপুরের নূরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আজিজ, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকউদ্দিন ভুঁইয়া, নারায়ণগঞ্জের শামসুজ্জোহাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা যুক্ত আছেন৷ তবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই৷ এ ধরনের কোনো যোগসূত্র কখনো দেখা গেলে তা যথাসময়ে জানানো হবে৷
পরে ১৯৬১ সালের ৯ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিসত্মানের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ডিআইজি বরাবর করাচির সিআইডি পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট এম আকরাম শেখ প্রেরিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আলফা ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন মুসলিম লীগের একজন সুপরিচিত নেতা৷ মুসলিম লীগ সরকারের সময় তিনি অস্ট্রিয়ায় পাকিসত্মানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন৷ ১৯৫৩ সালে তিনি মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন৷ ১৯৫৫ সালে তিনি কনভেনশন মুসলিম লীগ আহ্বায়ক ছিলেন৷ এই ইন্সুরেন্সের পরিচালক মালিক বেগ আলী শিয়ালকোটের অধিবাসী৷ ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি হায়দরাবাদ থেকে মাইগ্রেট করে পশ্চিম পাকিসত্মানে চলে আসেন৷ সম্প্রতি সরকার তাকে করাচি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাউন্সিলর মনোনীত করেছে৷ ইব্রাহিম সালেহ মতি এই প্রতিষ্ঠানের একজন অন্যতম পরিচালক৷ তিনিও মাইগ্রেশন করে বোম্বে থেকে পশ্চিম পাকিসত্মানে চলে আসেন৷ সরকার তাকেও করাচি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাউন্সিলর মনোনীত করেছে৷ এই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ পরিচালক আথুর স্কুইরা, তিনিও করাচি সিটি করপোরেশনের সরকার মনোনীত একজন কাউন্সিলর৷ ঘোষণা: আগামীকাল পড়-ন ‘ঢাকা মেডিকেলে গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের বাকবিতণ্ডা’


