Showing posts with label সাদেক খান. Show all posts
Showing posts with label সাদেক খান. Show all posts

Thursday, February 5, 2009

নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের ডাক ও ভূরাজনৈতিক সুড়সুড়ি সাদেক খান

নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের ডাক ও ভূরাজনৈতিক সুড়সুড়ি
সাদেক খান
বিজয় দিবসের পরদিন থেকেই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে ১০ ডিসেম্বর। ১৫ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে তার বিধিবদ্ধ প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। আর সাধারণ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনেই জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশ ২০০৭-এর ৩ নম্বর বিধি বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। তথা, পরদিন ১২ নভেম্বর থেকে সারাদেশে পথসভা-মিছিল মিটিংয়ের ওপর আরোপিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ-নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। চারদলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ঘোষণা দাবি করে চরমপত্র দিয়েছিল। মনোনয়ন প্রত্যাহারের পরদিন থেকেই যাতে অবাধে নির্বাচনী প্রচারাভিযান ও জনসংযোগে লিপ্ত হওয়া যায়, সেজন্য ১২ তারিখ থেকেই জরুরি অবস্থা তুলে নিতে বলেছিল। ওই চরমপত্রের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে ১০ তারিখ রাতে তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সরকারের বাণিজ্য ও শিক্ষা উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ওই ঘোষণা দিয়েছেন। একটু হেরফের করে চারদলীয় জোটের ওই সঙ্গত দাবির সুযুক্তি মেনে নিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল ও জোটেরও চাহিদা পূরণ হয়েছে। ওই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে সব তরফেই নির্বাচনী অভিযানের সাজ সাজ রব শুরু হয়ে গেছে। বকরি ঈদের আমেজ শেষ হতে না হতেই নির্বাচনী মোলাকাত মিছিল-মিটিং সরগরম করে তুলেছে সব মহানগর ও অন্যান্য শহর বন্দরের আবহাওয়া। দেশের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বলছে, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। সুশাসনের নামে সবার গলায় ফাঁস এঁটে অ্যাংলোইন্ডিয়ান এলেমদারির সরকার আর চাই না, সর্বসাধারণের কাছের লোকের সরকার চাই। হুকুমদারি কিংবা হানাহানি, জবরদস্তি, টানাটানি কোনোটাই চাই না, চাই শান্তিপূর্ণ অবাধ নির্বাচন।

বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস, বিজয় দিবস এসব আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি চলেছে নির্বাচন কমিশনের সাথে নির্বাচন প্রার্থিতা বাতিল পুনর্বিবেচনার দরবার বা আদালতে মামলা। আরো চলেছে নেতা-নেত্রীদের ঝটিকা সফর, প্রচারাভিযান। দুই প্রধান দল ও তাদের জোটভুক্ত এবং জোটনিরপেক্ষ কোনো কোনো দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নানা আশাব্যঞ্জক প্রতিশ্রুতি এবং বিরাজমান সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার এসেছে সব ইশতেহারে। বেশির ভাগ ইশতেহারে পরিস্ফুটিত উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গিও প্রায় অভিন্ন। মূলত বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ানির্ভর। প্রতিশ্রুতি পালনের উপায় বা সঙ্গতি সম্পর্কে প্রায় সবাই অস্পষ্ট। তবে বিএনপি’র ইশতেহারে দেয়া অগ্রাধিকার তালিকা তুলনামূলকভাবে সবিশেষ ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য আকারে হাজির করা হয়েছে। যেমন, প্রান্তিক চাষিদের সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ উন্নত জাতের বীজ, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রয়োজনে ভতু�কি দিয়ে হলেও দ্রব্যমূল্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, আইনশৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠা এবং সন্ত্রাস দমনে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা, কঠোর হাতে দুর্নীতি দমন এবং এর উৎস বরে ব্যবস্থা, গণমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার কর্মসূচি গ্রহণ, কর্মসংস্থান বঞ্চিতদের জন্য বেকারভাতা চালু ইত্যাদি। রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারেও বিএনপি ইশতেহারে কিছু সুস্পষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। যেমন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ বাতিল ঘোষণা, শপথ নেয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, সংসদের অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য ৩০ দিনের অধিক অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্যপদ শূন্য ঘোষণা, জাতীয় ইস্যুগুলোতে বিরোধী দলের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার নীতি অনুসরণ করা, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তিকে দলীয় পদ থেকে সাথে সাথে ইস্তফা দেয়ার বাধ্যতা, যথাসময়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা ইত্যাদি।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়েই নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নেয়ার বিষয়ে একই রকম ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ মূলত ২০২০-২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ‘দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে’ সম্ভাব্য উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম একটি দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতির অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন বা ‘ভিশন’ উপস্থাপিত করেছে তার ইশতেহারে এবং খাতওয়ারি লক্ষ্যমাত্রার কাল ও পরিধি নির্দেশ করেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের সময়সীমাকে চিহ্নিত করা হয়েছে যথাক্রমে জাতিরাষ্ট্রের ‘স্থপতি’ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও মুক্তিযুদ্ধাবসানের সুবর্ণজয়ন্তীকে উপলক্ষ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন আমাদের প্রয়োজন’। একরকম তারই অনুকরণে আওয়ামী লীগ ্লোগান দিয়েছে ‘দিন বদলের অঙ্গীকার’। কিভাবে সেই দিন বদলের সাধ্য সাধন হবে সে সম্পর্কে ইশতেহারে সরাসরি কিছু না বলে খাতওয়ারি প্রদত্ত লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে একটা নয়া দারিদ্র্য হ্রাস কৌশলপত্র প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বলেছে, ‘বিশ্বমন্দা এবং জাতীয় সমস্যাবলিকে বিবেচনায় রেখে উল্লিখিত রূপকল্প বা ভিশন ২০২১ সামনে রেখে’ আওয়ামী লীগ তৈরি করবে একটা ‘উপযুক্ত কৌশলপত্র, যার মূলে থাকবে পরিবর্তন বা দিন বদলের অঙ্গীকার। এই কৌশলপত্রে থাকবে দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিত এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা।’
অন্য দিকে বিএনপি’র ্লোগান ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’। অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে থেকেই সংসদীয় রাজনীতি বর্জন করে অবরোধ-হরতাল-মারধরের কর্মসূচি দিয়ে নাশকতার খোরাক জুগিয়ে বৈদেশিক প্ররোচনায় মহাজোটচক্র দুরূহ অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছিল। অন্য দিকে একটা প্রচ্ছন্ন ইন্দো-ইসরাইলি নীলনকশা অবলম্বন করে ঢাকাস্থ ইউরোপীয় মার্কিন জাতিসঙ্ঘ দূতাবাস মহাজোটের তরফে ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এর সাধারণ নির্বাচনে মহাজোটের বয়কটকে সমর্থন দিয়ে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচনে সহায়তা না দিতে সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করেছিল। সে সব সম্পর্কে বিএনপি ইশতেহারে প্রত্যক্ষ কোনো উল্লেখ না থাকলেও ইঙ্গিত আছে জরুরি অবস্থা জারি অপরিহার্য করে তোলার প্রসঙ্গে ‘নির্ধারিত ২২ জানুয়ারি ২০০৭-এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ১১ জানুয়ারি ২০০৭-এ ঘটে যায় কথিত ওয়ান-ইলেভেনের সব ঘটনা। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রেসিডেন্ট পদে থাকলেও জরুরি অবস্থার ছত্রচ্ছায়ায় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। কিন্তু তার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যর্থ হয় সংবিধান মোতাবেক ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে। বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলো চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।’ সেই বিপর্যয় যে সারাদেশের জন্যই একটা চরম দুরবস্থা বয়ে নিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশকে সন্ত্রাসপ্রবণ ব্যর্থরাষ্ট্র প্রতিপন্ন করতে একটা দেশী-বিদেশী শক্তিশালী চক্র যে এখনো তৎপর, এ কথারও ইঙ্গিত এসেছে এভাবেঃ ‘বাংলাদেশে যে একটি অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী ও সহিষ্ণু শান্তিপ্রিয় সমাজ বিরাজ করে আসছে, সেই তথ্য কার্যকরভাবে প্রচার করা হবে। বাংলাদেশকে মৌলবাদী, উগ্রপন্থী, দুর্নীতিপরায়ণ ও সহিংস দেশ রূপে প্রচারের সব অপতৎপরতা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে।’

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ প্রদত্ত খাতওয়ারি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নযোগ্য কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কেতাবি মহলে সুশীলসমাজে সদিচ্ছার প্রতিধ্বনি হিসেবে নন্দিত হয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য সেটাকে কাচের দেয়ালে ভর করে মনোহারী দিবাস্বপ্ন বলেই সাব্যস্ত করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যেমন বলেছেনঃ ‘আওয়ামী লীগের ইশতেহারে না পেয়েছি সামাজিক দর্শনের স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি, না পেয়েছি বিষম অর্থনীতিকে সুষম করার কার্যকর প্রক্রিয়ার বাস্তবসম্মত ইঙ্গিত, না পেয়েছি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যয়দৃঢ় সদিচ্ছা।’ তবে অর্থায়নের (বৈদেশিক?) প্রাক্কলিত সম্ভাব্যতা যাচাই ও সুব্যবস্থার মাধ্যমে ওই দিবাস্বপ্নের কিয়দংশ পূরণও কল্যাণকর হতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অন্য অনেকে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদও বলেছেনঃ ‘আশা করি, আশাজাগানিয়া ঘোষণাপত্রটি যথাযথভাবে প্রাক্কলিত হবে অর্থনৈতিক বিবেচনায় ও অর্থের জোগানের বিষয়ে।’
আওয়ামী লীগের ইশতেহারের একটা বড় অংশে শহীদ জিয়া এবং বেগম জিয়া উভয়ের দীর্ঘ শাসনামলের নানা দিকের তীব্র সমালোচনা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম সংসদকালীন সময়ে ‘বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসন, সরকারি মদদে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নারীনেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মীকে হত্যা, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শাহ এ এম এস কিবরিয়া, শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম ও মমতাজউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের ২১ হাজার নেতাকর্মীর অপমৃত্যু’ ইত্যাদি অভিযোগ বড় করে তুলে ধরে ‘দলীয় রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন’ এবং ‘তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলেই ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তন সঙ্ঘটিত হয়’ বলে দাবি করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের (লাঠি-বৈঠা) আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতায় ‘বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানা সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা, ভুলত্রুটি ও সফলতা নিয়ে প্রায় দুই বছর সময়কাল অতিক্রম করেছে। এই সরকার বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুদক প্রভৃতি পুনর্গঠন করেন। সরকারের আরেকটি ইতিবাচক কাজ হলো ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন। ... সরকার নির্বাচনী আইন এবং প্রক্রিয়ারও উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করে।’

অন্য দিকে অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে ‘আওয়ামী লীগের গডফাদার দৌরাত্ম্য ও দুঃশাসনের বিভীষিকা’ কিংবা মুজিব আমলের ‘গণতন্ত্রবিনাশী’ একদলীয় শাসন ও ‘আজীবন’ প্রেসিডেন্টের নিরঙ্কুশ ‘স্বৈরাচার’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে কোনো পুনরাবৃত্তি, কিংবা জরুরি অবস্থার জনক ‘লাঠি-বৈঠা’ আন্দোলনের বীভৎসতা সম্পর্কেও বিএনপি ইশতেহারে কোনো বিষোদ্‌গার নেই। বরং সন্ত্রাস দমনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণকর কর্মসূচিতে বিএনপি সরকারের কৃতিত্বের বিবরণ দিয়ে চলমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা ব্যর্থতা এবং ‘গত দু্‌ই বছরে মানবাধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত’ হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আরো অঙ্গীকার করা হয়েছে, ‘জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার উদ্যোগ’ গ্রহণ করা হবে।
মেরুকরণের রাজনীতির সাংঘর্ষিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জর্জরিত এ দেশের মানুষ স্বভাবতই যথাসাধ্য ঐকমত্য অনুসরণের ওই প্রতিশ্রুতিতে স্বস্তিবোধ করেছে। একই সাথে বছরের পর বছর ধরে পুশ-ইনের ভারতীয় চাপ, সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ’র নির্বিচার নরহত্যার সন্ত্রাস, সিডর-দুর্যোগের পর খাদ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কার্যত খাদ্যসঙ্কটের পুরো সময়ে ধাপে ধাপে চালের দাম বাড়িয়ে এবং চাল আমদানিতে নানা বাধার সৃষ্টি করে এ দেশের মানুষকে না খেয়ে মারার ভারতীয় ফন্দি, সর্বোপরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতজানু আচরণের সুযোগ নিয়ে কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নানামুখী বৈদেশিক চাপ সৃষ্টি, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বমাধ্যমে নিরন্তর কুৎসা রটনা এবং অনিয়মিত সূত্রে ‘দাদাগিরি’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এই নির্বাচন ‘নিয়ন্ত্রণের কলকাঠি’ নেড়ে বাংলাদেশে একটা পুতুল সরকার বসানোর ভারতীয় প্রচেষ্টা, এসবের দৈনন্দিন তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশবাসীর মনে জাগরূক। তাই বিএনপি’র ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ বলে কাছের ডাকের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ‘পরিবর্তন বা দিন বদলের অঙ্গীকারনামা’ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ভাষায় দিল্লি দুরস্ত (দিল্লি অনেক দূর), কিংবা সহজ কথায় পানসে বলেই সাধারণ ভোটারদের মনে হওয়া স্বাভাবিক।
বস্তুত বাংলাদেশকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বৈদেশিক অপপ্রচার, এমনকি নির্বাচন নিয়ে বৈদেশিক পক্ষপাতিত্ব ও সংশয় সৃষ্টির তথ্যসন্ত্রাস এখনো সমানে চলেছে। দিল্লি প্রেস ক্লাবের গুজবনির্ভর একটা প্রতিবেদনে লন্ডনের দি ইকোনমিস্ট পত্রিকার অনলাইন সংখ্যায় ১১ ডিসেম্বর (অর্থাৎ জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের তারিখ ঘোষণার পর) প্রচার হয়েছেঃ ‘বাংলাদেশে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের লুণ্ঠনকেন্দ্রিক শাসনের অবসানের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রায় দুই বছর পর সেই দুর্নীতিপরায়ণ যুগের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ হলো হাজার হাজার বৈদ্যুতিক খুঁটি রাজপথ আর নোংরা সড়কগুলো জুড়ে ধুলায় ঢাকা পড়ে রয়েছে। সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের কাছ থেকে সেগুলো কিনেছিল। ২০০১-০৬ সময়ে অর্থনীতির আকার এক-চতুর্থাংশ বাড়লেও এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎও নতুনভাবে উৎপাদিত হয়নি। ফলে খুঁটিগুলোর মতো বাংলাদেশীরা এখনো বিদ্যুতের প্রতীক্ষায় রয়েছে।... সেনাবাহিনী দুই প্রধান দলের বংশানুক্রমিক নেতা তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনাকে সরাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।...

তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা না হলেও বাস্তবক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়েই তাদের অনুসারীদের নিয়ে যেকোনো ধরনের শাস্তি থেকে রক্ষাকবচ পেয়েছেন। পশ্চিমা ঋণ ও সাহায্যদাতারা কৌশলে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত করে নির্বাচনে ফিরিয়ে আনার জন্য সেনাবাহিনীকে দুই বছর সময় দিয়েছিল। বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছে না এবং রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছে। আওয়ামী লীগের ওপর শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ রয়ে গেছে এবং মনে হচ্ছে তিনি নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।...

এ সি নিয়েলসেনের পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী ২০০১ সালের ভোটদাতাদের ৩৭ শতাংশ এবার ভিন্ন দলে ভোট দেয়ার কথা বিবেচনা করছেন। গতবার বিএনপি প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছে এমন ব্যক্তিদের বিশাল সংখ্যককে পক্ষে পেয়েছিল। কিন্তু এবার তারা নতুন হওয়া ২ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের কম সংখ্যককেই টানতে পারছে। ...গতকাল নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই নীতিমালা কম গুরুত্ব পাবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সামর্থ� এবং ঘুষ ও প্রতারণার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের কৌশলই প্রাধান্য পাবে। ... নির্বাচনে বিএনপি যদি জয়ী হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ, সম্ভবত সেনাবাহিনীও ফলাফল মেনে নেবে না। জেনারেলরা অবশ্যই খালেদা জিয়ার শাস্তির আতঙ্কে থাকবেন। কারণ তারা আনুগত্য প্রত্যাহার করার কারণেই তার দল ২০০৭ সালের জানুয়ারির নির্বাচন করতে পারেনি। মুক্তির পর চিকিৎসার জন্য দেশত্যাগকারী তারেক রহমানও প্রতিশোধ চাইতে পারেন।’ কী আশ্চর্য উসকানিমূলক বৈদেশিক প্রচারণা!
এ দিকে আঞ্চলিক পটভূমিতে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো অগ্নিগর্ভ। মোম্বাই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ভারত ক্রমাগত বলে চলেছে, পাকিস্তানভিত্তিক সন্দেহজনক সন্ত্রাসীদের দমন ও কাশ্মীরি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর উৎখাত করে ভারতের সন্তুষ্টি বিধান না করলে পাক-ভারত সম্পর্কের কোনো গতি হবে না। পাকিস্তান বলছে, মুম্বাই হামলার তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে পাকিস্তান প্রস্তুত। কিন্তু ভারত কোনো তথ্যপ্রমাণই পাকিস্তানকে দিচ্ছে না বা

পাকিস্তানের সহযোগিতা নিচ্ছে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি বলছেন, ভারতের নিজস্ব তদন্তের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরই পাকিস্তানকে প্রামাণ্য তথ্য প্রদান করা হবে। স্পষ্টত ভারতের সন্দেহ, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পাকিস্তানকে তথ্য দিলে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে এবং তাতে তদন্তের ক্ষতি হতে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাস দমন কমিটির কাছে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্টতার কিছু তথ্যপ্রমাণ দাখিল করে ভারত পাকিস্তানের চার সমাজনেতাকে ব্ল্যাকলিস্ট বা কালো তালিকাভুক্ত করার আবেদন জানিয়ে সফলকাম হয়েছে। ওই চারজন যথাক্রমে নিষিদ্ধ কাশ্মীরি জঙ্গি প্রতিষ্ঠান লস্করে তৈয়বার প্রতিষ্ঠাতা এবং সমগ্র পাকিস্তানে কার্যরত ইসলামি দাতব্য প্রতিষ্ঠান জামিয়াত উদ-দাওয়ার প্রধান হাফিজ মহম্মদ সাঈদ, ওই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মপ্রধান জাকিউর রহমান লকভি, ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আশরাফ এবং ইসলামি দাতব্য কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের ভারতীয় জোগানদার মাহমুদ আহমেদ বাহজিগ।
পাকিস্তান ভারতীয় সন্দেহের নিরসনে ইতঃপূর্বেই জামিয়াত উদ দাওয়ার প্রধান এবং নিষিদ্ধ জাইশে মহম্মদের প্রতিষ্ঠাতাকে গৃহবন্দী করেছিল। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংশ্লিষ্ট ওই কমিটির তরফে জামিয়াত উদ দাওয়ার কালো তালিকাভুক্তির পর পাকিস্তান জামিয়াত উদ দাওয়াকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে এবং দাতব্যকার্যক্রম সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া আজাদ কাশ্মীরে একটি মাদ্রাসায় হানা দিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষক সন্দেহে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এবং জামিয়াত উদ দাওয়ার কিছু কর্মকর্তাসহ ৫০ জনেরও বেশি সন্দেহজনককে গ্রেফতার করেছে। তবে পাকিস্তান সরকার এ কথাও বলে চলেছে যে ভারত-প্রদত্ত ২০ জনের তালিকা মোতাবেক কিংবা পাকিস্তানের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য মোতাবেক গ্রেফতারকৃতদের পাকিস্তানেই জেরা এবং বিচার হবে, পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী সাজা বা খালাস হবে। ভারত ভুল বা তামাদি তথ্য যথেষ্ট যাচাই না করেই অনুমাননির্ভর ধারণা প্রচার করে, এমন ইঙ্গিত করে পাকিস্তান জাতিসঙ্ঘকে জানিয়েছে যে, ছয় বছর আগেই হাজি মহম্মদ আশরাফ মৃত্যুবরণ করেছে। পাকিস্তানি গণমাধ্যমে এমনো দাবি করা হয়েছে যে, মুম্বাইয়ে হামলাকারীদের মধ্যে একমাত্র জীবিত বন্দী আজমল কাসাফকে যে পাকিস্তান থেকে আগত বলে ভারত সরকার দাবি করেছে, তাকে ২০০৬ সালের আগেই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র নেপাল থেকে অবৈধভাবে আটক করে নিয়ে গিয়েছিল। নেপালের উচ্চ আদালতে ওই ‘অপহরণ’ নিয়ে এখনো মামলা বহাল। এখন সেই ভারতে আটক ‘আহত’ কাসাফকে দিয়েই মুম্বাই হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার নাটক সাজানো হয়েছে।

ইতোমধ্যে ক্লিনটন আমলে আফগানিস্তানে মার্কিন বিমান হামলা কিংবা গাজা ও অধীকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলি বিমান হামলার কায়দায় পাকিস্তানে সন্দেহজনক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হামলা সম্ভব কি না সেটা যাচাই করার তাগিদে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একাধিক যুদ্ধবিমান আজাদ কাশ্মীর ও লাহোর সীমান্তে পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছিল বলে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেকোনো ধরনের হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে পাকিস্তান প্রস্তুত। ভারত পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের দায় অস্বীকার করে বলেছে, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের হিসাবের ভুল হয়ে থাকতে পারে। তবে এলাহি ভরসা, উভয়পক্ষের পরমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধনিবারণ ক্ষমতা কাজ করছে। তা ছাড়া রণকৌশলবিদরা এ কথাও কেউ কেউ বলছেন, মুম্বাই হামলার নাগরিক গেরিলা কৌশলগত ব্যাপক ধ্বংস ক্ষমতার দৃষ্টান্ত এটাই প্রমাণ করেছে যে অভিন্ন কৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের জনবহুল দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিবাদের সামরিক মীমাংসা সম্ভব নয়, তাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত না হলেও অনিয়মিত যুদ্ধের বিস্তৃতির মাধ্যমে মীমাংসা আরো অসম্ভব হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা দেবে।
বাংলাদেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই। কোনো রকম অনিয়মিত যুদ্ধে শামিল হয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধানোর প্রবৃত্তিও এ দেশে অনুপস্থিত। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশে যে গণরায় হবে তাকে মেনে নিয়ে ভূরাজনৈতিক বহিঃশক্তিগুলো অপতথ্যের ধূম্রজাল সৃষ্টি এবং আধিপত্যবাদী হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবেন, বাংলাদেশের আত্মোন্নয়নকামী মানুষ সেটাই আশা করে। দেশ বাঁচানোর প্রশ্নে কারো রক্তচক্ষুকে এ দেশবাসী ভয় পায় না।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(সূত্র, নয়া দিগন্ত, ১৯/১২/২০০৮)