বুধবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০০৮
নির্বাচনোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা
০ এ বিজয় সমগ্র জাতির, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসনের বিজয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বিজয়
০ ডেপুটি স্পিকার নেয়া হবে বিরোধী দল থেকে ফ বিরোধীদলের সংখ্যা বিবেচনা না করে একসঙ্গে কাজ করব
।। ফারাজী আজমল হোসেন ।।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দিন বদলের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেছেন, এ বিজয় শুধু আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের নয়, এ বিজয় সমগ্র জাতির, এ বিজয় গণতন্ত্রের। তিনি বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এই বিজয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসনের বিজয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বিজয়। অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের বিজয়। তিনি অতীতের কষ্ট ও সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
মহাজোটের অবিস্মরণীয় বিজয়ের পর গতকাল বুধবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ভাবি প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে কাজ করার আশা ব্যক্ত করে বলেন, আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা অতীতেও যখন সরকারে ছিলাম তখন ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিরোধী দল থেকে দুইজনকে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলাম। নবম সংসদে ডেপুটি স্পীকার এবং আনুপাতিকহারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ বিরোধী দলকে দেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সকল ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলকে আমরা সংখ্যা দিয়ে বিচার করবো না। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদাকে আমরা সমুন্নত রাখবো। বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। উপহার দিতে চাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জনগণ আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু, আর বড় শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। আমাদের দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হবে। এজন্য শিক্ষাই হবে একমাত্র বাহন।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ফসল এই বিজয়। বাংলার জনগণ যে আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের ওপর রেখেছে তার মর্যাদা আমাদের দিতে হবে। অতীতে আমাদের ওপর অনেকেই অনেক অন্যায় করেছে। সে ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। তবে যেহেতু আমরা বিজয় অর্জন করেছি, তাই সবকিছু ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে হবে। সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে সংযত থাকতে হবে। জনগণের সেবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু দারিদ্র্য। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ আমাদের গড়তেই হবে। দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে, মানুষের জীবনমান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির দেশ হিসাবে। আমাদের প্রকৃত বিজয় তখনি হবে যখন আমরা বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞান প্রযুক্তিসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসাবে উন্নত করতে পারবো; আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবো, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারবো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারবো।
নতুন ভোটার যারা প্রথমবারের মত ভোট দিয়েছে তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু আগামী দিনে তাদেরকেই দেশের নেতৃত্ব নিতে হবে, তাই গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নতুন প্রজন্ম দেশকে নতুন রাজনৈতিক চেতনায় এগিয়ে নিয়ে যাবে। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি হিসাবে দেশকে গড়ে তুলতে হবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী স্বত:স্ফূর্তভাবে তাদের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য মা-বোন তথা নারী সমাজকে অভিনন্দন জানান। বাংলার গরীব-দুঃখী মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভয়-ভীতি, প্রলোভন উপেক্ষা করে তারা আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। মহাজোট নেত্রী সকল নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। সীমিত আয়ের মানুষ, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত যারা ভোট দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং যারা তাদের ভোট দেননি তাদেরও ধন্যবাদন জানান একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। তিনি বলেন, আমরা সকলের প্রতি সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। আমাদের সরকার হবে সকলের সরকার। তাই সকলের সহযোগিতা চাই।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে শেখ হাসিনা নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের জন্য প্রথমেই সর্বশক্তিশান আল্লাহতালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট দিয়ে আপনারা আমাদের এক বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আপনাদের ভোটের মর্যাদা যাতে রক্ষণ করতে পারি সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। এই বিশাল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সহযোগিতাও চান তিনি। তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটি ভোটার তালিকা প্রণয়নে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুলিশ, বিডিআর, র্যাব, আনসার, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের এবং নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রব্যমূল্য কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসাই হবে আমাদের প্রথম কাজ। কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এর থেকে তাদের মুক্ত করতেই হবে।
কলকাতার একটি পত্রিকার এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মাটি সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতে দেব না। আমি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। কেউ কারো বিরুদ্ধে যেন অভিযোগ করতে না পারে সেজন্য আমি জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের কথা বলেছি।
মিয়ানমারের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী সুচিকে মুক্তি দেয়া উচিত। আমরা অবিলম্বে সুচির মুক্তি চাই।
সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের পর এই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখলেন শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে দেশী-বিদেশী বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, মহাজোটের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ ও দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা বেলা ১১-৫৬ মিনিটে তার লিখিত বক্তৃতা শুরু করেন। শেষ করেন ১২-১৪ মিনিটে। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় তার ডান পাশে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান এবং বাম পাশে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ও তার দুই মেয়ে, পুত্র বধূ উপস্থিত ছিলেন।
নীলপাড়ের শাড়ী পরিহিতা শেখ হাসিনা ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল। বেলা ১১-৫২ মিনিটে তিনি সংবাদ সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করেই মঞ্চ থেকে সকলকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তিনি ছিলেন অনেক বেশি শান্ত এবং সুস্থির। তার বক্তব্য ছিল গোছালো ও সাবলীল। তার বক্তব্যে সহনশীলতা এবং রাষ্ট্র নায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ছিল।
প্রথম আলো ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮
দেশ পরিচালনায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ সবার সহযোগিতা চাইলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সবার প্রতি সমানভাবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, "আমাদের সরকার হবে সকলের।"
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের পর গতকাল বুধবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেন মহাজোটের নেত্রী শেখ হাসিনা। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, "বিরোধী দলকে আমরা সংখ্যা দিয়ে বিচার করব না।" প্রসঙ্গত, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩২ আসন পেয়েছে। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৬২ আসন।
ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য শুরু করেন শেখ হাসিনা। তিনি বিরোধী দল থেকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ এবং আনুপাতিক হারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ দেওয়ার ঘোষণা দেন। উপস্িথত নেতা-কর্মীরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে তাঁর ঘোষণাকে স্বাগত জানান। পরে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, রাজি থাকলে বিরোধী দল থেকে মন্ত্রীও করার ইচ্ছা আছে তাঁর। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯৬ সালে বিরোধী দল থেকে দুজনকে মন্ত্রী করার কথা উল্লেখ করেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, "আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। দেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই।"
এ ঘোষণার বিষয়ে সাংবাদিক এবং আমার দেশ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক আতাউস সামাদ প্রথম আলোকে বলেন, শেখ হাসিনা মুখে যা বলেছেন, তা কাজে পরিণত করলে ভালো হবে। তিনি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার কথা বলেছেন, অথচ গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা হয়েছে। তাঁর অঙ্গীকার কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করতে পারলেই বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণিত হবে। আতাউস সামাদ বলেন, "সংসদ অধিবেশন শুরু হলেই বুঝতে পারব, উনি কতক্ষণ বিরোধী দলকে নিয়ে কাজ করবেন বা করবেন না।"
সংবাদ সম্মেলনে অতীতে আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক নির্যাতন-নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, "যেহেতু বিজয় অর্জন করেছি, তাই সবকিছু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে।" তিনি বলেন, বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে সংযত থাকতে হবে। জনসেবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
বিজয়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের বিশাল মিলনায়তন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও দলীয় বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্িথতিতে আর বিশাল থাকেনি। ছোট বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নে রেদোয়ান সিদ্দিকী ববি, তাঁর স্ত্রী পেপপি, ভাগ্নি টিউলিপ ও রূপন্তীকে নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল শেখ হাসিনা দুপুর ১২টায় মিলনায়তনে প্রবেশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার ডান পাশে দলের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান এবং বাঁয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হোসেন তৌফিক ইমাম বসেন। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা দর্শক সারির সামনের আসনে বসেন। ৪৫ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভুমিকা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখব।"
এ সম্পর্কে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা প্রথম আলোকে বলেন, "শুনতে ভালো লেগেছে। তবে সহযোগিতা একতরফা হয় না। শেখ হাসিনা সহযোগিতার হাত বাড়ালেন, আর অন্যজন গ্রহণ করলেন না, তখন কী হবে?" তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া এই আহ্বানে সাড়া দিলেই নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি হবে। আশা করি, তিনি তা করবেন।
সরকারের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, "দারিদ্র্য আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ আমাদের গড়তেই হবে। দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে, মানুষের জীবনমান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি আধুনিক, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে উন্নীত করতে পারলেই সত্যিকার বিজয় আসবে।"
নতুন ভোটারদের অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু আগামী দিনে তাদেরই দেশের নেতৃত্ব নিতে হবে, তাই গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষায়-দীক্ষায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নতুন প্রজন্ন দেশকে নতুন রাজনৈতিক চেতনায় এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বড় বিজয়ে বড় দায়িত্ব অর্পিত হওয়ার কথা স্বীকার করে মহাজোটের নেত্রী এই বিশাল দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এই বিজয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসনের, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের বিজয়। এ বিজয় কেবল আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের নয়, সমগ্র জাতির।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বক্তব্য ইতিবাচক। এখন তিনি সেটা কীভাবে পালন করেন, এটাই আমরা দেখব। তিনি বলেন, তবে শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে অন্তত সদিচ্ছা তো প্রকাশ করেছেন।
শেখ হাসিনা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের জন্য সশস্ত্র বাহিনী ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিডিআর, র্যাব, আনসার সদস্যসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি মহাজোট, ১৪ দল, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, আলেম-ওলামা, পীর ও মাশায়েখ এবং সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার প্রথম প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্যে তাঁর দায়িত্ব সচেতনতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর বক্তব্য সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন করতে হলে সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে তাঁকে। আশা করি, তিনি তা পারবেন।
প্রশ্নোত্তর পর্ব
প্রশ্ন : খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানাবেন কি না, সরকার পরিচালনায় তাঁর সহযোগিতা চান কি না?
শেখ হাসিনা : সবার সহযোগিতা নিয়েই আমি সরকার পরিচালনা করতে চাই। আপনাদের মাধ্যমেই তাঁকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি।
প্রশ্ন : খালেদা জিয়া নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জনগণের জন্য আপনার কী বার্তা আছে?
শেখ হাসিনা : জনগণের রায় তাঁর মেনে নেওয়া উচিত। কারণ, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে তাই একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাই।
প্রশ্ন : সরকারে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন কি না?
শেখ হাসিনা : আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি, সরকারে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করব না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা জনগণের জন্য সুন্দর জীবনমান নিশ্চিত করেছি। আমাদের দায়িত্ব জনগণের সেবা করা। ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নই আসে না।
প্রশ্ন : খালেদা জিয়াকে ফুল পাঠিয়ে অভিনন্দন জানাবেন কি না?
শেখ হাসিনা : সাধারণত যে দল জিতে তাদের অভিনন্দন জানানো হয়। আমি ফুল পাঠালে উনি যদি তা প্রত্যাখ্যান করেন বা বিষয়টি অন্যভাবে নেন, তখন কী হবে? সত্যি কথা বলতে কি, আমি অনেকবারই টেলিফোন হাতে নিয়েছি, ভেবেছি, কথা বলি। আবার সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হয়েছে, উনি এটাকে কীভাবে নেবেন! যদি অন্যভাবে নেন, মনে করেন উপহাস করছি!
আমরা বিশাল জয় পেয়েছি। এটা অনেকেই আশা করেনি। আমরা সব সময় ষড়যন্ত্রের শিকার। এটা আমি অতীতেও বলেছি, এখনো বলছি, জনগণের ভোটের দিক থেকে আমরা কখনো হারিনি। এবার ছবিসহ ভোটার তালিকা হওয়ায় সত্যিকার ফল বেরিয়ে এসেছে। উদারতায় আমাদের কার্পণ্য নেই। ভবিষ্যতেও থাকবে না।
প্রশ্ন : খালেদা জিয়ার সহযোগিতা চাইবেন কি না?
শেখ হাসিনা : অবশ্যই খালেদা জিয়ার সহযোগিতা চাইব। কারণ, তিনিও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, দেশ চালিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। সংসদে সকলের অভিজ্ঞতা নিয়েই চলতে হবে।
প্রশ্ন : বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাঁচ বছরের যে লক্ষ্যমাত্রা ইশতেহারে আছে, তা কীভাবে পূরণ করবেন?
শেখ হাসিনা : বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের রেকর্ড আছে। ক্ষমতায় থাকাকালে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বাড়িয়েছিলাম। উত্তরবঙ্গে কয়লা পাওয়া গেছে। যমুনা সেতুতে পাইপ বসিয়ে উত্তরবঙ্গে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। তা ছাড়া উত্তরবঙ্গের আমিও একজন অংশীদার। পদ্মা পারের মানুষ যমুনার পারে চলে গেছি বৈবাহিক সুত্রে। তাই আমারও একটা দায়িত্ব আছে।
প্রশ্ন : আপনার বড় শত্রু দারিদ্র্য বলেছেন, তাহলে বড় বন্ধু কে?
শেখ হাসিনা : আমার বড় বন্ধু দেশের জনগণ। আর অবশ্যই বড় শত্রু দারিদ্র্য। কারণ, বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত। আমাদের মূল কাজ হবে, দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। আমি মনে করি, দারিদ্র্য দুরীকরণের মূল হাতিয়ার হবে শিক্ষা।
প্রশ্ন : বিরোধী দল থেকে মন্ত্রী দেবেন কি না, সরকারে গিয়ে প্রথম এক শ দিনের কর্মসুচি কী হবে?
শেখ হাসিনা : বিরোধী দল সম্মত থাকলে মন্ত্রিত্ব দেব। আর কোনো কাজ এক শ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাইছি না। প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হবে। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন বাড়াব। দ্রব্যমূল্য কমাব। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াব। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলব।
প্রশ্ন : সরকার গঠনের পর মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনার নীতি কী হবে? আর মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির ব্যাপারে কিছু বলবেন কি না?
শেখ হাসিনা : আমরা মিয়ানমারসহ সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখব। একসঙ্গে কাজ করব। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হচ্ছে−সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।
অং সান সু চির মুক্তি আমি অবশ্যই দাবি করি। আমরা সব রকম রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
প্রশ্ন : ভারতে সন্ত্রাসী হামলা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের অবনতিশীল সম্পর্ক বিষয়ে কী মনে করেন?
শেখ হাসিনা : এ অঞ্চলে সন্ত্রাস একটি বড় সমস্যা। সন্ত্রাস নিরসনে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ জন্য আমরা একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে চাই। তা ছাড়া পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা উচিত। আমি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করব।
প্রশ্ন : ভারতের অভিযোগ আছে, বাংলাদেশের মাটি সে দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য ব্যবহূত হয়।
শেখ হাসিনা : বাংলাদেশের মাটিকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহার হতে দেব না। আমরা আগেরবার ক্ষমতায় থাকাকালেও এ ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম। এ জন্যই আমরা একটি টাস্কফোর্স করতে চাই, যাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে না হয়।
প্রশ্ন : দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান কী হবে?
শেখ হাসিনা : বরাবরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান আছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হবে।
প্রশ্ন : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন কি না?
শেখ হাসিনা : জনগণ তো ভোটের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দিয়েছে। তবে আইনি বিচারও হবে।