৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও জিয়াউর রহমান
এমাজউদ্দীন আহমদ
পুরানো ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে পুরোপুরি অকেজো করে ছুঁড়ে ফেলে নতুন ভাবে রাজনৈতিক সমাজ গড়ার উদ্যোগই হলো বিপ্লব। রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সমাজ চেতনার দিক পরিবর্তনই এর লক্ষ্য। বিপ্লবের পরে তাই সামাজিক ইতিহাসের গতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্কসপোলের কথায় তা (বিপ্লব) সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন বিন্যাসের সূচনা করে’ । এই প্রেক্ষাপটে সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের পর্যালোচনা করুন, দেখবেন, সকল বিতর্কের অবসান ঘটেছে।
সাত নভেম্বরের ঘটনাক্রম যে বিপ্লবাত্মক তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দিলে। সাত নভেম্বরের পরের বাংলাদেশ সাত নভেম্বরের পূর্বের বাংলাদেশ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। সুস্পষ্ট হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। সাত নভেম্বরের পূর্বের বাংলাদেশে বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক একদলীয় বাকশালের ঘন কুয়াশা সাত নভেম্বরের পরের বাংলাদেশে কেটে গেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের দলগুলো ক্রমে ক্রমে বিকশিত হতে শুরু করেছে। সংবাদপত্রের মুখে নতুনভাবে কথা ফুটেছে। পূর্বের ব চোখে দৃষ্টি ফিরেছে। কান খাড়া হয়েছে। নির্বাহী কতৃêত্বের পদতল থেকে সরে ক্রমে বিচার বিভাগ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। সাত নভেম্বরের বৈপ্লবিক ঘটনাক্রমের ফলে জেনারেল জিয়াউর রহমান শাসন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যদিও ৩ নভেম্বরে তাঁকে ব্রিগডিয়ার খালেদ মোশাররফ পদত্যাগে বাধ্য করে গৃহব িকরেছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, কৃতী মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরের অনিশ্চিত মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণাদানকারী জিয়াউর রহমান সিপাহী জনতার সম্মিলিত উদ্যেগের ফলে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হলেন, কোন পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে নয়, নয় কোন ষড়যন্ত্র অথবা কোন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তিনি ক্ষমতা- কেন্দ্রে অভ্যুত্থান এবং প্রতি-অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এলেন সাত নভেম্বরে বিপ্লবের মাধ্যমে, অনেকটা জেনারেল দ্য গল বিপর্যস্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক মর্যাদা সংরক্ষণের জন্যে যেমন আবির্ভূত হয়েছিলেন ফরাসি ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে, ঠিক তেমনি। সাত নভেস্বরের পর থেকেই রুশ-ভারতের অকার কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মুক্তিলাভ করে বিশ্বময় বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সম-সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এক গৌরবময় ভূমিকা পালনের জন্যে সচকিত হয়ে ওঠে। দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন নতুন ক্ষেত্র রচিত হতে থাকে। সাত নভেম্বরের পূর্বে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ছিল নিঃসঙ্গ, বুবিহীন, একাকী, সেই বাংলাদেশ বিশ্বময় বহুসংখ্যক সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ীর স্পর্শে গতিশীল হতে থাকে।
সাত নভেম্বরের পরে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে ভারতবিরোধী মনমানসিকতা পরিবর্তিত হয়ে সম-সার্বভৌমত্বের এবং সাম্যের ভিত্তিতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে। যার পরিপূর্ণ রূপ আরো পরে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনে সহায়ক হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নতুনবাবে উজ্জীবিত হয়।
সমাজতন্ত্রের নামে দেশে যে অপচয়প্রবণ দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটতে থাকে। ব্যক্তি উদ্যোগ এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়। হেনরী কিসিঞ্জারের সেই নির্মম অভিধা- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র শতছিন্দ্র একে একে ব হতে থাকে। সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সামাজিক পর্যায়ে বৃহৎ পরিধিবিশিষ্ট উদার এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক পরিশীলিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আবেদন ব্যাপকভিত্তিক হয়ে ওঠে। মোটকথা সাত নভেম্বরের পরে বাংলাদেশের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্যের আর একটি দিক হলো- সৈনিক ও জনতার মধ্যে এতদিন পর্যন্ত যে অনতিক্রম্য দূরত্ব বিদ্যমান ছিল এই আন্দোলনে তার অবসান হলো। জাতীয় স্বার্থে যা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে সিপাহী এবং জনতার উচ্চকণ্ঠ সমগ্র সমাজকে সচকিত করে তোলে। জাতীয় চেতনা এবং জাতীয় স্বার্থের সুষম বনে আবদ্ধ হয় জনগণ ও বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তাবৃন্দ। এদিক থেকেও বলা যায়। প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক পুনর্গঠনে সৃজনশীল নেতৃত্বের সুর ঝংকৃত হয়ে ওঠে এই বিপ্লবে এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির সুর ও ছন্দ জিয়ার কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিতে হতে থাকে। বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির প্রকৃতি তাঁর কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জাতীয় জীবনের এই সক্ষিণে যখন সামরিক অভ্যুত্থানে এবং প্রতি-অভ্যুত্থানের আঘাতে জাতীয় ঐক্য খণ্ডছিন্ন হয়ে পড়ে, জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে ওঠে, সামরিকবাহিনীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি যখন উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তি-স্বার্থের মাধ্যম হয়ে পড়ে, তখনই জাতীয় ঐক্যের অন্বেষায় বিপ্লব সংঘটিত হয় সাত নভেম্বরে। এবং বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারা নির্ধারিত হয়ে গেল। এসব কারণেই এই দিবসটির গুরুত্ব এই জাতির ইতিহাসে এমন তাৎপর্যপূর্ণ।
এক্ষেত্রে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের জনগণের তখনকার চিন্তা-ভাবনা আজকের চিন্তা-ভাবনা থেকেও তেমন ভিন্ন নয়। জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে অথবা বিপন্ন হওয়ার কোন আশঙ্কা দেখা দিলে, জাতীয় ঐক্য বিধ্বস্ত হলে, কোন মহলের চক্রান্তে জাতীয় স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হলে বা হওযার আশঙ্কা দেখা দিলে, সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রেরণা চিরঞ্জীব প্রত্যয়রূপে জাতিতে যে সঞ্জীবিত করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যারা জনকল্যাণের লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনে উদ্যোগী, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে দেশের সমস্যা সমাধান আগ্রহী, তাদের জন্যেও সাত নভেম্বরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

÷vd wi‡cvU©vi: