নিকট ইতিহাস
উবানের চোখে মুজিববাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনী
মাহমুদ হাসান
প্রাসঙ্গিক অধ্যায়টি এভাবে শুরু করেছেন মেজর জেনারেল উবান, 'কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চিফ অফ স্টাফ এবং সে-পদমর্যাদায় মুক্তিযোদ্ধাদেরও প্রধান৷ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী পাকিস্তানী সামরিক কতর্ৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাদেরকে প্রয়োগ করার ব্যবস্থাদি সম্পর্কে অস্থায়ী সরকারকে পরামর্শ দিতেন৷ পরবতর্ীকালে ভারত সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কর্নেল ওসমানী তখন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জি.ও.সি. লেফটেনান্ট জেনারেল জে. এস. অরোরার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোর তত্ত্বাবধান করতেন৷'
বলাবাহুল্য এ সমস্ত ঘটনা ঘটে ১৯৭১-এর ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হবার পর৷
উবান অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের বাহিনীতে বাছাই করে নেবার পদ্ধতি যুক্তিযুক্ত ছিল না৷ উবান লিখেছেন, 'এ সময় হাজার হাজার তরুণ-যুবা প্রশিক্ষণ নিতে আসছিল৷ কিন্তু প্রশিক্ষণাথর্ীদের সবার উদ্দেশ্য এবং আন্তরিকতা যাচাই করার কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা ছিল না৷ অস্থায়ী সরকার কতর্ৃক নিয়োজিত জাতীয় পরিষদ সদস্যদের (এম এন এ) দেওয়া সার্টিফিকেটের উপর প্রশিক্ষণাথর্ীদের অকৃত্রিমতা সম্পর্কে ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোকে নির্ভর করতে হতো৷ এম এন এ-রা বাঙালী অফিসারদের প্রস্তুত করা তালিকা অনুযায়ী অন্ধভাবে সার্টিফিকেট দিতেন, এদের কারো কারো ভিতর ছিল পরিকল্পিত কিছু ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য৷ ফলে কয়েকটা দল অস্ত্রসমেত বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উধাও হয়ে যায়, আবার কেউ কেউ অস্ত্র লুকিয়ে রেখে ফিরে এসে রিপোর্ট করে যে, শত্রুর আক্রমণে অস্ত্র বেদখল হয়ে গেছে৷ এই অশুভ তত্পরতা নিমর্ূল করার জন্য একটা নিশ্ছিদ্র সমাধান বাতলানো হয়, কিন্তু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় নি, কারণ পদমর্যাদার কারণে তাঁরা তাঁদের জ্ঞানকেও উন্নততর মনে করতেন৷'
এ সময়ে দৃশ্যপটে আবিভর্ূত হলেন মুজিব বাহিনীর চারজন স্রষ্টা৷ অবস্থার পুরো সুযোগ তাঁরা গ্রহণ করলেন এবং পরিস্থিতিকে তাদের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করলেন৷ এই নেতাদের সঙ্গে এভাবে পাঠককে পরিচিত করান উবান, 'এই গোলযোগপূর্ণ সময়ে আমরা কয়েকজন উত্সগর্ীকৃত যুবনেতার সাক্ষাত্ পাই যাদের নাম বাংলাদেশে সুপরিচিত ছিল৷' মেজর জেনারেল উবান এদের সম্পর্কে অতিউচ্চ ধারণা পোষণ করেন, 'এদেরকে প্রেরণাময় মরণপণ অঙ্গীকার আবদ্ধ মনে হল৷' এবং উবানের মতো 'সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, এঁদের নেতৃত্ব বাংলাদেশের ভিতরে ও বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গ্রহণযোগ্য৷ দুর্ভাগ্যজনক হল অস্থায়ী সরকারের ভেতর এদের এরকম কোনো মর্যাদা মেনে নেওয়ার মত মনোভাব ছিল না৷ সরকার চাইছিলেন এদের, মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বের অধীনে রেখে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ করাতে৷' কিন্তু চার যুবনেতা মোটেই তা চান নি৷ "মুজিবের প্রতি এঁদের একনিষ্ঠ আনুগত্য এবং তাঁর সঙ্গে নৈকট্যের কারণে এঁরা 'মুজিববাহিনী' হিসেবে পরিচিত হতে অধিকতর আগ্রহী ছিলেন৷ ওরা এঁদের পুরনো সহকমর্ীদের বাছাই করে তাদের অকৃত্রিমতা সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিচ্ছিলেন৷ বাংলাদেশের ভিতর থেকে যথেষ্ট ত্যাগী, দৃঢ়চেতা এবং বিশ্বস্ত লোকদের এঁরা বাছাই করে এনে চাপ দিতেই থাকে যাতে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা যেরকম কমান্ডো ট্রেনিং পাচ্ছিল তার বদলে এই দলকে যেন অপ্রথাগত যুদ্ধের আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷"
আসল জিনিসটি এখানে স্পষ্ট৷ যুবনেতারা চাইছিলেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব৷ এবং কোন্দল ছিল এই নেতৃত্ব নিয়েই৷ তবে মতানৈক্য একদিনেইত হয় নি৷ আগে থেকেই চলছিল৷ মনে হয় না উবান পুরো জিনিসটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন৷ মুজিববাদী ও মুজিববাদ-বিরোধী আওয়ামীদের ভেতর দ্বন্দ্ব তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দেশ ও জাতির চরম মুহূর্তেও দেশের মানুষ এই দলাদলির হাত থেকে নিষ্কৃতি পায় নি৷ মুজিব নিজে মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে সংগ্রামে উপস্থিত ছিলেন না৷
এবার আবার আমরা ফিরে আসি আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে, মুজিব বাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনীর আলোচনায়৷ মুজিব নিজে মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর উপস্থিত না থাকলেও তাঁর ভক্ত ও সুযোগ্য অনুগামীরা ছিলেন৷ পক্ষান্তরে তাজউদ্দিন ছিলেন অন্য রকম৷ চার যুব নেতা তা জানতেন এবং এজন্য তাজউদ্দিনের প্রতি তাঁদের আস্থা ছিল না৷ তাজউদ্দিনকে তাঁরা শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করতেন৷ মুজিবও তাই মনে করা শুরু করেছিলেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর দেশে ফিরে৷ যার ফলে প্রথম সুযোগেই মুজিব তাজউদ্দিনকে তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করেন৷ তিনি অজুহাত দেখিয়েছিলেন তাজউদ্দিনের ভারত-প্রীতির৷ আসল কারণ ছিল ভিন্ন৷ মুক্তি-সংগ্রামে হাটে-মাঠে-ঘাটে কাজ-করা কমর্ী তাজউদ্দিনের মুখোমুখি দাঁড়াতে অসুবিধা বোধ করছিলেন শেখ মুজিব৷ মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যক্ষভাবে জানত সহযোদ্ধা তাজউদ্দিনকে, শেখ মুজিবকে নয়৷
মুজিবের অবর্তমানে ১৯৭১-এর সমরাঙ্গনে মুজিবের লাঠি হাতে তুলে নেন মুজিব বাহিনীর চার যুব নেতা৷ তাঁরা কেবল তাজউদ্দিন-বিরোধী ছিলেন না, ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ওসমানী-বিরোধীও৷ অস্থায়ী সরকারকেও তাঁরা সুনজরে দেখতেন না, কেন না তাজউদ্দিন ছিলেন তার প্রধান৷ বরং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি এই চার নেতা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন৷ তাজউদ্দিন ও তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারত সরকার ও জেনারেল অরোরার যে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল চার যুবনেতা তা পছন্দ করতেন না৷ উবান এ-সম্পর্কে লিখেছেন, "যুবনেতারা সবসময় অভিযোগ করছিলেন যে, তাজউদ্দিনের সঙ্গে জেনারেল অরোরার কোনো বিশেষ ধরনের যোগসাজশ আছে, কারণ তারা দুজনই চাপ দিচ্ছিলেন যাতে মুজিববাহিনী তাদের কমান্ডের অধীন থেকে পরিচালিত হয়, তাজউদ্দিনের প্রতি আনুগত্যহীন এই যুবনেতাদের অধীনে নয়৷" এ-বিষয়ে উবান আরো বলেন, 'আমি এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি কিন্তু এর মূল ছিল অতীতের গভীরে, তাই পুরোনো মনোভাব মুছে ফেলার জন্য কিছুই করা যায় নি৷'
যুবনেতারা কিন্তু চুপ করে থাকেন নি৷ মেজর জেনারেল উবানের ভাষ্য অনুযায়ী, "যুবনেতারা যে-কোনোভাবে হোক বয়োজ্যেষ্ঠ এম এন এ এবং এম পি-দের একটা দলকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন এবং তাজউদ্দিনবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালান যে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদটি বেদখল করা হয়েছে, যা তাদের মতে অন্যকারো পাওয়া উচিত ছিল৷ আমার মনে হয় ওরা সৈয়দ নজরুল ইসলামের কথা মনে রেখে এ কথা বলছিল৷ ব্যাপারটা একটা বিশ্রী রূপ নিতে পারতো, যেহেতু যুবনেতারা তাজউদ্দিনকে তাঁর নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে দেওয়ার জন্য পাগলপ্রায় ছিলেন৷ এ পর্যায়ে অস্থায়ী সরকারের মধ্যে একটা ভাঙন পুরো আন্দোলনের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনতে পারতো৷ আমার মনে হয় আমি যুবনেতাদের বোঝাতে সক্ষম হই যে, এ রকম কোনো পদক্ষেপ তাদের মিশনের জন্য বড়ো ধরনের বিপদের ঝুঁকিপূর্ণ, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা-পরবতর্ী সময়ের জন্য আরো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে৷ আমার সঙ্গে তারা একমত হন৷ আমার মনে হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামও এঁদেরকে সাবধান হতে পরামর্শ দেন এবং এভাবেই একটা মারাত্মক রাজনৈতিক হুমকি এড়ানো সম্ভব হয়৷"
আওয়ামী লীগ এবং বিশেষ করে মুজিববাদীরা পাকিস্তানীদের যতটা শত্রু বলে মনে করত তার চেয়ে বোধহয় বেশী শত্রু মনে করত কমিউনিস্টদের_বিশেষ করে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের৷ এ-বিষয়ে উবান বলেন, 'এই চার নেতা আমাদের জানান যে বাংলাদেশে নকশাল বাহিনীর অনুরূপ বহু অবাঞ্ছিত ব্যক্তি (মুক্তিবাহিনীতে ঢুকে) প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পাচ্ছে৷ এঁরা সতর্ক করে দেন যে, এসব অস্ত্র পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না, বরং স্বাধীনতার পর নকশাল আন্দোলনের অনুরূপ কিছু করার জন্য বাংলাদেশে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে৷ এরা মুক্তিবাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশের কিছু সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্কিত চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতাদের নামও উল্লেখ করে, যাঁদের অনুমোদনক্রমে বিপুলসংখ্যক কমিউনিস্ট ক্যাডারকে রিক্রুট করে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং অস্ত্রসজ্জিত করা হচ্ছিল৷ ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে কতর্ৃপক্ষের গোচরে আনা হয়, তবে ফলাফল ছিল শূন্য৷"
এতে মনে হয় উবানের মত চার যুবনেতাও নিরাশ হয়েছিলেন৷ ভাবতে একটু আশ্চর্যই লাগে৷ কেন না তাজউদ্দিন বা তাঁর সরকার বা ভারত সরকার কমিউনিস্টদেরকে তাদের মোটেই মিত্র বলে মনে করতেন না৷ এজন্য মুজিববাদী নেতাদের সরবরাহকৃত খবরের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ হয়৷ তাছাড়া, কমিউনিস্টরা দেশপ্রেমিক হতে পারবে না কেন? মনে হয় সমস্ত জিনিসটাতে কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীদের প্রতি মুজিববাদীদের মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে৷
এবার আসা যাক বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মুজিববাহিনী সম্বন্ধে কী মনে করত সে-বিষয়ে৷ এ-ব্যাপারে মেজর জেনারেল উবান লিখেছেন, "বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার, যা বলতে তাজউদ্দিনকেই বোঝাতো, কোনোভাবেই মুজিববাহিনীর নেতাদের সঙ্গে অভিন্নমত পোষণ করতেন না এবং তাদের সব অভিযোগই দেখতেন হালকাভাবে৷ কর্নেল ওসমানী তাঁর সরকারের কাছ থেকেই নির্দেশ গ্রহণ করতেন এবং এই যুবনেতাদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে বন্ধুভাবাপন্ন হলেও মুজিববাহিনী নামের আলাদা কোনো বাহিনী পরিচালনার ব্যাপারটা আগ্রহী ছিলেন না৷ বিশেষ করে যে-বাহিনী তাঁর সার্বিক কমান্ডের অধীনে থাকবে না৷ সামগ্রিক অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের জেনারেল আরোরাও ব্যাপারটা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ মুজিববাহিনী সরাসরি তাঁর কমান্ডের অধীনে ছিল না৷"
আর এক দিক থেকেও যুবনেতাদের মনে কমিউনিস্ট-ভীতির একটি নতুন মাত্রা এসে যুক্ত হয়৷ "যুবনেতারা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নকশালপন্থী লোকজনদের গল্পগুজব করতে দেখে৷ শেষোক্তরা হোটেলেই থাকতো বলে মনে হয়৷ যুবনেতারা জানতেন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসনামলে এরাই তাদের শত্রু ছিল৷ মূলত এদের বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা৷ যুবনেতারা বুঝতে পারছিলেন না যে তাঁদের চিহ্নিত শত্রুর সঙ্গে ভারত কেন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে৷ ওঁরা তাই ভুলভাবে এর সারার্থ করেন যে, বাংলাদেশে শক্ত ভিত্তির ওপর একটা কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড় করানোই সরকারের উদ্দেশ্য৷ ওরা বিশ্বস্তসূত্রে এ খবরও পায় যে, মার্কসবাদী কমর্ী ও মওলানা ভাসানীর অনুসারীদের আলাদা প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে৷" এ-খবর পেয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে যুবনেতারা উবানের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁকে বলেন, "আমরা আশা করি নি গত ২৫ বছরে আমাদের অর্জনকে নস্যাত্ করার জন্য আপনারা মার্কসবাদী এবং নকশালীদের ট্রেনিং ও অস্ত্র দেবেন৷" উবান যুবনেতাদের কথায় বিরক্ত হয়ে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যান সেক্রেটারি আর এন কাউলের কাছে৷ কাউল তাঁকে জানান, উবানের ভাষায়, "মওলানা ভাসানীর নকশালীরা অন্য আরেক জায়গায় প্রশিক্ষণরত৷ তাদের আমার হেফাজতে দেওয়া হয় নি কারণ তিনি নিশ্চিত জানতেন যে, এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি আমি (উবান) রক্ষা করবো না এবং যুবনেতারা খুব দ্রুত তাদের খোঁজ পেয়ে যেতো, আর এতে একটা মারাত্মক গোলযোগ সৃষ্টি হতো৷" কাউলের জবাবে বিস্মিত হন উবান৷ উবান এই আবিষ্কারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না৷ কাউল পরে তাঁকে আরো বলেন, "আমরা বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করি নি, ওই সরকার ভাসানীর লোকদেরকে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বড়ো ধরনের সম্পদ মনে করে৷ আমরা ওদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করি কীভাবে? তোমার যুবনেতাদেরকে বলো যে, ব্যাপারটা ওরা পছন্দ না করলেও এটা ওদেরকে গিলতে হবে৷ সার্বিক পরিকল্পনায় আমরা ওদেরকে কেবল গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে সমর্থন জানাবো, কিন্তু কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে নয়৷ ওরা যদি ঠিকমত না চলে আমাদের কিছু করার নেই৷ গোল্লায় যাক ওরা৷"
এরপর আরো সতর্ক হয়ে যান মুজিববাদী নেতারা৷ "ওরা ওদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, এমন কি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের কাছেও ওদের গোপন তথ্য প্রকাশ করতেন না৷ তাজউদ্দিনকে ওরা দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করতেন যে, স্বাধীনতার পর তিনি শেখ মুজিবকে সরিয়ে দিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করবেন৷ পরে তাঁরা আমাকে অকপটে বলেন, 'তাজউদ্দিন আপনাদের কমিউনিস্ট মন্ত্রী ডি পি ধরের সঙ্গে একজোট৷ আমরা দুজনের কাউকেই বিশ্বাস করি না৷ আমাদের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ব্যাপারে ওদের কী যে পরিকল্পনা আছে সেটা আপনাদের সরকারও জানে না৷' "
যুবনেতারা অস্থায়ী সরকার বা ঐ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কাউকেও বিশ্বাস করতেন না৷ মেজর জেনারেল উবান জানাচ্ছেন, "ওরা কর্নেল ওসমানীকেও, যিনি তাজউদ্দিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিলেন তাঁকেও কোনো তথ্য জানাতো না, অথবা লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকেও নয়, যিনি তাদের বিচারে ধারণাতীত কোনো কারণে ওঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে খেলছেন৷ আমাকে ওঁরা প্রায়ই বলতেন যে জেনারেল অরোরা ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তাজউদ্দিনকে প্ররোচিত করছেন এবং চাপ দিচ্ছেন মুজিববাহিনীকে যাতে তাঁর কমান্ডের অধীনস্ত করা হয়৷"
মুজিববাহিনীর নামকরণ নিয়েও একটা বড় সমস্যা দেখা দেয়৷ অস্থায়ী সরকার বা সামরিক হাই-কমান্ড কেউই এই নাম সমর্থন করছিলেন না৷ ঐ সময় অবস্থার একটা সুযোগ নিয়ে যুবনেতারা 'মুজিববাহিনী' নামটি সামনে নিয়ে আসেন৷ যদিও মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশের সীমান্তে ও অভ্যন্তরে চমত্কারভাবে কাজ করছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তিরস্কারযোগ্য কাজ করে পুরো বাহিনীর জন্য বদনাম কুড়াচ্ছিল৷ তাই, ঐ সুযোগ নিয়ে, যুবনেতারা দৃঢ় মত পোষণ করেন যে ওঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত বাছাই করা গেরিলা নেতাদের বাহিনীর নাম হওয়া উচিত 'মুজিববাহিনী', যাতে তাদেরকে 'মুক্তিবাহিনী' থেকে আলাদা করে চেনা যায়৷ কোনো সন্দেহ নেই মুজিব নামটির প্রতিও তাঁদের ছিল বড় আকর্ষণ৷
উবান যখন এই বিশেষ বাহিনীর নাম 'মুজিববাহিনী' রাখার প্রস্তাব দিলেন তখন তা হাইকমান্ডের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো না৷ তাদের মতে, এটা হলে বাংলাদেশের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হবে, এমনকি মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর ভেতরও সম্পর্কের ফাটলও দেখা দিতে পারে৷ যুবনেতারা হাইকমান্ডের এ-সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হলেন না৷
এরপর এল দুই বাহিনীর মধ্যে অভিযান-কর্ম কীভাবে বণ্টন হবে, সে-প্রশ্ন৷ এ-সমস্যার সমাধান করে দিলেন জেনারেল অরোরা৷ তিনি দায়িত্বটা ভাগ করে দিলেন এভাবে৷ সীমান্তের ২০ মাইল ভিতর পর্যন্ত আক্রমণের দায়িত্ব মুক্তিবাহিনীর এবং আরো ভিতরের অঞ্চলের দায়িত্ব মুজিববাহিনীর৷ যুবনেতারাও এটাই চাইছিলেন৷ সুতরাং সেখানে মতবিরোধ হল না৷ তবে অরোরা চাইছিলেন মুজিববাহিনী তাঁর কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হোক, কিন্তু ওঁরা তা মেনে নিচ্ছিলেন না৷ এভাবে আমরা দেখতে পাই মুজিববাহিনী বনাম মুক্তিবাহিনী, মুজিব বনাম তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বকে!
উবান তাঁর বইটির প্রাসঙ্গিক অধ্যায়টি শেষ করেন এভাবে, "বাংলাদেশ এখন মুক্ত৷ ত্যাগী নেতা তাজউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রিত্বে অস্থায়ী সরকার ঢাকায় পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছে৷ বাংলাদেশের নবীন সরকার সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশ দেয়৷ সর্বপ্রথম যাদের অস্ত্র সমর্পণ করতে বলা হলো তারা হচ্ছে মুজিববাহিনীর যুবকেরা৷ শেখ মণি এ ব্যাপারে খুব ক্ষেপে গেলেন৷ তাজউদ্দিন কতর্ৃক গৃহীত নীতি সম্পর্কে তিনি আমার কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন, যা তাঁর মতে তাজউদ্দিনের ক্ষমতায় থেকে যাওয়া এবং একটা বামপন্থী বাহিনী তৈরি করা৷ এমনকি তিনি আমাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের করিডোরে মাথায় কালো কাপড় বাঁধা সশস্ত্র কমিউনিস্ট যুবকদের দেখান৷ অস্ত্রসমর্পণের ব্যাপারে আমি শ্রী ডি পি ধর এবং শেখ মণির মধ্যকার এক তপ্ত বাদানুবাদের সাক্ষী হই৷ মণি শ্রী ধরকে বলেন যে, 'ঢাকায় শেখ মুজিবের উপস্থিতির আগে তারা কিছুতেই অস্ত্র ত্যাগ করবেন না এবং প্রয়োজনে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবেন৷' "
১৯৭২-এর ১০ই জানুয়ারী শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে এলে মুজিববাদীরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে৷ মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দিন বহিষ্কৃত হন৷ ওসমানী বাংলাদেশ আর্মি থেকে সরে আসেন৷ শেখ মুজিব তাঁর ভক্ত ও উদ্যমী অনুচরবর্গ এবং বাহিনী নিয়ে দেশ চালাতে থাকেন৷ সেই তিন বাহিনী হচ্ছে রক্ষীবাহিনী, যুব লীগ ও লাল বাহিনী৷
No comments:
Post a Comment