Thursday, May 14, 2009

স্বাধীনতার ঘোষণা

৭ মার্চ ১৯৭১ ঢাকার রোসকোর্সে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় যে দশ লাখের মতো মানুষ সমবেত হয়েছিল তারা শুনতে চেয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা।

শুনতে চেয়েছিল শেখ মুজিবের থেকে যে, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
জনগণ কিন্তু শেখ মুজিবের মুখ থেকে তেমন ঘোষণা শোনেনি।

তিনি অবশ্য বলেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'
বক্তৃতার শেষে তিনি 'জয় বাংলা' বলে 'জয় পাকিস্তান' ও বলেছিলেন।
তিনি ৭ মার্চের ভাষণে জাতীয় পরিষদের আগামী অধিবেশনে যোগদানের পূর্বশর্ত হিসেবে যে চারটি দাবি তুলে ধরেন তাতেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো কথা ছিলনা।
চারটি দাবি ছিল নিম্নরূপ:
(ক) অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার।
(খ) সামরিক বাহিনীকে অবিলম্বে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া।
(গ) সামরিক বাহিনীর হাতে প্রাণহনির তদন্ত।
(ঘ) জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
এক কথায় বলা যায়, এই দাবিগুলোর কোনোটিতেই স্বাধীন বাংলাদেশের কথা নেই।

স্বাধীনতার ঘোষণা-২

৭ মার্চের ভাষণে যেমন স্বাধীনতার ঘোষণা নাই, তেমননি স্বাধীন বাংলাদেশের কথাও নাই।
বরং বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালের ১ মার্চের যে এক-দফাভিত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয় তার রাশ টেনে ধরার প্রতিই ছিল শেখ মুজিবের বেশি ঝোঁক।
অসহোযোগ আন্দোলনকে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রির পদ লাভের কৌশল হিসেবে।
২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত করার পর তিনি উত্তেজিত হয়ে তাঁর এক শুভানুধ্যায়িকে বলেছিলেন, 'ওরা আমাকে ডুবিয়ে ছাড়বে।'
২৩ মার্চ যখন পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে তাঁর বাসভবনে পাকিস্তানের পতাকার বদলে বাংলাদেশের পতাকা কিছু ছাত্রনেতা তুলে দিয়ে আসেন, তখন তিনি তাদের বলেছিলেন, 'তোরা ভেবেছিস কি?'

স্বাধীনতার ঘোষণা-৩

অসহোযোগ আন্দোলনকে শেখ মুজিব ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন প্রাধমন্ত্রির পদ লাভের কৌশল হিসেবে।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফ্রান্সের নামকরা পত্রিকা লামন্ড এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব নিজেই বলেছিলেন, "পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ কি বোঝেন না যে, আমি হচ্ছি তাদের শেষ ভরসা? আমি না হলে এখানে কমুনিষ্টরা ক্ষমতা দখল করে নেবে? তারা কেন আমার সাথে আপোস রফা করছেন না?" এই বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত আছে শেখ মুজবের রাজনৈতিক কৌশল।

আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস্ ঐসময়ে এক সম্পাদকীয়তে লেখে, "পূর্বে শেখ মুজিব বন্দী হয়ে রয়েছেন অতি প্রগতিবাদী ছাত্র-যুবকদের দ্বারা এবং পশ্চিমে বন্দি ইয়াহিয়া খান তার সমরনায়কদের দ্বারা।"

নিউইয়র্ক টাইমস বুঝাতে চেয়েছে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থানের জন্যে যেমন দায়ী পূর্ব পাকিস্তানের অতিবিপ্লবী যুবশক্তি, তেমনি শেখ মুজিবের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রধান প্রতিবন্ধক পশ্চিম পাকিস্তানের সমরবিদরা।

স্বাধীনতার ঘোষণা-৪

শেখ মুজিবের পাকিস্তানি সৈনিকদের নিকট আত্মসমর্পন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সকল জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে তাদের কোনো একটিতেও দেখা যায় না যে, জাতীয় নেতা তাঁর প্রতিপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করেছেন।

শুধু তাই নয়, শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণের পরে পাকিস্তান সরকার তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যুদ্ধ চলাকালিন লাখো শহীদের রক্তের পবিত্র ধারা যখন প্রবাহিত হয়েছে তখন শেখ মুজিব যেমন নিরাপদ ও সুস্থ ছিলেন তার পরিবারের সকলেই নিরাপদ ও সুস্থ ছিলেন। এটা অবশ্যই আল্লাহর রহমত।

ইতিহাসে দেখা যায়, লেনিনের ভাইকে লেনিনের অপরাধে ফাঁসিতে লটকানো হয়েছিল। মাও জে তুং এর স্ত্রীকে তার প্রতিপক্ষরা হত্যা করে।

পাকিস্তানের জেল থেকে বেড়িযে, লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে শেখ মুজিবের প্রথম প্রশ্ন ছিলো, "সত্যই তোরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিস?"

প্রফেসর স্ট্যনিল উল পার্ট 'জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্তান' বই এ লিখেছেন, "শেখ মুজিব পাকিস্তানকে একটা কনফেডারেল স্টেট হিসেবে টিকিয়ে রাখার কথা বিবেচনা করবেন।" দেশে ফিরে এসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিব অবশ্য বলেছিলেন, "ভুট্টো সাহেব, তুমি সুখে থাকো। আমার দেশ এখন আলাদা হয়ে গেছে। তাই তোমার সাথে আর কোনো বন্ধনের দরকার নেই।"