Thursday, February 5, 2009

৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও জিয়াউর রহমান

এমাজউদ্দীন আহমদ

পুরানো ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে পুরোপুরি অকেজো করে ছুঁড়ে ফেলে নতুন ভাবে রাজনৈতিক সমাজ গড়ার উদ্যোগই হলো বিপ্লব। রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং সমাজ চেতনার দিক পরিবর্তনই এর লক্ষ্য। বিপ্লবের পরে তাই সামাজিক ইতিহাসের গতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। স্কসপোলের কথায় তা (বিপ্লব) সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন বিন্যাসের সূচনা করে’ । এই প্রেক্ষাপটে সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের পর্যালোচনা করুন, দেখবেন, সকল বিতর্কের অবসান ঘটেছে।

সাত নভেম্বরের ঘটনাক্রম যে বিপ্লবাত্মক তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দিলে। সাত নভেম্বরের পরের বাংলাদেশ সাত নভেম্বরের পূর্বের বাংলাদেশ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। এই স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট হয় অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। সুস্পষ্ট হয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। সাত নভেম্বরের পূর্বের বাংলাদেশে বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক একদলীয় বাকশালের ঘন কুয়াশা সাত নভেম্বরের পরের বাংলাদেশে কেটে গেছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের দলগুলো ক্রমে ক্রমে বিকশিত হতে শুরু করেছে। সংবাদপত্রের মুখে নতুনভাবে কথা ফুটেছে। পূর্বের ব চোখে দৃষ্টি ফিরেছে। কান খাড়া হয়েছে। নির্বাহী কতৃêত্বের পদতল থেকে সরে ক্রমে বিচার বিভাগ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। সাত নভেম্বরের বৈপ্লবিক ঘটনাক্রমের ফলে জেনারেল জিয়াউর রহমান শাসন পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যদিও ৩ নভেম্বরে তাঁকে ব্রিগডিয়ার খালেদ মোশাররফ পদত্যাগে বাধ্য করে গৃহব িকরেছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, কৃতী মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরের অনিশ্চিত মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণাদানকারী জিয়াউর রহমান সিপাহী জনতার সম্মিলিত উদ্যেগের ফলে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হলেন, কোন পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে নয়, নয় কোন ষড়যন্ত্র অথবা কোন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। তিনি ক্ষমতা- কেন্দ্রে অভ্যুত্থান এবং প্রতি-অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে এলেন সাত নভেম্বরে বিপ্লবের মাধ্যমে, অনেকটা জেনারেল দ্য গল বিপর্যস্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক মর্যাদা সংরক্ষণের জন্যে যেমন আবির্ভূত হয়েছিলেন ফরাসি ইতিহাসের এক সংকটময় মুহূর্তে, ঠিক তেমনি। সাত নভেস্বরের পর থেকেই রুশ-ভারতের অকার কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মুক্তিলাভ করে বিশ্বময় বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সম-সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এক গৌরবময় ভূমিকা পালনের জন্যে সচকিত হয়ে ওঠে। দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নতুন নতুন ক্ষেত্র রচিত হতে থাকে। সাত নভেম্বরের পূর্বে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ছিল নিঃসঙ্গ, বুবিহীন, একাকী, সেই বাংলাদেশ বিশ্বময় বহুসংখ্যক সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ীর স্পর্শে গতিশীল হতে থাকে।

সাত নভেম্বরের পরে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে ভারতবিরোধী মনমানসিকতা পরিবর্তিত হয়ে সম-সার্বভৌমত্বের এবং সাম্যের ভিত্তিতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে। যার পরিপূর্ণ রূপ আরো পরে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনে সহায়ক হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নতুনবাবে উজ্জীবিত হয়।

সমাজতন্ত্রের নামে দেশে যে অপচয়প্রবণ দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল তার অবসান ঘটতে থাকে। ব্যক্তি উদ্যোগ এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়। হেনরী কিসিঞ্জারের সেই নির্মম অভিধা- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র শতছিন্দ্র একে একে ব হতে থাকে। সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সামাজিক পর্যায়ে বৃহৎ পরিধিবিশিষ্ট উদার এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক পরিশীলিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আবেদন ব্যাপকভিত্তিক হয়ে ওঠে। মোটকথা সাত নভেম্বরের পরে বাংলাদেশের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।

সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্যের আর একটি দিক হলো- সৈনিক ও জনতার মধ্যে এতদিন পর্যন্ত যে অনতিক্রম্য দূরত্ব বিদ্যমান ছিল এই আন্দোলনে তার অবসান হলো। জাতীয় স্বার্থে যা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে সিপাহী এবং জনতার উচ্চকণ্ঠ সমগ্র সমাজকে সচকিত করে তোলে। জাতীয় চেতনা এবং জাতীয় স্বার্থের সুষম বনে আবদ্ধ হয় জনগণ ও বিভিন্ন পেশার কর্মকর্তাবৃন্দ। এদিক থেকেও বলা যায়। প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক পুনর্গঠনে সৃজনশীল নেতৃত্বের সুর ঝংকৃত হয়ে ওঠে এই বিপ্লবে এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির সুর ও ছন্দ জিয়ার কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিতে হতে থাকে। বাংলাদেশের নতুন রাজনীতির প্রকৃতি তাঁর কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাতীয় জীবনের এই সক্ষিণে যখন সামরিক অভ্যুত্থানে এবং প্রতি-অভ্যুত্থানের আঘাতে জাতীয় ঐক্য খণ্ডছিন্ন হয়ে পড়ে, জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে ওঠে, সামরিকবাহিনীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি যখন উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তি-স্বার্থের মাধ্যম হয়ে পড়ে, তখনই জাতীয় ঐক্যের অন্বেষায় বিপ্লব সংঘটিত হয় সাত নভেম্বরে। এবং বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারা নির্ধারিত হয়ে গেল। এসব কারণেই এই দিবসটির গুরুত্ব এই জাতির ইতিহাসে এমন তাৎপর্যপূর্ণ।

এক্ষেত্রে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের জনগণের তখনকার চিন্তা-ভাবনা আজকের চিন্তা-ভাবনা থেকেও তেমন ভিন্ন নয়। জাতীয় স্বাধীনতা বিপন্ন হলে অথবা বিপন্ন হওয়ার কোন আশঙ্কা দেখা দিলে, জাতীয় ঐক্য বিধ্বস্ত হলে, কোন মহলের চক্রান্তে জাতীয় স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হলে বা হওযার আশঙ্কা দেখা দিলে, সাত নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রেরণা চিরঞ্জীব প্রত্যয়রূপে জাতিতে যে সঞ্জীবিত করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যারা জনকল্যাণের লক্ষ্যে সমাজ পরিবর্তনে উদ্যোগী, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে দেশের সমস্যা সমাধান আগ্রহী, তাদের জন্যেও সাত নভেম্বরের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জিয়াউর রহমানঃ আমার সাক্ষ্য

সৈয়দ আলী আহসান

একাত্তরের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন তুমুলভাবে চলছে এবং ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনার প্রহসনলীলা তুঙ্গে উঠেছে, সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা নিষ্ত্র্নিয় ছিলাম না। আমি অনুভব করেছিলাম যে একটি দুর্যোগ আসছে। সুতরাং ছেলেমেয়েদের সকলকে আমি আমার সন্নিকটে আনতে চেয়েছিলাম। ঢাকায় আমার বড় মেয়ে মোহাম্মদপুরে তার নিজ বাড়িতে থাকত। এলাকাটি অবাঙালিদের। তাদের বাড়িতে ঢিল পড়তো রাতে। কখনও কখনও সরাসরি হুমকিও তাদের দেয়া হয়েছে। এ খবর পেয়ে আমি ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ আমার গাড়ি নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। পথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে বিকেলের দিকে মোহাম্মদপুর এলাকায় আমার মেয়ের বাড়ির কাছে মোড় ঘুরতে গিয়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়লো। একটি কাক তড়িতাহত হয়ে মরে মাটিতে পড়ে আছে। আর এক তলা বাড়ির কার্নিশে এক সারি কাক বসে আছে। এক একটি কাক কা কা করে মৃত কাকটির শরীর প্রায় ছুঁয়ে উড়ে চলে গেল। কাকগুলো তাদের মৃতের প্রতি শেষ বেদনা নিবেদন করলো। দৃশ্যটি দেখেই আমার ছেলেকে গাড়ি থামাতে বলেছিলাম। আমি গাড়িতে বসে সম্পূর্ণ দৃশ্যটি দেখলাম। সে দৃশ্যের কুশীলবরা হচ্ছে কাক এবং রঙ্গ মঞ্চ হচ্ছে বাড়ির কার্নিশ এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তা। আমি হঠাৎ কেন যেন শংকিত হলাম। শুনেছি ইতর প্রাণীরা পূর্বাহ্নেই অনুভব করে সংকট আসছে। আমার তখন মনে হল, হয়তো বিপদ শিগগিরই আসবে। সেদিন ছিল ২২ মার্চ। আমি চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি করে ঢাকায় এসেছিলাম আমার বড় মেয়ে, জামাই এং তাদের দুটি সন্তানকে নিয়ে যেতে।

মোহাম্মদপুরের বাসায় পৌছে মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম মনে আছে। মুনীর চৌধুরী রাতে দেখা করতে এসেছিলেন। পরদিন সকালে সবাইকে নিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করলাম। এবারও কোন বিঘ্ন ঘটেনি। শুধুমাত্র ব্রিজের কাছে ডাইভারশনের কাছে এসে কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমাদের গাড়ি ডাইভারশনের পথে নেমে ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় যখন এসেছে তখন উল্টোদিক থেকে আমাদের মুখোমুখি হর্ন বাজিয়ে একটি আর্মী জীপ উপস্থিত হল। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই পিছিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু জীপটি না এগিয়ে সেও পিছিয়ে গেল এবং আমাদের এগুতে বলল। আমরা যেই একটু এগিয়েছি জীপটি তখন আবার নেমে এসে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আমরা তখন পিছনে চালিয়ে একেবারে বড় রাস্তায় উঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। জীপটিও পিছনে পিছনে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের এগিয়ে আসতে বললো, কিন্তু আমরা ভয়ে এগুলাম না। তখন জীপটি এগিয়ে এল, বড় রাস্তায় পড়লো এবং আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে চললো। আমাদের গাড়ি পেরুবার সময় জীপের মধ্যে কয়েকজনের অট্টহাসি শুনলাম। এবং হঠাৎ একটি শুন্য মদের বোতল রাস্তায় এসে পড়ে ভেঙে খান খান হয়ে গেল। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গাড়িতে কোন আঘাত লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পৌঁছে দেখলাম, দেশে একটি কিছু যেন ঘটবে সকলেই তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। বিভিন্ন লোক, শিক্ষক এবং ছাত্র যুথবদ্ধ হয়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। কথাবার্তা চলছে। আশা এবং আকাঙ্ক্ষা ও উভয়ের মিলন ঘটলে যে এক রহস্যময়তার সৃষ্টি হয় তখনকার সময়ে সেই রহস্যময়তা ছাড়িয়ে ছিল। শুনলাম পরের দিন ২৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র এবং শিক্ষক সম্মিলিতভাবে একটি সভা আহবান করেছে, যে সভায় ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবে।

পরের দিন বিকেলে শহরে মিটিং ছিল। আমরা সবাই সেখানে গেলাম। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হল। বক্তৃতা করলেন অনেকে। সভা চলাকালে হঠাৎ খবর এলো সমুদ্র বন্দরে পাকিস্তান থেকে আগত জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামানো হচ্ছে এবং বাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে পাকিস্তানী সেনাদের সংঘর্ষ বেধেছে। আমরা খবর পেলাম যে, জাহাজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামাতে আপত্তি করায় বাঙালি শ্রমিকদের উপর গুলি চালানো হয়েছে এবং অনেক নিরীহ লোক নিহত হয়েছে। মাঝপথে আমাদের সভা ভেঙে গেল। আমার ছোট মেয়ে এবং জামাতা দেব পাহাড়ে থাকতো। আমি গাড়ি নিয়ে সেখানে গেলাম এবং তাদেরকে আমার সঙ্গে ক্যাম্পাসে নিয়ে এলাম। দুর্ঘটনার মুহূর্তে আমি আমার ছেলেদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চাইনি। সবাইকে তাই একত্রিত করেছিলাম। বড় মেয়েকে তো আগের দিনই ঢাকা নিয়ে এসেছিলাম। পরের দিন ছোট মেয়েকে। যা হোক সেদিন শহর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফেরা খুব সহজ হয়নি। আমাদের যাবার পথে ক্যান্টনমেন্ট পড়ে। সেসব রাস্তায় চলাচল ব ছিল। বড় বড় গাছ কেটে এবং আড়াআড়ি কিছু ট্রাক সাজিয়ে রাস্তায় চলাফেরা বিঘ্নিত করা হয়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামের কাঁচা মাটি এবং খোয়া ফেলানো পথ দিয়ে অনেক সময় নিয়ে রাত প্রায় ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে ফিরলাম। রাতের বেলা গ্রামের পথ দিয়েই গিয়েছিলাম। সুতরাং আশেপাশে জঙ্গল এবং বন্যফুলের সমারোহ চোখে পড়েনি, কিন্তু তাদের গ পেয়েছিলাম। একজন ইংরেজ কবি এরকম অবস্থার বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ “শংকিত পথে অকার ফুলগুলো কোন আশ্বাস আনে না। তাদের সুগ ক্রমশ হারিয়ে যায় পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে।”

পঁচিশ তারিখ সারাদিন মানুষের আনাগোনা চলছিল বিভিন্ন এলাকায়। শহর থেকে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এসেছিলেন। স্যার দিকে ইষ্ট বেঙ্গল রাইফেলস-এর একটি প্লাটুন বর্ডারের রক্ষণাবেক্ষণনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিল। গ্রামের লোকেরা এদের জন্য প্রচুর খাবারের ব্যবস্থা করলো। তখন আমাদের সকলের মধ্যে একটি মাত্র বিশ্বাস সমুচ্চারিত যে আমরা বাংলাভাষী এক ও অভিন্ন। যারা বাংলায় কথা বলে তাদের সকলেই এখন একত্রিত হবে একটি বিশ্বাসের সচলতায় যে এ দেশ আমার। আমার মনে হয় তখন এই বিশ্বাসটি নির্মাণ করতে হয়নি, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবেগের অন্তঃসার হিসাবে উৎসারিত হয়েছে। আমরা তখন চিন্তা করছিলাম না ভবিষ্যতে আমাদের কি হবে। আমরা একটি আন্তরিক ভাবাবেগের প্রবল প্রবাহকে আশ্রয় করেছিলাম। সারাদিন বিভিন্ন সময় আমরা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যোগাযোগের স্থান ছিল দুটো- ইত্তেফাক অফিস ও মুজিবুর রহমানের বাড়ি। কিন্তু স্যার একটু পরে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখনই ভয় হয়। কিছু একটা হতে পারে তা আমাদের অনুমান করার সাধ্য ছিল না। বিপদের আশঙ্কা আমরা ব্যাখ্যা করি ঝড় আসবে বলে। এ দেশে আমরা প্রকৃতির তাণ্ডবকে দেখেছি। তাই প্রকৃতির উপমা আনি, আমরা বলি ঝড় আসবে, প্রচণ্ড সব বৃক্ষ উৎপাটিত হবে, লোকালয় ধুলায় আচ্ছাদিত হবে, বন্যায় গৃহাঙ্গন প্লাবিত হবে। সে বিপদকে রোধ করতে পারে না। সে ভেসে যায় এবং ধ্বংসের লীলা-নৈপুণ্যে সে নিশ্চিহ্ন হয়। আমার এক বিদেশী বু সব সময় বিপর্যয়ের সঙ্গে পাহাড় ভেঙে পড়ার উপমা দিতেন। তিনি ছিলেন জার্মান হাইডেলবার্গের লোক। চতুর্দিকে সব সময় পাহার দেখতেন তাই পাহারের কথাটি তার অনিবার্যভাবে মনে পড়েতো। তিনি বলতেন, পাহাড় যখন ভেঙে পড়ে তখন প্রস্তর খণ্ডগুলো প্রচণ্ডবেগে নিম্নাভিমুখে ছুটতে থাকে। তার গতিরোধ করার সাধ্য কারো থাকে না। পাথরগুলো প্রচণ্ড গতিতে সম্মুখের সমস্ত কিছুকে নিশ্চহ্ন করে ছুটে চলে। ধ্বংসের অনিবার্যতা তো একেই বলে।

২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমরা প্রায় সারা রাত জেগেই কাটিয়েছিলাম। রাত ১টা পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন জনের বাড়িতে বসে আলাপ-আলোচনা করেছি কর্তব্য নির্ধারণের জন্য। কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কিছুই নির্ধারণ করতে পারিনি। একটি প্রধান চিন্তা ছিল ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বিভিন্ন পরিবারকে কিভাবে রক্ষা করা যায়। এখনও তো সম্ভাব্য ভয়াবতার চিত্র উদঘাটিত হয়নি। তাই আমরা দ্রুত রাতের অবসান চাচ্ছিলাম। এবং দিনের আলোয় কর্তব্যের কথা চিন্তা করব ভেবেছিলাম। সে সময়কে রূপক করে বলা যায়, আমাদের দক্ষিণ দিকে নিস্তব্ধতা, বামদিকে নিস্তব্ধতা, আমাদের সম্মুখ ও পশ্চাতে নিস্তব্ধতা। শুধু আমাদের মাথার উপর আকাশে বাংলা বর্ণমালার সবক’টি অক্ষর ছড়িয়ে আছে। সেখান থেকেই বেদনা ও প্রতিবাদের শব্দগুলো সংগ্রহ করতে হবে।

রাত কাটলো সুগভীর নিদ্রায় নয়, তন্ত্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। প্রায় জেগে উঠেছি আশঙ্কায় এবং বিমূঢ়ভাবে। সকালে শয্যা ছেড়ে মাঠে কবুতরের খাঁচার দিকে এগিয়ে গেলাম। এটা আমার রোজকার অভ্যাস। দরজা খুলে গম অথবা ধান মাঠে ছিটিয়ে দেই, কবুতরগুলো প্রচুর পবিত্র শুভ্রতায় শেফালী ফুলের মতো খাদ্যকণার উপর ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো। কবুতরের ঘরের দরোজা খুলে দিয়ে মাঠের মধ্যে ধান ছড়িয়ে আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম কিন্তু কবুতরগুলো খাবারের দিকে এগিয়ে এল না। ওরা খাঁচার সামনে একটু ঘুরে ওদের ঘরের ছাদের ওপর বসলো। ১২টির মতো কবুতর ছিল। সবক’টি প্রায় সাদা, একটি দুটি খয়েরী রঙের। হঠাৎ কবুতর ক’টি এক সঙ্গে উড়তে লাগলো। পাখা ঝাপটিয়ে প্রথম একটি উড়লো, পরে দোতলা বাড়ির ছাদ পর্যন্ত উড়লো। পরে সবকটি পাহাড়ের মধ্যে ক্রমশ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেল। আমি আমার জীবনের এরকম দৃশ্য কখনও দেখিনি। সে-মূহূর্তে আমি জানলাম যে, ঢাকায় ভয়ানক কিছু ঘটেছে এবং আমাদের জীবনেও আমরা একটি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ দিকে প্রায় লাগোয়া ছিল ক্যান্টনমেন্ট। আমরা রোজই দেখতাম যে হেলিকপ্টার উড়ে ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছে এবং যাবার সময় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উপর কয়েক বার ঘুরে যাচ্ছে। তাছাড়া কুমিরার দিক থেকে পাকিস্তানী সৈন্য চলাচলের সংবাদও পাওয়া যাচ্ছিল। প্রথম কয়েকদিন চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কবলিত হয়নি। সে সময় মেজর জিয়া নামক একজন সৈনিকের নাম শুনছিলাম যিনি কালুরঘাটে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করছিলেন। পঁিচশ তারিখে জিয়াউর রহমান অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ব্যাটালিয়নের সকল সৈন্যকে একত্রিত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবার সংকল্প ঘোষণা করেন। তারপর তিনি কালুর ঘাটে যান এবং সেখানে বাঙালি সৈনিকদের সংঘবদ্ধ করেন। কালুরঘাটে ট্রান্সমিশন স্টেশন ছিল। সেখান থেকে জিয়ার কণ্ঠে আমি প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী শুনতে পাই তিনি ঘোষণা করেন যে- “আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছি। আপনারা যে যেখানে আছেন, সামরিক ও বেসামরিক লোকজন, আপনাদের সহযোগিতা আমাদের কাম্য। সবাইকে অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।” জিয়াউর রহমান তাঁর সেই ঘোষণায় বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলেন এবং স্বদেশবাসীকে স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে বললেন। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা-বাণী যখন আমি শুনলাম সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের আশা ও উদ্দীপনার একটি তীব্রতম মুহূর্ত ছিল। যখন চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা এবং সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের অভাব ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণার দাবী একটি বিস্ময়কর অভিভূত মানসিকতার সৃষ্টি করেছিল। আমি তখন ভাবতে পেরেছিলাম যে কোন কিছুই হারিয়ে যায়নি। আবার সবকিছু ফিরে পাবার সম্ভাবনা আছে। অভিভূত অবস্থায় আমার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। একজন অপরিচিত সৈনিকের কণ্ঠস্বরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আমাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা এনে দিল। আজ এতদিন পরে সেই মুহূর্তেই বিহ্বল মানিসকিতা ব্যাখ্যা করে গুছিয়ে বলতে পারব না। বর্তমানে এই স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে বহু কাল্পনিক উপকথার সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু আমার চৈতন্যে জিয়ার কণ্ঠস্বর আজও অনুরণন বিদ্যমান রেখেছে। এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, বিশ্ববাসী জিয়ার কণ্ঠস্বরই শুনতে পেয়েছিলেন। এবং তার ফলে বিশ্বের সর্বত্র বাংলাদেমের সপক্ষে প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়েছিল। যে মুহূর্তে চরম অসহায়তার মধ্যে আমাদের সময় অতিবাহিত হচ্ছে এবং আমরা ভাবতে সক্ষম হচ্ছিলাম না কী করে প্রতিরোধ গড়ে তুলব বা মুক্তি পাব, ঠিক সে সময়ই জিয়ার ঘোষণায় আমাদের অস্তিত্বের জন্য একটি স্বীকৃতি নির্মাণ করলো। আমাদের কিছু নেই তবু যেন মনে হলো আমাদের সব আছে, যেহেতু আমাদের ইচ্ছা আছে এবং বাঁচবার সাধ আছে। সুতরাং আমাদের সবই তো আছে। অসহায় মুহূর্তে আমাদের জন্য এই বরাভয়টি একান্ত প্রয়োজন ছিল। আমার জীবনের সকল মুহূর্তে যেন একটি মুহূর্তে একাকার হয়েছিল। আমি জীবনকে অনুভব করতে পেরেছিলাম এবং অশ্রুসজল দৃষ্টিতে সময়কে অভিষিক্ত করেছিলাম।

জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এবং কৌশলে বাঙালি সৈনিকদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে সকলকে একত্রিত করে বিদ্রোহ ঘোষণা জিয়াউর রহমানই প্রথম করেছিলেন। ৮ বেঙ্গলে যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার ছিলেন তাদের তিনি গ্রেফতার করেছিলেন। ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া সে সময় বী হয়েছিলেন। তাকে পরে হত্যা করা হয়েছিল। সংকট মুহূর্তে চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মধ্যেই একজন সেনাপতির দক্ষতা ও চাতুর্য প্রমাণিত হয়। জিয়াউর রহমান সেই দক্ষতা ও চাতুর্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অবস্থান ক্রমশ শংকাকুল হয়ে পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের বাসগৃহগুলোকে অরক্ষিত রেখেই ৩০ মার্চ সরে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম কুণ্ডেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে। কুণ্ডেশ্বরী রাউজান থানার অন্তর্গত। কুণ্ডেশ্বরীর মালিক বাবু নতুন চন্দ্র সিংহ আমাদের সবার আশ্রয়ের জন্য ব্যবস্থা করে আনন্দিত হয়েছিলেন। কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যালয়টি একেবারেই বড় সড়কের পাশে সম্পূর্ণ অরক্ষিত। রাত্রিবেলা প্রায়ই নানাবিধ শংকায় আমাদের জেগে উঠতে হতো। এদিক-ওদিক সৈন্য চলাচলের সংবাদ শুনতাম। কখনও বিদ্যালয় গৃহটি আক্রান্ত হবে এমন আশংকার খবর আসতো। শেষ পর্যন্ত সকলের পরামর্শে আমরা কুণ্ডেশ্বরী পরিত্যাগ করে প্রথমে নাজিরহাট এবং কাঁটাখালি হয়ে রামগড়ে উপস্থিত হলাম। আমরা কুণ্ডেশ্বরী ছাড়লাম ৭ এপ্রিল তারিখে। সে সময় একটি সিদ্ধান্তে আমাদের আসতে হয়েছিল। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম কোন গ্রামে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকব। শেষ পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় যে সীমান্ত এলাকায় যাওয়াই ভাল। কেননা সেনাবাহিনী আমাদের পশ্চাদ্ধাবন করছে এবং গ্রামাঞ্চলে গিয়েও আমরা রক্ষা পাব না। সীমান্তে যদি যাই তাহলে প্রয়োজনবোধে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতীয় এলাকায় যাওয়াই ভাল। রামগড়ে পৌছে জিয়াকে প্রথম চাক্ষুষ দেখলাম। তাঁর চোখে কালো চশমা ছিল এবং মুখ ছিল শ্মশ্রুমণ্ডিত। তিনি বিশেষ কোন কথা বলেননি।

পহেলা বৈশাখ তারিখে আমরা সীমান্ত অতিক্রম করার নির্দেশ পেলাম। জিয়াউর রহমান আমাদের জানালেন যে, কোন সিভিলিয়ানের তখন আর রামগড়ে থাকা নিরাপদ নয়। কেননা অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানী বাহিনী সেখানে এসে পড়বে। আমাদের পরিবার-পরিজনের জন্য বাসের ব্যবস্থা করে আমি, ড. মল্লিক, তৌফিক ইমাম এবং আরো কয়েকজন রামগড়ের সীমানা পেরিয়ে আমরা আগরতলার দিকে রওয়ানা হলাম। এ সময়কার একটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে সাবরুমের রাস্তায় একদল ভারতীয় স্কুল ছাত্রের সাক্ষাৎ। ছাত্ররা আমাদের জীপ থামিয়ে জীপের চারদিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গান করতে লাগলো। ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে।’ সিকান্দার আবু জাফর এই গানটি লিখেছিলেন কিছুদিন আগে। তখন এ গানটির তাৎপর্য বুঝতে পারিনি। অপরিচিত পরিমণ্ডলে শংকিত সময়ের প্রেক্ষিতে গানটির বাণী আমার কাছে অসাধারণ তাৎপর্যবহ মনে হলো। আমার মনে হলো ঠিক এমন করে হৃদয়ের সর্বস্ব দিয়ে কেউ হয়তো তার জাতির বেদনাকে রূপ দিতে পারেনি। সে-মুহূর্তে ইমোশন প্রবল ছিল। তাই হয়তো গানটিকে অসাধারণ মনে হয়েছিল। তবে অসাধারণ তো বটেই, তার কারণ- আমাদের সংকটের মুহূর্তে এ- গানটি আমাদের জন্য সমর্থন ও সহায়তা এনেছিল। আগরতলায় আমাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় এম. আর. সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি এবং মাহবুব আল চাষী আগরতলায় একটি বাংলাদেশ মিশন খুলেছিলেন। আমাদের পরিজনবর্গ আগরতলায় এসে পৌঁছায় বিকেল বেলায়। প্রথম রাতের জন্য আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম আগরতলা গ্রান্ড হোটেলে। নামটি গ্রান্ড কিন্তু কর্মব্যবস্থা অত্যন্ত সাধারণ এবং মলিন। হোটেলটি ছিল আগরতলা রাজপরিবারের। সে-রাতেই আমাদের সাথে দেখা করেন মওদুদ আহমদ ও সাদেক খান। একটু বেশি রাতে এম. আর. সিদ্দিকী সাহেবও হোটেলে এলেন এবং পরের দিন তিনি কলকাতায় যাবেন বললেন। আমাদের প্রস্তুত থাকতে বললেন। আমরা একরাতই গ্রান্ড হোটেলে ছিলাম। পরের দিন আগরতলার সরকার পরিসংগড়ে একটি পলিটেকনিক স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

আমি যে মাস পর্যন্ত আগরতলায় ছিলাম। সে-সময় দু’বার সাবরুমে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মব্যবস্ততা দেখতে এসেছিলাম। আমার সঙ্গে রশীদুল হক ছিলেন। জিয়াউর রহমানকে সে-সময় আবার দেখলাম দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্ব মুহূর্তে ব্যাকুল ও কর্মতৎপর। জিয়াউর রহমান একজন আশ্চর্য নিষ্ঠাবান সৈনিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতাও প্রমাণিত হয়েছে কয়েকটি অবস্থায়। বাংলাদেশে সৈনিকদের সংখ্যা ছিল কম। সুতরাং অনবরত সংঘর্ষের মুখে এদের ঠেলে না দিয়ে তিনি এদেরকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন। এই সংঘবদ্ধ করার মধ্যে তিনি যে কৌশল প্রমাণ করেছিলেন তা অনন্যসাধারণ। প্রথমে কালুর ঘাটে একত্রিত করেছিলেন, পরে রামগড়ে। এবং রামগড় যখন আক্রান্ত হল তখন ভারতীয় এলাকা সাবরুম থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। হতাহতের সংখ্যা যাতে আমাদের পক্ষে কম হয় সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল। সম্পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়ে তিনি ঐকান্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন বলে জয়ের সম্ভাবনা আমাদের সহজ হয়ে আসছিল। আমি কলকাতায় চলে যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জিয়াউর রহমানের আর দেখা পাইনি। মে মাসের শেষে আমি কলকাতায় যাই এবং পাম এভিনিউতে ব্যারিস্টার সালামের বাড়িতে অবস্থান করতে থাকি। সালাম সাহেবের ওখানে বাংলাদেশের তিনজন ছিলাম আমি, মওদুদ আহমদ এবং সাদেক খান। কলকাতায় থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে গিয়েছি এবং বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রেখেছি।
আমি স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরতে পারিনি। তখন সকলেই দ্রুতগতিতে দেশমুখী হচ্ছিলেন। তাই ইন্ডিয়া এয়ার লাইনসে পর্যায়ক্রমে সকলের ব্যবস্থা হয়েছিল। আমি জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে দেশে ফিরেছি। দেশে ফিরে মনে হয়েছিল একটি নতুন প্রত্যুষে আমি যেন নতুন সূর্যোদয় দেখছি। ঠিক সেই মুহূর্তের মানসিক অবস্থার কথা ব্যাখ্যা করে বলতে পারব না। একটি নতুন চৈতন্যের প্রান্তরে আমি নিজেকে উপস্থিত দেখে অভিভুত হয়েছিলাম।

দেশে ফিরে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে অনেকদিন সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিযুক্ত হয়েছিলেন যখন দেশে শেখ মুজিবের প্রশাসন চলছে। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের মধ্যে ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা চলছিল। যে ছাত্রদলটি সরকারী সাহায্যপুষ্ট হয়ে অত্যন্ত হিংস্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে অরাজকতার সৃষ্টি করছিল তাদের তাড়নায় প্রশাসনকে গ্লানিমুক্ত রাখা কঠিন হচ্ছিল। যে কাজগুলো একান্তভাবে ছাত্রদের নিজস্ব সেখানেও কতৃêপক্ষের হস্তক্ষেপ ঘটছিল। হলে ছাত্র সমিতির নির্বাচন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বার্ষিক নির্বাচন কোনটাতেই নিরপেক্ষতা ছিল না। ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পরাজয়ের সম্ভাবনা হলে অস্ত্র ব্যবহার করে জয়লাভের চেস্টা- এটা একটা রীতিতে পরিণত হয়েছিল। আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সমস্ত অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছিলাম। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল যে, দেশের নেতৃপদে যারা নিযুক্ত তাদের পারিবারিক অধিকার ছাত্রদলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি বিশেষ ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিত যারা, তাদের নীতিবিরোধী বিরোধী বিশৃংখলা আচরণ ও হঠকারিতা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রদল নির্বাচনে জয়লাভ করে তারা ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অঙ্গদল। একই ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একটি সরকার পক্ষে যোগ দিল এবং অন্যটি একটি বিরোধী পক্ষ নির্মাণ করলো। এই বিরোধী পক্ষটাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবল ছিল। এদের প্রতাপ খর্ব করবার জন্য সরকারপক্ষীয় ছাত্রদল বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে প্রবেশে করে অরাজকতার সৃষ্টি করতো। এই অরাজকতার চরম পরিণতিতে রোকন নামক কেন্দ্রীয় সংসদের সম্পাদক নিহত হয়। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। এ সমস্ত ঘটনায় আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। আমি চাচ্ছিলাম সকল প্রকার অন্যায়-প্রতাপের অবসান হোক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে সরকারী হস্তক্ষেপ ব হোক। দুর্ভাগ্যক্রমে তা হবার ছিল না। দেশ স্বাধীন হবার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদলকে সরকারী হিংস্রতার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা সেই যে শুরু হয়েছিল আজও তার উদ্যম ব্যাহত হয়নি। সরকারী ছাত্রদলের চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার দরুন ১৯৭৫ সালে আমি উপাচার্য পদ থেকে অপসারিত হই। আমি আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পূর্বতন কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করি।

চট্টগ্রাম থাকতে কক্সবাজারের পথে চুনতি বলে একটি এলাকায় একজন সূফীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটলো। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী এবং সর্বত্যাগী পুরুষ ছিলেন। এঁর এখানে জিয়াউর রহমানের নাম নতুন করে শুনলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান চুনতির শাহ সাহেবের দোয়া চেয়েছিলেন। একথা ওখানকার লোকেরা আমাকে জানালো তাছাড়া আর একটি ঘটনার কথা আমি শুনলাম যে, কুমিল্লা থেকে একটি একটি হেলিকপ্টার যোগে চট্টগাম আসার পথে হেলিকপ্টারটি যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য চুনতিতে নামতে বাধ্য হয়। হেলিকপ্টারটি বিকল হয়ে যায় কিন্তু জিয়াউর রহমান অক্ষত থাকেন। এর ফলে চুনতি শাহ সাহেবের প্রতি জিয়াউর রহমানের একটি প্রগাঢ় ভক্তি সৃষ্টি হয়। এই ভক্তিটি শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। আমি কোন অলৌকিক ঘটনার কথা বলছি না। কিন্তু একজন মানুষের বিশ্বাসের সরলতার কথা বলছি। চুনতির শাহ সাহেব আমাকে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বলেছিলেন, “এই লোকটি আন্তরিকভাবে একজন বিশ্বাসী মুসলমান। আল্লাহ্‌ তা’আলা নিশ্চয়ই একে সাহায্য করবেন।” জিয়াউর রহমানের কাছেও আমি চুনতির শাহ সাহেবের সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। বাংলাদেশের বিভিন্ন পীরদের খানকা আছে। এই খানকাগুলোর কোন কোনটা মূলত রাজনৈতিক এবং জাগতিক । কিন্তু চুনতি ছিল সর্বত্যাগী মানুষদের আশ্রয়স্থল। চুনতির শাহ সাহেবের জাগতিক এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না। জিয়াউর রহমানের মুখে এ- কথা আমি যেমন শুনেছি, আমি নিজেও এর প্রমাণ পেয়েছি। যথার্থ ত্যাগ ও বিনয়ের সাথে আল্লাহর পথে অগ্রসর হওযা কাকে বলে চুনতির শাহ সাহেব ছিলেন তার নিদর্শন। জিয়াউর রহমান তা জানতেন এবং সে জন্য চুনতির শাহ্‌ সাহেবের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছিল।

১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়, সংবাদপত্রের সরকারীকরণ হয় এবং একনায়কত্বের নিষ্ঠুর লীলা বৈচিত্র্যের পটভূমি প্রস্তুত হয়। পার্লামেন্টে আইন পাস করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয়। এজন্য জনসাধারণ প্রস্তুত ছিল না। দেশের অগণিত মানুষের কোন অঙ্গীকার এখানে ছিল না। শুধুমাত্র ক্ষমতালোভী দর্পীরা নিজেদের অধিকার চিরস্থায়ী করবার জন্য বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। সেই সময় যেভাবে এ দেশের দুর্বল মানুষ বাকশালকে স্বাগত জানিয়েছিল তা আমাদের জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্ক হয়ে চিরদিন বিদ্যমান থাকবে।

১৩ আগস্ট ’৭৫-এ আমি ঢাকায় এলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভাইভা পরীক্ষা নেয়ার জন্য। আমি টি.এস.সি গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখি প্রচুর আয়োজন চলছে। শুনলাম ১৫ আগষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী সম্প্রদায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ মুুজিবের সামনে বাকশালে যোগদান করবেন সেজন্য ব্যবস্থা চলছে। টি.এস.সিতে স্যায় আমার কক্ষে বাংলা বিভাগের সানজিদা খাতুন দেখা করতে এলো। সে জানালো যে, সে বাকশালে যোগ দেবে না। আমি বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরীর শর্তের মধ্যে বাকশাল যোগ দেয়ার কথা নেই। তাছাড়া বাকশালে যোগ দেয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নির্দেশ নেই। সুতরাং যারা যোগ দেবেন তারা নিজ দায়িত্বেই যোগ দেবেন এবং যারা যোগ দেবেন না তারাও নিজ দায়িত্বেই যোগ দেবেন না। আমি এর বেশি কিছু বলিনি। পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে ভাইভা নিয়ে বেরিয়ে আসছি যখন, তখন কয়েকটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তখন একটা জীপ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উপস্থিত ছিল। জীবটি তখন কতকগুলো ছেলের পিছনে ধাওয়া করলো। আমি স্যায় বিমর্ষ অবস্থায় আমার কক্ষে একাকী অবস্থান করছিলাম। সে সময় জনাব শহীদুল্লাহ নামে একজন খ্যাতনামা প্রকৌশলী আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। শহীদুল্লাহ্‌ সাহেব রাজনীতির একজন অত্যন্ত সুচতুর ব্যাখ্যাকার। তিনি আমার সঙ্গে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। বললেন, “দেশে গভর্নর প্রথা চালু হয়েছে। বাকশালও একটা স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে যাচ্ছে। এর ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আরো অর্ধশতাব্দী কাল নিজেদের শাসন কায়েম রাখবে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু সমস্ত কিছুই এক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল, তাই সে ব্যক্তির পরিবর্তন ঘটলে সকল পরিকল্পনা ভেঙে যাবে।” আমি শুধু বললাম, “আমরা দেশকে স্বাধীন করেছিলাম দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। ব্যক্তি বিশেষ অথবা কোন পরিবারের অথবা কোন দলের কল্যাণের জন্য নয়। কিন্তু বর্তমানে দেশের মানুষ অস্বীকৃত হচ্ছে একটি পরিবার এবং সে সঙ্গে উক্ত পরিবার শাসিত একটি দল দেশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসছে এই রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্ত না হলে সাহিত্য-সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটবে না।”

পনের তারিখে খুব সকালে রেডিও খুলে পরিবারস্থ সকল সদস্যসহ শেখ মুজিরে নিহত হবার সংবাদ পেলাম। প্রথমে অবিশ্বাস জেগেছিল। পরে হতভম্ব হয়েছিলাম। কিছুতেই এ অবস্থাকে জীবনের স্বাভাবিক গতিধারায় সাথে মেলাতে পারছিলাম না। তবে কথা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীতে বিস্ময়ও ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিকতা পায়। আবার লোকজন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা আরম্ভ করলো। নতুন প্রশাসনকে প্রায় সকলেই সমর্থন জানালো। এর কয়েক মাস পর আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হলাম। তখনই একদিন দেশে আবার সংঘর্ষের সুত্রপাত ঘটে। খোন্দকার মোস্তাক সরে যান। খালেদ মোশাররফ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তার পতন ঘটে এবং জিয়াউর রহমান চীপ স্টাফ নিযুক্ত হন। প্রধান বিচারপতি সায়েম সাহেব রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। ডি.সি.এম.এল. এ হিসাবে জিয়াউর রহমান তখন অন্য কয়েকটি বিষয় ছাড়াও ফাইন্যান্স এবং শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলি দেখছিলেন। সেইসূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুদান বৃদ্ধির দাবি নিয়ে আমি ইংরেজি বিভাগের আমানুল্লাহ্‌ আহমদকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ক্যান্টনমেন্টে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথমবার জিয়াউর রহমানের মুখোমুখি হলাম। আমি আমার পরিচয় দিলাম এবং মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর সাথে যে সাক্ষাৎ হয়েছিল সেকথা বললাম। তিনি আমার কথাগুলো শুনলেন কিন্তু মন্তব্য করলেন না। পরে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো বললাম এবং আর্থিক ঘাটতির অবস্থা ব্যাখ্যা করে বিশেষ অনুদানের জন্য আবেদন জানালাম। তিনি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি টেলিফোন করলেন। পরে জানালেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি হল নির্মাণের জন্য এবং একটি স্পোর্ট প্যাভেলিয়ানের জন্য অর্থ সাহার্য তিনি মঞ্জুর করবেন।

আমি লক্ষ্য করলাম যে তিনি কথা বেশি বললেন না। কিন্তু তাৎক্ষণিভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্তব্য সমাধান করলেন। জিয়ার চরিত্রের এই বিষয়টি আমাকে সব সময় মুগ্ধ করেছে। তিনি বেশি কথা বলতেন না। প্রয়োজনের অধিক গল্প-গুজব করতেন না এবং একান্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ দিতেন না। সেদিন জিয়াউর রহমানের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আমরা মঞ্জুরের কক্ষে গেলাম। মঞ্জুর তখন ব্রিগেডিয়ার এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ। মঞ্জুর আমার স্নেহভাজেন ছিল। এর কথা আমি আগেই জানতাম সে আমাদের কফি খাওয়ালো এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার বিষয় নিয়ে কিছু ঘটনা বললো।

এরপরে আমাকে প্রায়ই ঢাকায় আসতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত অথবা শিক্ষার পরিবেশ সংক্রান্ত কোন আলোচনা থাকলে ক্যাবিনেট মিটিং-এও আমাকে ডাকা হতো। একটি প্রথা তখন প্রচলিত হয়েছিল যে, ক্যাবিনেটে কখনও কখনও মন্তব্য ও উপদেশের জন্য বাইরের লোকদেরও ডাকা হতো।

জিয়াউর রহমান পরিবেশ কমিটি নামে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব ক্যাবিনেটে করেন। এই প্রস্তাবটি যখন উপস্থাপিত হয় তখন আমি ক্যাবিনেটের সভায় উপস্থিত ছিলাম। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এবং আমাকে উক্ত কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে একজন, সরকারী কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে কয়েকজন, বেসরকারী কলেজের অধ্যক্ষদের মধ্যে কয়েকজন এবং বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থা দূরীকরণের জন্য কিছু প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করা। সিলেবাস, সেশন জট, পরীক্ষায় কার্যক্রম ইত্যাদি সকল বিষয়েই কথা বলবার অধিকার এ কমিটিকে দেয়া হয়েছিল। যতদিন এই কমিটি ছিল ততদিন শিক্ষা সংক্রান্ত কোন সমস্যা দেখা দিলে কমিটি তা নিয়ে আলোচনা করতো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গদল হিসাবে ছাত্র সংগঠন থাকা উচিত কি উচিত নয় তা নিয়েও এই কমিটি পর্যালোচনা করেছিল। এই কমিটি গঠনের ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের দূরদর্শীতার পরিচয় পেয়েছিলাম।

জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রীসভায় যোগদানের পূর্বে আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত, তখন সরকার বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ‘ইনকোয়ারী কমিশন’ গঠন করে। আমি এই ইনকোয়ারীর বিরুদ্ধে ছিলাম; আমি জিয়াউর রহমানকে বলেছিলাম যে এই ইনকোয়ারী আইনত অসিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসারে এই ইনকোয়ারী করবার একমাত্র অধিকার মঞ্জুরী কমিশনের। দ্বিতীয়ত ইনকোয়ারী কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল তিনি ছিলেন একজন ব্যাংকার। জীবনে তিনি কোনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাছাড়া আর একটি ব্যাপার ঘটেছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ইনকোয়ারীর বাইরে রাখা হয়েছিল। আবুল ফজল সাহেব তখন শিক্ষা উপদেষ্ঠা হিসেবে যোগদানের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। তারই চেষ্টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইনকোয়ারীর আওতার বাইরে ছিল। আমি ব্যক্তিগতবাবে জিয়াউর রহমানের কাছে এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানাই। যদিও ইনকোয়ারী ব করা যায়নি কিন্তু ইনকোয়ারী সম্পর্কে সরকারী মনোভঙ্গীর কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল এবং চট্টগ্রামসহ সকল বিশ্ববিদ্যালয় এর আওতায় পড়েছিল। আবুল ফজল সাহেবের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইনকোয়ারী রিপোর্ট সরকারের কাছে আসে এবং ক্যাবিনেটে উপস্থিপিত হয়। রিপোর্ট প্রকাশের ফলে প্রচুর বাক-বিতণ্ডা শুরু হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন আমূল সংশোধননেরও চেষ্টা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগদানের পর আমি এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করি এবং মূলত তাঁরই সমর্থন নিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টগুলো কোল্ড স্টোরেজ বা ঠাণ্ডা গুদামে চলে যায়।

জিয়াউর রহমান পূর্ণভাবে ক্ষমতায় আসার পর অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমাকে বারবারই তাঁর কাছে থেকে কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। আমি অনেকদিন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের অনুরোধ এড়াতে পেরেছিলাম কিন্তু অবশেষে তাঁর একটি কথায় দুর্বল হয়ে পড়ি। তিনি আমাকে বললেন, “আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যবস্থা প্রচুর। বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল শিক্ষার ক্ষেত্রেও তেমনি। এ সমস্ত অব্যবস্থা আপনাকে দূর করতে হবে।” আমার এই মন্ত্রিসভায় যোগদান আমার শুভানুধ্যায়ী অনেকেই পছন্দ করেননি। শান্তি নিকেতনের প্রবোধ চন্দ্র সেন এ বিষয়ে অনুযোগ করে আমার কাছে পত্রও লিখেছিলেন।

আমাদের দেশে প্রকৌশল শিক্ষা সম্পর্কে আমার সব সময় সন্দেহ ছিল। আমি বিশ্বাস করতাম এবং এখনও করি যে, আমাদের দেশের মতো দরিদ্র দেশের জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অর্থ ও মেধার অপচয়। যেখানে পৃথিবীর সকল দেশে পলিটেকনিকে উপর গুরুত্ব আরোপ করে বিভিন্ন পেশার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং একটি দেশের সর্বপ্রকারের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে কর্মী নির্মাণের চেষ্টা চলছে সেখানে আমাদের দেশে শুধুমাত্র বিপুল আয়তনের ভবন নির্মানের জন্য প্রকৌশলী তৈরি করা গুরুতর অন্যায়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাস করে বেরিয়েছে তারা প্রায় প্রত্যেকেই বিবিধ ভবন নির্মাণের প্রকল্পের সাহায্যে ব্যক্তিগতভাবে ধনী হয়েছে, কিন্তু তাতে দেশের সাধারণ মানুষর দুর্দশার লাঘব ঘটেনি। আমি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে দেখলাম যে, বাংলাদেশের পলিটেকনিকগুলো অবহেলিত এবং সেখানকার ছাত্রদের উচ্চতর জ্ঞান আহরণেরও কোন সুযোগ নেই। পলিটেকনিক থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সহজ কোন ব্যবস্থা ছিল না। পলিটেকনিক একটি বিচ্ছিন্ন শিক্ষাধারা হিসেবে অবহেলিত ছিল। আমি কার্যভার গ্রহণের পর সারা দেশব্যাপী পলিটেকনিক ছাত্রদের স্ট্রাইক আহূত ছিল। আমি স্ট্রাইকের মূল কারণ অনুসান করে জিয়াউর রহমানের কাছে আমার সিদ্ধান্ত পেশ করি। আমার সিান্ত ছিল যে, লেদার ইনস্টিটিউট, টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো আপগ্রেডেড করতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিসভায় এর প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন মরহুম ডক্টর রশীদ। এবং তখন জিয়াউর রহমানের আন্তরিক সমর্থন না থাকলে এই ইনস্টিটিউটগুলো আপগ্রেডেড করা সম্ভব হতো না। এভাবে জিয়াউর রহমানের পূর্ণ সম্মতি এবং সহৃদয় সহানুভূতি পেয়েই কয়েকটি ইস্টিটিউট ডিগ্রি কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে এবং তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। এ সমস্ত ইনস্টিটিউটের পাঠ্যক্রমকে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত করবার জন্য জিয়াউর রহমানের নির্দেশে আমি বিলেতে যাই এবং সেখানকার বিভিন্ন পলিটেকনিক শিক্ষা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখে আসি। বৃটিশ কাউন্সিল এ ব্যাপারে আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। প্রকৌশল শিক্ষাক্ষেত্রে অন্য একটি অব্যবস্থা আমার দৃষ্টিতে পড়েছিল। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর কোন সম্পর্ক ছিল না। এই কলেজগুলো প্রায় বিপর্যস্ত অবস্থায় এসে পড়েছিল। এগুলো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, এ্যাফিলিয়েটেডও ছিল না। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কতৃêপক্ষ শুধুমাত্র তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এই এ্যফিলিয়েশনের বিরোধিতা করে আসছিল। আমি যখন দেখলাম যে এই বিরোধিতা দূর করা সম্ভব হবে না, তখন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলো পরিচালনা এবং শিক্ষাক্রমের ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উচ্চতর বোর্ড গঠনের জন্য প্রস্তাব করি। বোর্ডটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসাবে কাজ করে এই আমার পরিকল্পনা ছিল। এই প্রস্তাবটি আরো গভীরভাবে পরীক্ষা করি। কিন্তু এবারও ডক্টর রশীদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে প্রস্তাবটি আরো গভীরভাবে পরীক্ষা করার জন্য ক্যাবিনেট থেকে ফিরে আসে। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, আমি চলে আসার পর পরবর্তী কোন এক ক্যাবিনেট মিটিং-এ প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এবং বর্তমানে এই বোর্ডটি সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে জিয়াউর রহমান সাহেবের বিশেষ চিন্তা ছিল। তিনি আমাকে অনেকবার বলেছেন যে, যারা মাদ্রাসা পাস করে তারা সাধারণত মসজিদের ইমাম হয় অথবা মৌলুদ খাঁ হয়। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে কোন কর্মের উপযুক্ত হয় না। তিনি বললেন যে, মাদ্রাসাগুলিতে কারিগরী শিক্ষা সুযোগ করে দিতে হবে এবং কিছু মাদ্রাসা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত করতে হবে। আমি তাকে বলেছিলাম, “এক সময় শামসুল ওলামা আবু নসর ওহীদ মাদ্রাসা শিক্ষার পরিবর্তন সাধন করে নিউ স্কীম মাদ্রাসা তৈরি করেছিলেন। এই নিউ স্কীম মূলত ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে আরবী এবং ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় সাধন। এই নিউ স্কীমের ফলে মাদ্রাসার সঙ্গে হাইস্কুলের ব্যবধান সংকীর্ণ হয়ে এসেছি। দুর্ভাগ্যক্রমে পাকিস্তান আমলে নিউ স্কীম মাদ্রাসাগুলো সম্পূর্ণ তুলে দেওয়া হয় এবং ওল্ড স্কীম যেগুলো মূলত ছিল থিয়োজিক্যাল স্কুল, সেগুলোকে আবার নতুন প্রবর্তনা দেওয়া হয়। পাকিস্তানের শাসকবৃন্দ রাজনৈতিক কারণে এটা করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে তারা যখন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং কারিগরী শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং শাসিত থাকার উপকরণগুলো তারা মাদ্রাসার সাহায্যে করতে চেয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে এ অবস্থা কোনক্রমেই চলতে দেয়া যেতে পারে না।” আমি পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করি তখনই আমার কার্যকাল শেষ হয়। এ সম্ব েপরিশীলিত কোন সিদ্ধান্ত আজও হয়নি।

জিয়াউর রহমানের একটি ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশের বেসরকারী কলেজগুলো ক্রমান্বয়ে জাতীয়করণ করা। আমি তাঁর নির্দেশে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করি। কোন কোন পরিদর্শনকালে আমি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছিলাম। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের বিভিন্ন ডিগ্রী কলেজকে জাতীয়করণের একটি স্কীম আমি ডক্টর আল-মূতি শরফুদ্দীনকে তৈরি করতে দেই। এই স্কীমটি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কতৃêক স্বাক্ষরিত হয়। স্কীম অনুসারে ১২ বছর সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন ডিগ্রী কলেজের জাতীয়করণ করার ব্যবস্থা ছিল। আমি কয়েকটি কলেজকে জাতীয়করণ করে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু আমি সরে আসার পর রাজনৈতিক চিন্তার ফলে শিক্ষাগত চিন্তার আর মর্যাদা রইলো না। চরম বিশৃংখলভাবে যে মন্ত্রী যেভাবে পারলেন সেভাবেই তার নিজের অঞ্চলের কলেজগুলোকে সরকারী কলেজ রূপান্তরিত করতে লাগলেন। এভাবে পর্যায়ক্রম নষ্ট করে অনির্দিষ্টভাবে জাতীয়করণ সরকারের জন্য অনেক সমস্যা সৃষ্টি করেছে।

সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্দেশে আমি স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য ওয়ার্কস প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করি। প্রেসিডেন্ট একদিন বললেন, “ছাত্রদের দেশগড়ার কাজে জড়িত রাখতে হবে। আমি চীন দেশে দেখে এসেছি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বছরের নির্দিষ্ট কিছু কিছু সময় কাজ করে- ফসল বোনা ও ফসর তোলার কাজ। সে রকম আমাদের দেশেও করা দরকার।” আমি উত্তরে বলেছিলাম, “এটি একটি স্থায়ী ব্যবস্থা। সেখানকার ছাত্রদের পাঠক্রমের বিধি-প্রণালীর মধ্যে এটা অন্তর্ভুক্ত এবং সে কারণেই এটি একটি স্থায়ী এবং স্বাভাবিক প্রকল্প। আমাদের দেশে এরকম কোন ব্যবস্থা নেই। সেই ব্যবস্থা যদি করতে পারি তাহলেই ওয়ার্কস প্রোগ্রাম সফল হবে। অন্যথায় সাময়িকতার কারণেই এটা ফলপ্রসূ হবে না।” জিয়াউর রহমানের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই উদ্দেশ্য সফলকাম হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রমের সঙ্গে ওয়ার্কস প্রোগ্রামকে যুক্ত করা যায়নি।

জিয়াউর রহমান আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছিলেন। সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চিত্রাংকন এগুলো যেমন সংস্কৃতির অঙ্গ, তেমনি সার্কাস-কার্নিভাল এগুলোও সংস্কৃতির অঙ্গ এটা তিনি মনে করতেন। বিভিন্ন দেশে সার্কাস আছে। পেশাদারী সার্কাস আছে, আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত সার্কাসও আছে। বুলগেরিয়া, রাশিয়া, চীন, ইত্যাদি সমাজতান্ত্রিক দেশে সরকারীভাবে সার্কাসের সুযোগ পায়। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলাম। সংস্কৃতি বলতে আমি বুঝতাম দেশ ও জাতির ঐতিহ্য, ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে গবেষণা এবং নিজস্ব শিল্প সাধনাকে ইবস্কার এবং তার চর্চা। কিন্তু নাচ-গান, সার্কাস এবং কার্নিভালকেও সংস্কৃতির বাইরে রাখা যায় না। কেননা এগুলোর সাহায্যে দেশের মানুষকে আনন্দের উপকরণের মধ্যে প্রাণবন্ত রাখা যায়। জিয়াউর রহমান সাহেব একদিন আমাকে বললেন যে, আমাদের দেশে একটি সার্কাস পার্টি তৈরি করা দরকার। আমি এজন্য কিছুটা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। একটি সার্কাসের জন্য নানা ধরনের জন্তু-জানোয়ার দরকার এবং এগুলোর ট্রেইনারও দরকার। একটি দীর্ঘকালীন ব্যবস্থা হিসেবে নিলে সার্কাস হয়তো গড়ে তোলা যায়, কিন্তু সেজন্য আমাদের দেশে অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

মানুষে মানুষে মতের অমিল থাকে। এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে মতের অমিল ঘটেছিল, বিশেষ করে শিল্পকলা একাডেমীর কার্যপদ্ধতি বিষয়ে। শিল্পকলা একাডেমী অধ্যাদেশ আমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল। সে-সময় যে উদ্দেশ্য আমাদের সামনে ছিল তা ছিল শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার ব্যবস্থা করা। চিত্রকর্ম, সঙ্গীত এবং নৃত্যে উচ্চতর গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শিল্পকলা একাডেমী করবে এটাই ছিল আমার চিন্তা। আমার সামনে আদর্শ ছিল ভারতের লালিতকলা একাডেমী। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এ দেশের কোন রাষ্ট্রপ্রধানই শিল্পকলা একাডেমীকে দেখেননি। জিয়াউর রহমান চীনে গিয়ে দেখেছিলেন বিদেশী বিশিষ্ট মেহমানদের কি করে নৃত্য-গীত সহকারে বিমানবন্দরে স্বাগত জানানো হয়। তাঁর কাছে এটি ভাল লেগেছিল। তিনি চেয়েছিলান এই ধরনের একটি নৃত্যগীতের দল আমাদের দেশেও তৈরি করা। কিন্তু আমি এতে রাজি হইনি। তখন বিকল্প হিসাবে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে পারফরমিং আর্টস একাডেমী প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাব ক্যাবিনেটে আসে। উক্ত ক্যাবিনেট মিটিং-এ আমার বিরোধিতায় পারফরমিং আর্টস একাডেমী তখন প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। আমি যুক্তি হিসাবে বলেছিলাম, “এ ধরনের একাডেমী বা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব একমাত্র সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এবং অন্য কোন মন্ত্রণালয়ে এই ধরনের কোন ইনস্টিটিউট যদি প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনাক্রমেই তা করতে হবে। এটাই সরকারী নিয়ম। দ্বিতীয়ত শিল্পকলা একাডেমীর এ্যাক্ট অনুসারে পারফরমিং আর্টস-এর দায়িত্ব শিল্পকলা একাডেমীর উপর ন্যস্ত। সুতরাং নতুন কোন একাডেমী প্রতিষ্ঠার কথাই উঠতে পারে না।” আমি যতদিন মন্ত্রিসভায় ছিলাম ততদিন পারফরমিং আর্টস একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। আমি চলে যাবার পর পারফরমিং আর্টস একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে অবশ্য পারফরমিং আর্টস একাডেমী আর নেই। শিল্পকলা একাডেমীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে গেছে।

ব্যক্তিগত জীবনে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ছিলেন। কোনরকম দুর্নীতি তাঁকে স্পর্শ করেনি। বর্তমান সময়ে সর্বাংশে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে একটি নিষ্ঠুর পবিত্রতায় বাস করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু জিয়াউর রহমান এই নিষ্ঠুরতা তাঁর উপর আরোপ করেছিলেন। তাঁর নিজের আত্মীয়-স্বজন কেউ তাঁর কাছে কোন সুযোগ-সুবিধা পায়নি। তাঁর গৃহ ছিল তাঁর স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে নিয়ে একটি নিঃসঙ্গ অবস্থান। কোন উৎসবের সময়ও সেখানে আত্মীয়-স্বজনের বিশেষ আনাগোনা ছিল না। খাদ্য-স্বভাবে তিনি বিলাসী ছিলেন না। আমি অনেকবার তাঁর গৃহে মধ্যাহ্ন বা রাতের খাবার গ্রহণ করেছি। কিন্তু কখনই প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ সেখানে দেখিনি। সাধারণত ভাত, একটি ভাজি, একটি তরকারী এবং ডাল এই ছিল তাঁর নিয়মিত আহার্যের তালিকা। কিন্তু এইগুলো পরিচ্ছন্নভাবে পরিবেশন করা হতো। তাঁর খাদ্য-স্বভাবে, আচরণে কোথাও ঐশ্বর্যের প্রতাপ ছিল না। একজন মধ্যবিত্ত পরিচ্ছন্ন বাঙালি গৃহস্বামী হিসাবে তিনি তাঁর পরিচয় রেখে গেছেন।

আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুরোধে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে যোগ দিয়েছিলাম এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও হয়েছিলাম। দু’মাস কাল আমি এর সঙ্গে ছিলাম। এরপর জিয়াউর রহমান যখন-এ দল ভেঙে দেন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অর্থাৎ বিএনপি গঠন করেন তখন আমি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসি। রাজনীতিতে যোগদান করার পেছনে আমার একটি কারণ ছিল। আমি ভেবেছিলাম শিক্ষিত লোক যদি রাজনীতিতে যোগ দেয় তাহলে আমাদের রাজনীতির চেহারা পাল্টে যাবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে যে সমস্ত স্বার্থন্বেষী লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় তাতে আমার স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। সে সময় আমি অত্যন্ত অসহায় বোধ করেছিলাম। ১৯৭৮-এর এপ্রিল এবং মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তোড়জোড় হয় এবং তখন আমি জিয়াউর রহমানের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য ব্যাপকভাবে যশোর, ফরিদপুর এবং চট্টগ্রাম সফর করি।

২৬ জুন কুয়েত সরকারের আমন্ত্রণে আমি কুয়েত গমন করি। যাওয়ার পূর্বে মন্ত্রিসভার রদবদলের সংবাদ পেয়েছিলাম। ২৭ জুন কুয়েতের মহামান্য আমীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। ২৯ জুন আমি সরকারীভাবে খবর পাই যে বাংলাদেশে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে এবং আমি সেই নতুন মন্ত্রিসভায় নেই। ২ জুলাই আমি ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করি। ৩ জুলাই জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করি। সাক্ষাৎকারের পর আমার ডায়েরীতে যে কথাগুলো আমি লিখি তা অবিকল এখানে তুলে দিচ্ছি-

“জিয়াউর রহামনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আমি তাঁকে বললাম কি ঘটনা ঘটেছে এবং কেন এ পরিবর্তন হল আমি তা জানতে চাই না। আমি শুধু আপনাকে এ কথাই বলব যে যতদিন আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম, আন্তরিকভাবে আপনাকে সমর্থন করেছিলাম। ভবিষ্যতেও আপনাকে সমর্থন করে যাবে। আমাদের দেশ অতীতে অনেক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে গেছে, ভবিষ্যতে নতুন কোন বিপর্যয় আসুক এটা আমি চাই না। দেশ আপনার হাতে স্বস্তিতে ও সমৃদ্ধিতে থাকুক এই আমার প্রার্থনা। তিনি আমাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় তাঁর বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করবেন বলে ভাবছেন জানালেন। আমি বললাম যে এটা কার্যকরী হবে না। তবুও তিনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন।”

এরপর আমি আর দেশের কোন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিইনি। আমি নতুন করে আবার শিক্ষকের জীবন কাম্য করে নিয়েছিলাম।

চট্টগ্রামে অবস্থানকালে একরাতে প্রচণ্ড ঝড় উঠেছিল। সেই ঝড়ের বিবরণ আমি আমার ডায়েরীতে এভাবে লিখেছিলাম- “এখানে প্রকৃতি যে উদ্দামতার সীমারেখা হারিয়েছে, আজ আমার রুদ্ধ দ্বারের সম্মুখে ভীষণকে যে উপস্থিত দেখছি, বিস্ময়ের মেঘলা উড়িয়ে এরা আমাকে সঙ্গী করতে চায়। আমি যদি আমার আস্তিত্বকে বিপর্যয়ের মধ্যে উন্মুক্ত করতে পারতাম, অকার রাতে বজ্র বিদ্যুতের আকাশকে আমার আশ্রয় করতে পারতাম তাহলে আমার জন্য বিরাট ধ্বংসের মধ্যে অভয়বাণীর উচ্চারণ জাগতো।” সম্ভবত এ কারণেই আমি আমার জীবনে নানাবিধ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়াও এরকমই একটি অভিজ্ঞতার স্মারক।

hy×vcivax‡`i wePv‡ii cÖwµqv I wbi‡c¶Zv ch©‡e¶Y Ki‡e hy³ivóª

K‚U‰bwZK wi‡cvU©vi: `w¶Y Gwkqv welqK gvwK©b mnKvix ciivóªgš¿x wiPvW© evDPvi e‡j‡Qb, evsjv‡`‡ki hy×vcivax‡`i wePv‡i mn‡hvwMZvi cÖ‡qvRb n‡j hy³ivóª Zv w`‡Z Kvc©Y¨ Ki‡e bv| Z‡e welqwU‡K wZwb G‡`‡ki Af¨š—ixY welq wn‡m‡e D‡j­L K‡ib| wZwb e‡jb, GB wePv‡ii welqwU cÖKvk¨ I wbi‡c¶ n‡Z n‡e| ivR‰bwZK cÖwZc¶‡K Nv‡qj ev ¶wZMÖ¯— Kivi cÖeYZv _vK‡j Zv Avš—R©vwZK mgv‡R MÖnYxq n‡e bv| g½jevi †÷U wWcvU©‡g‡›U hy³iv‡óª evsjv‡`‡ki ivóª`~Z Gg ûgvqyb Kwei Zvi m‡½ mv¶vr Ki‡Z †M‡j wiPvW© evDPvi G wb‡q gvwK©b Ae¯’vb Zz‡j a‡ib| hy×vcivax‡`i wePv‡ii D‡`¨vM, cÖwµqv I wbi‡c¶Zvi welqwU hy³ivóª Mfxifv‡e ch©‡e¶Y Ki‡e e‡jI wZwb Rvbvb| AvMvgx kwbevi `ycy‡i wZwb `w¶Y Gwkqv md‡ii Ask wn‡m‡e XvKv md‡i Avm‡Qb| XvKvq `yÕw`‡bi IB md‡i wZwb cÖavbgš¿x †kL nvwmbv I we‡ivax †bÎx †eMg Lv‡j`v wRqvi m‡½ mv¶vr Ki‡eb| wZwb XvKvq A_©gš¿x Aveyj gvj Ave`yj gywnZ, ciivóªgš¿x Wv. `xcygwb, ¯^ivóªgš¿x mvnviv LvZzb I ciivóª mwPe Gg †ZŠwn` †nv‡m‡bi m‡½ mv¶vr Ki‡eb| IqvwksU‡b evsjv‡`‡ki ivóª`~‡Zi m‡½ ˆeVK wb‡q c‡i †÷U wWcvU©‡g‡›Ui GK gyLcvÎ e‡jb, ivóª`~‡Zi m‡½ bvbv wel‡q K_v n‡q‡Q| Gi g‡a¨ hy×vcivax‡`i wePv‡ii welqwU wQj Ab¨Zg| wZwb e‡jb, hy×vcivax‡`i wePv‡ii D‡`¨vM I cÖwµqv‡Z †Kvb ai‡bi ivR‰bwZK D‡Ïk¨ _vK‡j Zv wb‡q cÖkœ DV‡e| GRb¨ wePv‡ii cÖwµqv Avš—R©vwZKfv‡e gv‡bvËxY© n‡Z n‡e| evDPvi e‡jb, e¨w³MZ ev ivR‰bwZK ¯^v_© Av`v‡qi cÖeYZv _vK‡j GUv Avš—R©vwZK mgv‡R MÖnY‡hvM¨Zv cv‡e bv| hy³iv‡óª evsjv‡`‡ki ivóª`~Z Gg ûgvqyb Kwei e‡jb, GwU wQj GKwU i“wUb ˆeVK| wewfbœ wel‡qi g‡a¨ hy×vcivax‡`i wePv‡ii welqwUI Av‡jvPbvq G‡m‡Q| wZwb e‡jb, wePv‡ii wbi‡c¶Zv I ¯^”QZv wbwðZ Kivi welqwU‡K Zviv ¸i“Z¡ w`‡q‡Qb| ˆeV‡K wbDBq‡K©i †RGd‡K wegvb e›`‡i wegv‡bi ¯­UwU evwZj bv Kivi Rb¨I AvbyôvwbKfv‡e Aby‡iva Rvwb‡q‡Q evsjv‡`k|

কামালের ১০২ কোটি, আইএসআই'র ২শ কোটি, এরশাদের টাকার বস্তা

কামালের ১০২ কোটি, আইএসআই'র ২শ কোটি, এরশাদের টাকার বস্তা

পীর হাবিবুর রহমান : বিশেষ সংবাদদাতা, দৈনিক যুগান্তর:

কারাবন্দি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি আদালতে বলেছেন ড. কামাল হোসেন ১০২ কোটি টাকা সাদা করেছেন। জানতে চেয়েছেন এই টাকার উৎস কোথায়? পরে আদালতে সাংবাদিকদের সংশোধনী দিলেও সাংবাদিকরা আমাকে বলেছেন, হাসিনা অভিযোগ করেছিলেন। অন্যদিকে কলহপ্রিয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি শেখ হাসিনার দুর্বলতা জেনেও প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ড. কামাল বলেছেন, ১০০ কোটি টাকা তিনি দেখেননি। এতে কতটা শূন্য বসাতে হয় তাও জানা নেই। আর শেখ হাসিনা তার মেয়ের মতো মনত্দব্য করে বিনয়ের সঙ্গে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তরুণ ও মেধাবী আইনজীবী ড. কামাল হোসেনকে বুকভরা ভালবাসা দিয়ে দলে নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যাই শুধু নন, আওয়ামী লীগের মতো ৫৮ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দলেরও প্রধান। বঙ্গবন্ধু যে ড. কামাল হোসেনকে সম্মান দিয়ে দলে এনেছিলেন, হাসিনা সে কামাল হোসেনকে অসম্মান করে তাড়িয়ে দেন। তারপরও ড. কামালের প্রতি তার এত আক্রোশ কেন? কামাল কি তবে পরিবারতন্ত্রের অবসান চান। তিনি তো দীর্ঘদিন থেকে লড়ছেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, কালো টাকা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। অসুস্থ রাজনীতি কামাল হোসেনের গুরুতর শত্রু। মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে ড. কামাল আপসহীন। রাজনৈতিক দল গঠনে তার ব্যর্থতা থাকতে পারে। কবিতার রাজপুত্র কবি শামসুর রাহমান আমার চেয়ে শেখ হাসিনার অতি ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কবি জীবিতকালে বলেছেন, হাসিনা বাবার কোনো গুণই পাননি। রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পুত্রস্নেহ আর গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংসদীয় রাজনীতির আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর নানা ব্যর্থতা থাকলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে নজির তিনি তৈরি করেছিলেন তার পরবর্তীতে আর কেউ দেখাতে পারেননি। তার সাগরের মতো বিশাল হৃদয় ছিল বলেই সবুর খান, শাহ আজিজুর রহমানের মতো লোকজন মুক্তি পান। অনেক রাজনীতিবিদ ভিন্নমতের হলেও তারা আর্থিক সহযোগিতা পান। সবাই এক বাক্যে বলেন, বঙ্গবন্ধু অন্য দলই হোক আর নিজের দলের নেতাকর্মীই হোক সবাইকে সম্মান করে বড় হতেন। আর তার কন্যা শেখ হাসিনা অন্যকে অসম্মান করতে গিয়ে নিজে ছোট হন। ৯০ সালে এরশাদের পতনের পর '৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করছে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবেন_ সব চূড়ানত্দ হলে চরম পরাজয় ঘটলো ভোট গণনায়। যে বিএনপির দল ছিল না, হাসিনার মতো খালেদা জিয়ার এত সমর্থক ছিল না_ সেই বিএনপি ক্ষমতায় এলো। খালেদা জিয়া হলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা স্বভাবসুলভ কায়দায় সবসময় খালেদা জিয়াকে অশিক্ষিত বলতে ছাড়তেন না। অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করীর মতো তার শাসনামলে খালেদা জিয়ার এসএসসির মার্কশিট পর্যনত্দ সভায় প্রকাশ করলেন। '৮৬ সালে যারা জাতীয় নির্বাচনে যাবে তারা হবে জাতীয় বেইমান এমন কথা বলে দেশবাসীকে চমকে দিয়ে নিজেই নির্বাচনে যোগ দিলেন। তার আচরণে দিনে দিনে খালেদা জিয়ার ইমেজ হাসিনাকে কখন যে অতিক্রম করেছে তা তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আত্দসমালোচনা, আত্দশুদ্ধির চেষ্টা করেছেন বলে মনেও হয় না। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে অপমান করার নজির শেখ হাসিনার দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। তাকে চার্লি চ্যাপলিন বলেও তিনি ব্যঙ্গ করতেন। একদিন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের লালমাটিয়ার বাসভবনে গেলে হাসিনার আচরণে তিনি যে কতটা ব্যথিত তা উপলব্ধি করেছিলাম। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস রাজনীতিতে আসার উদ্যোগ নিলে শেখ হাসিনা তাকে সুদখোর বানিয়ে দেন। '৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর শত নির্যাতন ষড়যন্ত্রের মুখে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আব্দুল মোমেন ও আব্দুল মান্নান। হাসিনা তাদের দল থেকে বের করেননি। তারা দলের প্রেসিডিয়ামে ছিলেন। দলের হয়ে রাজপথের সংগ্রাম করেছেন। দল ক্ষমতায় গেলে প্রবীণ এই দুই নেতাকে মন্ত্রিসভায় নেয়া দূরের কথা তাদের মৃতু্যতে ফুলের তোড়া নিয়ে শেষ বিদায় জানাতেও যাননি। একবিংশ শতাব্দীর এই রাজনীতির দোড়গোড়ায় শেখ হাসিনা যে নেলসন ম্যান্ডেলাকে সংবর্ধনা দেয়ার গর্ববোধ করেন সেই ম্যান্ডেলা তার বাড়িতে আক্রমণকারী রাজনৈতিক শত্রুটিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। ভারতে রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির আসামির দণ্ড মওকুফ করেছেন সোনিয়া। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তো জেলে গিয়েই তার সঙ্গে কথা বলেছেন। এতটা উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শেখ হাসিনার কাছে প্রত্যাশা করা যায় না। তবে তিনি যদি বিনয়ী হন, কলহের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন, অপরকে সম্মান দেয়ার প্রচেষ্টা বাড়ান, নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারবে। ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধু যা বলতেন তা বিশ্বাস করতেন আর তা করেই ছাড়তেন। তার কন্যা শেখ হাসিনা যা বলেন তা বিশ্বাস করেন না, তা করেনও না। লালদীঘির ময়দানে নির্বাচন বয়কট করে নারায়ণগঞ্জের জনসভায় নির্বাচনের অংশগ্রহণের ঘোষণা তিনি দিতে পারেন। তিনি সংসদে জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন বিএনপির ভোটে বিভক্তি আনতে। ২৩ দফার অসাম্প্রদায়িক অঙ্গীকার করে তিনি আব্দুল জলিলকে দিয়ে খেলাফত মজলিসের সঙ্গে ৫ দফা চুক্তি করেছিলেন। এমনকি ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হবে না জেনেও তার রাখাল বালকদের দিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার মতো তার পুত্রকেও রাজনীতির উত্তরাধিকার বানাতে গিয়ে দলকে নিজের মতো সাজিয়েছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তার সুধা সদনের কর্মচারী সাবেক অর্থমন্ত্রী (পরে গ্রেনেড হামলায় নিহত) শাহ এএসএম কিবরিয়াকে অপমান করেছিল। যে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী লন্ডন থেকে হাসিনার জন্য লিখছেন সেই গাফ্ফার চৌধুরী '৯৭ সালে এসে হাসিনার কাছ থেকে চায়ের দাওয়াতও পাননি। '৯৯ সালে লন্ডনে টয়েনবি হলে হাসিনা তার সঙ্গে কুশলবিনিময় করেননি। ৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আব্দুর রাজ্জাককে মধ্যমণি করে। রাজ্জাকের মধুর ব্যবহার, অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তিতে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ায়। '৮১ সালে শেখ হাসিনা ঐক্যের প্রতীক হয়ে এলেও দলের ভাঙন তীব্র হয়। আব্দুর রাজ্জাক বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। আর দলের ভেতর হোঁচট খায় গণতন্ত্র। '৮৩ সালে রাজ্জাক বাঘের গর্জন দিয়ে বের হলেও '৯২ সালে ফিরে এলে তাকে ডানা ঝাপটাতেও দেয়া হয়নি। কথায় কথায় 'বাকশাল' দলের গালি হয়। অন্যদিকে সারাদেশে দলে শেখ হাসিনার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিসত্দারে নেমেছিলেন আমির হোসেন আমু। এরশাদ জমানায় ১৫ দলের সভায় তাকে বলাই হতো মি. ডিসিশন। আমু তখন ছাত্রলীগের সভাপতি সুলতান মনসুরকে নিয়ে ৬৪ জেলায় সংগঠন করেন। মোহাম্মদ নাসিমও ছিলেন আমুর সঙ্গী। '৯১ সলের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা একদিকে পরাজয়ের দায় নিয়ে পদত্যাগ নাটক করলেও অন্যদিকে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে ড. কামালের এই মনত্দব্য গ্রহণ করেননি। ওই সময় মিন্টো রোডে দলের পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করে যৌথ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধানত্দ গ্রহণের দাবিতে ড. কামাল হোসেন বর্ধিত সভায় দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। সেদিনই ড. কামালের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। ৯৩ সালের কাউন্সিলে ড. কামালকে প্রেসিডিয়ামে না রেখে উপদেষ্টামণ্ডলীতে রাখা হয়। ড. কামাল গণফোরাম গঠন করে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগের যে চিঠি পাঠান তা ছিল বিনয়ী, মার্জিত রুচির একজন উদার গণতন্ত্রী চরিত্রের পরিচয়। ড. কামাল কোনো দিন হাসিনাকে আক্রমণ করে কোনো মনত্দব্য না করলেও শেখ হাসিনা তাকে ছাড়েননি। '৯৩ সালে ড. কামাল হোসেন বেরিয়ে যাওয়ার পর দলীয় গণতন্ত্রের শেষ কফিনে পেরেক ঠুুকে দেয়া হয়। ছাত্রলীগ সম্মেলনে সগীর আনোয়ার আহমদ হোসেন গণতন্ত্রে বিজয়ী হলেও রায় উল্টে যায়। এদিকে ভারতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মৃতু্যর পর কংগ্রেসে তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর প্রভাব বিসত্দারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন নেহেরুর বন্ধু কংগ্রেস নেতা কে কামরাজ। ইন্দিরা যেমন ক্ষমতা ও দল হাতের মুঠোয় পেয়ে কামরাজকে ছুড়ে ফেলে দেন তেমনি হাসিনা দল হাতের মুঠোয় পেয়ে আমুকে দেয়া ওয়াদা তো রাখেনইনি বরং তাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে শেখ হাসিনা রাজ্জাক, তোফায়েল, সুরঞ্জিতকে অপমান করতে কখনো দ্বিধা করেননি। এরশাদ পতনের নেপথ্যে সাহসী ভূমিকা রাখার কারণে বাদল হত্যার অজুহাতে মোসত্দফা মহসীন মন্টুকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়। রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু যে কারণে রাজনৈতিক সচিব করেন '৬৯-র নায়ক তোফায়েলকে শেখ হাসিনা সেখানে তাকে ভাবেন অবিশ্বসত্দ মিত্র। আর ডাকসু তারকা সুলতান- মান্নার মতো সুদর্শন, সুযোগ্য ও জনপ্রিয় নেতাদের বদলে বিত্তশালী সাবের চৌধুরীকে করেন রাজনৈতিক সচিব। ঢাকার নায়ক মোহাম্মদ হানিফের আত্দা কেন কাঁদে? কেন আবুল হাসান চৌধুরীর মতো লোক চলে যায়, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকী বীরোত্তমের মতো সাহসী যোদ্ধা, ফজলুর রহমানের মতো মেধাবী বক্তাকে দল ছাড়তে হয়। বঙ্গবন্ধু যেখানে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন, মোশতাক, মনসুর আলী, কামরুজ্জামানকে নিয়ে সিদ্ধানত্দ নিতেন। বসতেন মণি, সিরাজুল আলম খান, রাজ্জাক, তোফায়েলকে নিয়ে_ হাসিনা সেখানে সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে কাজী জাফর উল্লাহ, সালমান, সাবের, আবুল হোসেন আর তার কচিকাঁচার আসর নিয়ে সিদ্ধানত্দ নিতেন। হাসিনার থিংক ট্যাংকে ফারুক চৌধুরী, আবুল মাল আবদুল মুহিত কতটা ভূমিকা রাখেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে হাসিনার নাবালক থিংক ট্যাংক দিয়ে খেলাঘর বা কচিকাঁচার আসর করা যায়, আওয়ামী লীগের মতো প্রবীণ রাজনৈতিক দলের ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। হাসিনা কান পাতলে শুনতে পেতেন এখনও উন্মাদনায় থাকা তার লাখ লাখ কর্মী কী বলে তা তিনি জানেন না। তাদের মনের কথা জানার সুযোগ তার নেই। তবে তিনি যেমন তথ্য ছাড়া বলেন, অমুক ১০২ কোটি কালো টাকা সাদা করেছে, অমুকের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে বাজেয়াপ্ত হয়েছে তখন তার কাছেও বাজারে প্রচলিত প্রশ্ন জানতে ইচ্ছে করে, সত্যি কি ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সালমানরা আইএসআই'র কাছ থেকে ২শ কোটি টাকা গ্রহণ করেছিল তার পক্ষ হয়ে? সত্যি কি এরশাদের '৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হাসিনা বসত্দাভর্তি টাকা নিয়েছিলেন? যে যাই বলুক, দলের ত্যাগী কর্মীরাও জানে হাসিনার শত্রু তার মুখ। যদিও তার তোষামোদকারীরা বলেন, ওটাই তার শক্তি। সমালোচকদের ভাষায়, মুখের কারণে খালেদাকে মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন হাসিনা। এমনকি খালেদার আগে তিনি নিজে গ্রেফতার হলেন। সামনের নির্বাচনের পথে দুর্নীতিবাজ বিএনপি যত সুবিধায়, আওয়ামী লীগ ততই অসুবিধায়। হাসিনা দলকে নয়, তিনি দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ দুটি পরিবারের হাতে থাকুক এটাই চেয়েছেন। কিন্তু পরিবারতন্ত্র থাকলে গণতন্ত্র ভূমিষ্ঠই হবে না। ব্রিটিশ রাজতন্ত্র যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আলো দেয়, ছায়া দেয় - আমাদের দেশে পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্রকে ভূমিষ্ঠ হতে দেয় না। বারবার সুযোগ এলেও অকাল গর্ভপাত ঘটায়। ২৭ ও ২৪ বছরের রাজনৈতিক ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে হাসিনা-খালেদা যদি রাজনীতি থেকে অবসর নেন তাহলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হতে পারে। ওয়ান ইলেভেনের স্বপ্নও সফল হবে। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তাদের পুত্ররা যদি নিজ যোগ্যতায় রাজনীতিতে উঠে আসতে পারেন তাতে কেউ দ্বিমত করবে না। আমাদের দুই নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারতেন। তারা নেননি বলেই এত বিপর্যয় আর ক্রানত্দিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত প্রিয় স্বদেশ দুটি পরিবারের ইচ্ছায় চলতে পারে না।

মে ১১, ২০০৮

ওয়ান ইলেভেন সম্পর্কে আমারও অনেক কিছু বলার আছে: লে. জে. মাসুদ

ওয়ান ইলেভেন সম্পর্কে আমারও অনেক কিছু বলার আছে: লে. জে. মাসুদ

আকিদুল ইসলাম, সিডনি থেকে:
ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম রূপকার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট নিয়ে আজ বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত প্রকাশ করছেন। প্রত্যেকেই সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে নিজের মতো করে বলার চেষ্টা করছেন। আমি নিজেও ওয়ান ইলেভেনের ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ওইদিন অন্যদের সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম বঙ্গভবনে। ১১ জানুয়ারি সারারাত বঙ্গভবনেই ছিলাম। আমি সকল ঘটনার সাক্ষী।

মেজর জেনারেল মাসুদ ওই সময় ছিলেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ রচিত ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থটি প্রকাশের পর ওয়ান ইলেভেন আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই গ্রন্থে ১১ জানুয়ারির ঘটনাকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার সম্পর্কে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করছেন, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। ওয়ান ইলেভেনের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা জেনারেল মাসুদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেন কীভাবে সংগঠিত হয়েছে, কার নেতৃত্বে হয়েছে সেটা বলার সময় কি এসেছে? এখন আমরা বরং বলতে পারি, যে লক্ষে ওই ঐতিহাসিক দিনের সূচনা হয়েছিল সেটা আমরা কতটুকু সার্থক করতে পেরেছি। আমরা জাতির চোখে যে স্বপ্ন এনে দিয়েছিলাম তা পূরণ করতে পেরেছি কিনা। এখন আমাদের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা উচিত।

তিনি বলেন, ইতিহাসই বিচার করবে ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তারা নায়ক না খলনায়ক। আমরা কেন নিজেরা নিজেদের নায়ক বানাতে যাব? জেনারেল মাসুদ বলেন, ওয়ান ইলেভেন নিয়ে আমারও অনেক কিছু বলার আছে। অনেক অজানা তথ্য আমি জানি। একদিন সেসব অবশ্যই বলব। আজ দেখছি, অনেকেই সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনেক কথা বলছেন। এসবের জবাবও একদিন আমি দেব। এখন নয়। এখন আমি সরকারি কর্মচারী। এখন কিছু বললে নিজের অবস্থানের কথা মাথায় রেখে বলতে হবে। সব কিছু বলাও সম্ভব হবে না। ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ইতিহাসের কাছে আমি দায়বদ্ধ। সেই দায় আমাকে একদিন মেটাতেই হবে।

শেখ হামিদ কারজাই/ আবু জুবায়ের

শেখ হামিদ কারজাই/ আবু জুবায়ের

মানুষের সাধারণ চাহিদা কি,এটা নিয়ে আজ পর্যন্ত অনেক কথা বলা হয়েছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটীল রুপ ধারন করেছে।এই দেশের খেটে খাওয়া মানুষেরা তাদের প্রাত্যহিক জীবন অতিবাহিত করবার জন্য এক ধরনের সংগ্রামে লিপ্ত আছে।তাদের কাছে বাংলাদেশের সাধারন নির্বাচন কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছে সেটা এখন পর্যালোচনার সময় এসেছে।একটি জাতির সামাজিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,বিনোদন ইত্যাদি বিষয় নির্ভর করে সে দেশের রাষ্ট্রীয় নীতির অনুশীলনের উপর।কোন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজন কেন হয়?একটি দেশ স্বাধীণ হবার পরও এই আশংকা কেন থাকে?আধিপত্যবাদের কথা বার বার ফিরে আসে কেন?এগুলো কি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বুলি নাকি এর রাষ্ট্র সংঠনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন আছে।এসব কিছু ভেবে দেখার সময় এসেছে।রাজনৈতিক ফন্দি ফিকিরের মধ্যে অনেক বিষয় আমাদের অলক্ষ্যে থেকে যাচ্ছে,সেগুলো পর্যালোচনা না করলে তথাকথিত পরিবর্তনের তামাশা জনগনের কাছে অধরাই থেকে যাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা রাজনৈতিক পরিস্থতির বিশ্লেষন করার চেষ্টা করছি।একটি বিতর্কিত,অগ্রহনযোগ্য,অবৈধ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শাষন ব্যবস্থা দখল করে এই জাতির কাছে বেইমান হিসাবে প্রতিষ্টিত হয়ে থাকল আওয়ামী লীগ।জনগন এখন প্রশ্ন করে আওয়ামী লিগকে ক্ষমতায় বসানোর পিছোনে কি উদ্দ্যেশ্য থাকতে পারে।আমাদের অনেকগুলো বিষয় চিন্তা করতে হবে।আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেই জনগনের মধ্যে তাদের বিষয়ে নানা পরিচতি আছে ,যেমন-

১।আওয়ামী লীগ ভারত সমর্থিত একটি দল।তারা ভারতের কাছে নানাভাবে দ্বায়বদ্ধ।আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগ থেকে প্রতিষ্ঠিত দল হলেও ভারতের কংগ্রেসের সাথে অনেকে মিল খুজে দেখেন।

২।আওয়ামী লীগের বাকশাল থিওরি সম্পর্কে সচেতন মহল অবগত থাকলেও সাধারন মানুষের কাছে এটা সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য নাই।এই ক্ষেত্রে আমি এটা বি এন পির মত দলকে দোষ দিব।কারন যেই দল এদেশের গনতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করেছে তারা এখন দিন বদলের ঢেউ তুলেছে,তাদের সম্পর্কে তারা সচেতন করতে পারেনি।যে দলের আদর্শের মূল ভিত্তে বাকশাল তারা বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে জনপ্রিয় হতে পারে না।

৩।এদেশের দূর্ণীতির ইতিহাস যদি খোজা হয় তবে দেখা যাবে এটা নগ্নভাবে শুরু হয়েছিল কবে থেকে।১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর মধ্যে বাংলাদেশে যে পরিমান সাহায্য এসেছিলো সে সাহায্য দিয়ে দেশ শুধু মাত্র গড়ে তোলাই নয় এদেশের মানুষকে বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হত না।অনেক ইতিহাসবিদ,রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন এই সমস্ত সাহায্যের টাকার মূল অংশটাই চলে গেছে ভারতে।এছাড়া মুজিব বাহিনীর সহায়তায় ভারতীয় সেনা বাহিণী ব্যপক লুঠপাঠ চালায়।এই লুঠপাটের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল শেখ মুজিবের বিরাগভাজন হয়ে যান।তখনকার সময়ে লেখা একটা ছড়ার অবতাড়না এখানে করতে চাই-

gyw³hy‡×i c‡i

evsjv‡`‡ki KjKâv

Uªv‡K wb‡q f‡i

ïiz K‡i jyV

cÖwZ‡iv‡a †gRi Rwjj

Zz‡j a‡i gyV|

আমার এই স্বল্প শরীরের লেখাতে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের কথা লিখে পরিপূর্ণ তথ্য দেয়া যাবে না।আওয়ামী লীগ এখন পেছোনে ফিরতে চায়না,এর প্রধান কারন তাদের বাংলাদেশ নিয়ে দালালি যদি এদেশের জনগন বুঝতে পারে তাহলে তাদের থেকে বড় রাজাকার আর কেউ হবে না।এটা আমি বলতে পারছি এই কারনে যে আপনারা একটু খেয়াল করলে দেখবেন আওয়ামী লীগের কেউ বিপদে পরলেই ভারতের আশ্রয়ে চলে যান।শেখ হাসিনা বহুদিন দিল্লিতে কাটিয়েছেন এছাড়া দলের নেতা কর্মি ছাড়াও অন্যান্য বুদ্ধিজীবিদের দিকে তাকালে দেখব তারা এদেশের ইলিশের চেয়ে প্রিয় গোপাল বিষয়ীর শাড়ি অনেক প্রিয়।আমি একজনের নাম করতে পারি তিনি হচ্ছেন আওয়ামী সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের নেতা হাসান যাকে অনেকে র এর বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত করে।সে গত বেশ কিছুদিন ভারতে থাকার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কয়েকদিন আগে থেকে এখানে দেখা যাচ্ছে।তারমানে আমরা এটা ধরে নিতে পারি মার্কিন এবং ভারত সমর্থনটপুষ্ট আওয়ামী লীগ পুরানো অনেক রাজনৈতিক হিসাব মিটানোর জন্য ক্ষমতায় বসানো হয়েছে।এসব কিছু জনগন ঠিকই খেয়াল করছে।বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জামাল কামাল এখনও মুছে যাইনি।এই প্রতিশোধের রাজনীতিতে ভারত সমর্থিত আওয়ামী লীগ দেশ কে কোথায় নিয়ে যায় এটা এখন দেখার বিষয়।সামগ্রিক ভাবে আওয়ামী লীগের ভারত প্রীতি বাংলাদেশের মানুষ কোন দিনই গ্রহণ করেনি।ভারতে বাংলাদেশের কি পরিমান সম্পদ পাচার হয়ে গেছে সেটা এখন বের করে ক্ষতিপূরন দাবি করা উচিত।

৪।মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের আন্তঃর্জাতিক রাজনীতিতে যে সখ্যতা হয়েছে সেখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সামনে চলে আসবে।ইরাক,আফগানিস্তান,পাকিস্তান,ফিলিস্তিনি ইত্যাদি মুসলিম দেশ গুলোর মত বাংলাদেশে এমন কিছু একটা হবে কিনা সেটা অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।আমেরিকার কৌশল সম্পর্কে আমরা জানি যে তারা দেশে দেশে তাদের সুবিধা মত এজেন্ট নিয়োগ করে ।আমি জানিনা হাসিনা সে নিয়োগটি পেয়েছেন কিনা ।যেভাবে মরিয়ার্টিকে মন্ত্রণালয় গুলোতে অফিস করতে দেখছি তাতে সবার সন্দেহ অনেক বেড়ে গেছে।ভারত কৌশলগতভাবে এদেশে একটা দুর্বল সরকার থাকুক সেটা চায়।এটা এদেশের কোন মানুষের বুঝতে বাকি নেই।জরুরী অবস্থা নিয়ে আসা,আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করা,বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত প্রেম নিয়ে আসার জন্য সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব্যদের দিয়ে এদেশের সংস্কৃতি বিরোধী নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তরুন সমাজ কে বিভ্রান্ত করা।শোনা যায় যে এদেশের (ভারতীয় হাই কমিশন মুখি)কিছু বুদ্ধিজীবি বিশেষ এসাইনমেন্ট নিয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে “মেরা ভারত মহান হে “ এটা শেখানোর চেষ্টা করা করছে।একটা কথা মনে রাখতে হবে যে শুধু মাত্র সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে একটি দেশকে দখল করা যায়।বাংলাদেশের সকল মানুষ যদি বলে আমরা ভারতীয় তখন কি কিছু করার থাকবে?এই বাংলাদেশকে ভুটান,সিকিমের রুপ দেবার ইচ্ছা ভারতের অনেক আগে থেকেই ছিল।এখন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বন্ধু হওয়াতে এটা অনেক সহজ মনে হচ্ছে।

৫।হাসিনা রাজনীতিতে দ্বৈত পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে।বাংলাদেশের কথা বলে ভারতের পক্ষে নির্লজ্য দালালি (যেটা কিনা বি এন পির জন্য ব্যাক ডেটেড ফরমুলা!)।এদেশের মানুষের মধ্যে সে তার বেটার বউ খুজে পেলনা।শেষ পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতে নিজের ছেলেকে সোপে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদিদের সহায়তায় নিজে ক্ষমতা লুটে নিলেন।

আবার অন্যদিকে রাজাকারের কথা বল্লেও মেয়েকে বিয়ে দেন রাজাকারের ছেলের সাথে(বর্তমানে মন্ত্রি পরিষদ সদস্য)।

৬।ভারতীয়দের কাছে আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় দল।তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের দেখতে চায়।এটার পিছোনে কি কারন থাকতে পারে সেটার সম্পর্কে আমি কখনো ভেবে দেখিনি।পাঠক এই বিষয়ে আপনারা হয়তো ভাবছেন।

৭।ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত চাহিদা বেড়েছে।এর অনেক গুলো কারন রয়েছে।ভারতের জন্য যে সমস্ত সুবিধা প্রয়োজন সেগুল হল-

ক।বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে (করিডোর) সেভেন সিস্টারের সাথে সামরিক যোগাযোগ।

খ।চিটাগাঙ্গের বন্দর ব্যবহার সুবিধা।

গ।বাংলাদেশের বাজার দখল।কৃষি উতপাদনের সকল ক্ষেত্রে ধস নামানো,যাতে করে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়।

ঘ।বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের ব্যবহার।

ঙ।সমুদ্র সীমানা তাদের দখলে নিয়ে যাওয়া।

চ।ধীরে ধীরে এদেশের মানুষকে ভারতের মুখাপেক্ষি করে দেওয়া যাতে করে জাতি হিসাবে আমরা তাদের থেকে নিচু অবস্থায় থাকতে পারি।

ছ।বাংলাদেশ যাতে মুসলিম প্রধান দেশ হিসাবে না থাকে সেটাও তাদের লক্ষে আছে।যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ কৌশলে ধীরে ধীরে তারা আগাবে।

জ।বাংলাদেশের আকাশ সীমা কোন অনুমতি ছড়াই ব্যবহার।যেটা আমরা করতে পারিনা।

ঝ।এদেশে একটা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল গড়ে তোলা যার মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া।

ঞ।আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ভারতের পোষ্য দেশ হিসাবে স্বীকৃতি।

ট।ডিজাটাল বাংলাদেশের নামে এদেশের সকল প্রযুক্তিতথ্য দখল করার মাধ্যমে এদেশের জনগনকে প্রতারিত করে নিঃশেষ করা।

ঠ।আওয়ামী লীগের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে দেবার নাম করে যুক্তরাষ্টের সাথে একটি ত্রি দেশীও চুক্তি করা হবে যাতে করে এদেশের মানুষ ডিজিটাল ঋনের চক্রে,বেচে থাকবার সাধারন অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

ড।ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার নাম করে ভারতীয়দের বাংলাদেশে প্রবেশের ছুঁতো।

ঢ।বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে শেষ করে দিয়ে ভারতিয় জাতীয়তাবাদ তথা বাংগালি জাতিয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা।এছাড়া আরও অনেক উদ্দ্যেশ্য হয়তো আমারা অচিরেই বুঝতে পারবো।

মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব আবার একটু ভিন্ন।

১।ভারতের স্বার্থ সংরক্ষন করা।আন্তঃর্জাতিক কৌশলগত কারনে ভারতের কিছূ চাহিদা পূরণ করা তাদের দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

২।আন্তঃর্জাতিক সন্ত্রাস বিরোধী আন্দলনের প্লান অনুসারে মুসলিম দেশ গুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখা প্রয়োজন।

৩।বাংলাদেশ যেহেতু ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেই নি,সেহেতু তাদের স্বীকৃতি দেয়ার ব্যবস্থা করাও তাদের স্বার্থ।এখানে বলা দরকার ভারতের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক বর্তমানে খুবি ভাল।

৪।মুসলিম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যাতে অর্থনৈতিক ভাবে আরেকটা মালয়শিয়া না হয় সেটাও একটি বিষয়।

৫।বাংলাদেশে যাতে ন্যাশনালিস্ট ফোর্স না থাকে সেটার ব্যাবস্থা করা।

৬।এছাড়া বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের দিকে যে একে বারেই খেয়াল নেই সেটা কিন্তু বলা যায় না।

৭।সাম্রায্যবাদি শক্তি হিসাবে তাদের নানা ধরনের মাতুব্বরি তো রয়েছেই।

৮।আর কিছু দিনের মধ্যে ভারতের বাংলাদেশ সন্ত্রাসী রাস্ট্র হিসাবে ঘোষনা এবং যুক্ত্ররাস্ট্র দ্বারা সমর্থনের মাধ্যমে এদেশ কে জঙ্গীবাদি দেশ হিসাবে পরিচিতি করন।ইত্যাদি।

বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা অনেক আগে থেকেই ভারত শুরু করেছিল।অনেক দিন ধরে তারা চেষ্টা করছে বাংলাদেশ তাদের মত করে নিয়ন্ত্রন করতে।কিন্তু এদেশের মানুষ কখন সেটা হতে দেইনি।এখন অন্য পন্থা তারা বেছে নিয়েছে।আওয়ামী লিগকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে তাদের পরিকল্পনার অনেকটা কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছে।ভারতের সমর্থনে আওয়ামী লীগ যে ক্ষমতায় এসেছে সেটা একেবারেই পরিষ্কার।

১।যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে এই মর্মে হাসিনা যে ঘোষনা দিয়েছে সেটা ভারত-মার্কিন থিওরি হিসাবে সবায় দেখছে।

২।বাংলাদেশকে জংগীবাদি,সন্ত্রাসি রাষ্ট্র হিসাবে হাসিনা সাম্রায্যবাদি শক্তির শুভেচ্ছা দূত হিসাবে কয়েক বছর ধরে কাজ করছে।

৩।ভারতীয় মন্ত্রী প্রণব মূখোপাধ্যায় তার শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন এবং এত তারাতারি তার বাংলাদেশে সফর সবাইকে অবাক করেছে।যে প্রণব বাবু সিডোরের সময় চাল দেবার কথা বলে দিলেন না ।

৪।ভারতের গণমাধ্যম গুলো ব্যাপকভাবে হাসিনার বিজয়ের খবরকে প্রকাশ এই সত্যিটা প্রমান করেছে।

৫।ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র তাদের রিপোর্ট অনুসারে শেখ হাসিনার আর বেঁচে থাকবার কথা না।নির্বচনের আগে এই সংস্থার এই ধরনের প্রচার বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে।তার মানে আমরা ধরে নিতে পারি র বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে তাদের দ্বায়িত্ব পালন করছে।

৬।ক্ষমতায় না আসতেই ট্রাঞ্জিট কিংবা করিডর দেবার জন্য আওয়ামী লীগ তরিহরি করছে।

আরও অনেক বিষয় আছে যেখান থেকে বোঝা যায় ভারতের যেমন আওয়ামী লীগকে দরকার আছে ,ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগেরও ভারতকে দরকার আছে।

কিন্তু সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশের জনগন,তাদেরকে ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়েছে।ফাঁকিবাজির নির্বাচনে বি এন পিকে কয়েকটি আসন দিয়ে নির্বাচনকে একে বারে বাতিল যাতে না করা হয় এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।ভারত-মার্কিণ চক্রান্তকে ব্যবহারিক রুপ দেবার জন্য আমরা আফগানিস্তানে হামিদ কারজাইকে বসানো হয়েছে।বাংলাদেশে শেখ হামিদ কারজাই তৈরি হল কিনা সেটা এখন প্রমানিত হচ্ছে।কয়েকদিন আগে দাউদ হায়দারের একটা লেখাতে হাসিনাকে শেখ ওবামা হিসাবে দেখিয়েছেন,তবে বাংলাদেশের সাধারন মানুষ মনে করছে শেখ হামিদ কারজাই।

বাংলাদেশে আর কয়েকদিনের মধ্যে সন্ত্রাস আর জংগী দমনের নামে ভারতীয় সেনা বাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশ এবং সামরিক অভিযান বাংলাদেশের মানুষ এবং সেনা বাহিনী চেয়ে চেয়ে দেখবে।আর শেখ হামিদ সরি হাসিনা দিন বদলের সনদের পরিবর্তে অনিবার্য কারনে দিন বদলের যুদ্ধ ঘোষনা করবে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের বিপক্ষে তখন বলবে-এখন জংগীবাদ নির্মূল করাই আমাদের প্রধান কাজ।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী এক মাস

দাউদ হায়দারের ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ কবিতাটি নিয়ে কিছু দিন আগে খুব হৈচৈ হয়ে গেছে। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর থেকে এই কবিতাটির কথা রোজই আমার মনে পড়তো। না, কবিতাটির ভেতরকার কোনো পঙ্ক্তি বা শব্দও আমার মনে ছিল না। কবিতার নামটিই শুধু আমার স্মৃতিতে আমার সত্তায় বারবার হানা দিয়ে যেতো। আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা সংশয় ও প্রত্যয় এবং আশঙ্কা ও আশ্বাসের দোলায় অবিরাম দোল খেতাম। আজও একুশ শতকের প্রথম দশকের শেষ প্রান্তে এসেও সেই দোল খাওয়া শেষ হয়নি। শেষ হবে কি কোনো দিন?
দাউদের কবিতাটি যখন লেখা হয়নি, কবিতার শীর্ষনামের এই শব্দগুলো আমার চেতনায় এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল না যখন, তখন সেই পাকিস্তান আমলে একান্ত বাস্তব কারণেই আমার জন্মজনিত পাপে আমাকে প্রতিক্ষণ কুঁকড়ে থাকতে হতো। স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর সেই পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে গেছি আমার মনে এমন দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল। কিন্তু ‘পনেরোই আগস্ট’ আমার সেই বিশ্বাসকে ভেঙে একেবারে খান খান করে দিয়ে গেল। প্রতি মুহূর্তেই কিছুটা প্রকাশ্যে এবং অনেকটাই আকারে ইঙ্গিতে, আমাকে মনে করিয়ে দেয়া হতে লাগলো : তুমি হিন্দু। কাজেই সম্ঝে চলো, বেশি বাড় বেড়ো না।
হ্যাঁ, আমি যে হিন্দু সেটা অবশ্যই মিথ্যা নয়, বরং একান্ত বাস্তব সত্য। কিন্তু সে তো আমার ইচ্ছানিরপেক্ষ বাস্তব। আমি তো ইচ্ছা করে হিন্দু পরিবারে জন্ম নিইনি, কিংবা জন্মের পর নিজের ইচ্ছায় হিন্দু হইনি। এই ইচ্ছানিরপেক্ষ হিন্দুত্বের জন্য আমার মনে কোনো গৌরববোধও নেই, গ্লানিও নেই। হিন্দু হওয়াটা আমার কোনো অপরাধও নয়, কৃতিত্বও নয়। একটি সভ্যরাষ্ট্রের নাগরিকরূপে আমার এই হিন্দু পরিচয় কি কোনো বিবেচনার বিষয় হতে পারে? পাকিস্তান নামক একটি অসভ্য রাষ্ট্রেই এমনটি হয়। বাংলাদেশে কেন এমন হবে? হিন্দু বলেই আমাকে সমঝে চলতে হবে কেন?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বায়াত্তরে রচিত ও গৃহীত সংবিধানের চারটি স্তম্ভের একটি ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষতাই বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সম্প�র্ণ বিপরীত অবস্খানে দাঁড় করিয়েছিল, বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের থেকে সম্প�র্ণ স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র সেকথা জানিয়ে দিয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়েও বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বজায় থাকতে পারে, কিন্তু সে রাষ্ট্র রক্তের মূল্যে অর্জিত বাংলাদেশের মর্মসত্যকে ধারণ করতে পারে না। এক সময়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল, বাস্তবে সেই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর সেটিকে তারা অনিচ্ছায় হলেও মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে মেনে নেয়া তাদের জন্য ছিল খুবই অস্বস্তিকর। এখন তারা সেই অস্বস্তি থেকে মুক্ত। যদিও পনেরোই আগস্ট বা তারপরও বেশ কিছুদিন চার মূলনীতিসহ বাংলাদেশের আদি সংবিধানটি বহাল ছিল, তবু পাকিস্তনপন্থীরা সঠিকভাবেই বুঝে নিয়েছিল যে এই বহাল থাকাটা নিতান্তই আনুষ্ঠানিক, বাস্তবে মুজিব হত্যার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তত ধর্মনিরপেক্ষতার আর অস্তিত্ব নেই। তাই প্রকাশ্যেই তারা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য প্রচারের সাহস পেয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তান আমলের মতোই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ভাবতে শুরু করে দিয়েছিল। আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিশেষ করে হিন্দুদের চৈতন্যে ও অনুভবেও পাকিস্তানি শাসনের দিনগুলোই ফিরে এল, সে সময়ের মতোই তারা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলো। জন্মই যে তাদের আজন্ম পাপ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ প্রকাশের অধিকার থেকেও যেন তারা বঞ্চিত।
খোন্দকার মোশতাক এ-সময়ে খুব চতুরতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছিলেন। আগস্টের বিশ তারিখে এক ঘোষণা জারি করে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘সামরিক আইন জারি সত্ত্বেও সংবিধান বহাল থাকবে; চারটি রাষ্ট্রনীতি (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা) অটুট থাকবে; জাতীয় সংসদ বিলোপ করা হয়নি।’ এ-রকম ঘোষণা বহাল রেখেই দু’দিন পর (২২ আগস্ট, ১৯৭৫) পাকিস্তানের আইয়ুবি কায়দায় বিভিন্ন অপরাধের জন্য ‘প্রাণদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড’ প্রদানের সামরিক বিধির নানা কথা জানিয়ে দিয়ে বলা হলো যে, ‘এ সব বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে; ট্রাইব্যুনালের রায় সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উথাপন করা চলবে না, তবে বিশেষভাবে গঠিত আপীল ট্রাইব্যুনালে আপীল করা চলবে; আসামীর অনুপস্খিতিতে ট্রাইব্যুনাল বিচার করতে পারবে।’ ওই দিনেই বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার খবরে জানা গেল যে, ‘সামরিক বাহিনীর মধ্যে মতবিরোধ চলছে; ক্যান্টনমেন্টে ট্রেঞ্চ খনন করা হচ্ছে’ এবং লন্ডন টাইমস, ডেইলি টেলিগ্রাফ, বিবিসি ও অন্যান্য সংবাদ সংস্খার বারোজন বিদেশি সাংবাদিককে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ২২ আগস্টেই বাংলাদেশের এক সময়কার রাষ্ট্রপতি ও সে-সময়কার মোশতাক সরকারের অন্যতম মন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য পেরুর রাজধানী লিমায় যাত্রা করলেন, আবার ওই দিনেই সামরিক আইনের অধীনে গ্রেফতার হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, আবদুস সামাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, কোরবান আলী, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আবদুল মান্নান, আজহারুল হকসহ ছাব্বিশজন স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজনীতিক নেতা। এর পর দিনই মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী নিযুক্ত হলেন খুনি রাষ্ট্রপতি মোশতাকের প্রধান উপদেষ্টা, বাকশাল নিয়ে মতানৈক্যের জন্য বঙ্গবুর মন্ত্রিসভা থেকে যিনি পদত্যাগ করেছিলেন। মোশতাকের উপদেষ্টা হয়ে ওসমানী তাঁকে কী উপদেশ দিয়েছিলেন, জানি না। তবে, আমরা দেখলাম : বেসামরিক রাষ্ট্রপতি মোশতাক তার সামরিক শাসনে পাকিস্তানি ঐতিহ্যেরই ঘনিষ্ঠ অনুসরণ করে চলেছেন। সে-সময়ে বাকশাল ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। মোশতাক এক অর্ডিন্যান্স জারি করে সেই বাকশাল বিলুপ্ত করে দিলেন, এবং কোনো রাজনৈতিক দল গঠন বা কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ করে দিলেন।
প্রেসিডেন্টের গদিতে বসার দশ দিন পর, পঁচিশে আগস্ট, মোশতাক সাহেব ‘পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় আরম্ভ করার এবং উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আশা’ ব্যক্ত করে পাকিস্তানের ভুট্টোকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। একই দিনে ভারতের ইন্দিরা গাীর কাছে লেখা তাঁর চিঠিতেও বলেছিলেন যে, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বুত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি অক্ষুণí রাখার জন্য দু’দেশের নিবিড় সহযোগিতাসহ কাজ করা উচিত।’ ইন্দিরা কয়েকদিন পরই এই চিঠির জবাবে ‘সার্বভৌমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা এবং সমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা’ জানিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ-ভারতের এই পত্র বিনিময় ছিল বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিকতারই অংশ মাত্র। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটি তো তখন তেমন স্বাভাবিক ছিল না, তাই সে-সম্পর্ক স্খাপনের জন্য মোশতাক সরকারের ব্যগ্রতার তাৎপর্য ছিল অন্যরকম। মোশতাক অত্যন্ত সঠিকভাবেই এটিকে ‘এক নতুন অধ্যায় আরম্ভ করা’ রূপে দেখেছিলেন। পাকিস্তানের ভ�ত বাংলাদেশের ঘাড়ে ভর করার সেই অধ্যায়টি মুজিব-হত্যার মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তার যবনিকা উন্মোচন করেছিলেন ভুট্টো সাহেবই। মুজিব হত্যার পরপরই খুনি মোশতাকের সরকারকে তড়িখড়ি স্বীকৃতি জানানো, এ-রকমই স্বীকৃতি ও সমর্থন দানের জন্য ইসলামি কনফারেন্সসহ অনেকগুলো রাষ্ট্রকে আহ্বান করা, এবং বিপুল পরিমাণে চাল ও কাপড় বাংলাদেশে পাঠানোর ঘোষণা দেয়া ভুট্টোর এসব পদক্ষেপ বা কর্মপ্রয়াসই সেই নতুন অধ্যায় শুরুর বার্তা বহন করেছিল। বাংলাদেশ ক্ষমতাদখলকারী নতুন সরকারের কাছে পাকিস্তানের এমন বার্তা ছিল একান্তই কা�িক্ষত। তাই সে-বার্তায় তড়িৎগতিতে সাড়া দিয়ে সে-সরকারটি নানা দমনমূলক সামরিক আইন বিধি জারি করতে থাকে, যাঁদের কাছ থেকে বিরোধিতা আসা সম্ভব তেমন নেতাদের গ্রেফতার করতে শুরু করে, এবং পূর্বতন সরকারের সময় গ্রেফতারকৃত পাকিস্তান সমর্থক নেতাদের মুক্ত করে দেয়। ক্ষমতা দখলের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই (১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫) প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারিয়েট থেকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্খিতি সম্পর্কে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়।
এই শ্বেতপত্র প্রকাশের পরদিন এ সম্পর্কে তীক্ষ�ধী বুদ্ধিজীবী আবদুল হক তাঁর রোজনামচায় লিখেছিলেন­
‘এতে বলা হয়েছে : পূর্বতন সরকার দেশে এক অর্থনৈতিক কোটারি ব্যবস্খার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার ফলে এক চরম অর্থনৈতিক অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল। শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উৎপাদন হন্সাস পেয়েছিল কোনো ক্ষেত্রেই ১৯৬৯-৭০ সালের পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেনি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দুরবস্খা সম্বে যে-সব কথা জানা ছিল সেই সবই একত্রে বলা হয়েছে অকার দিকটার কথা শুধু। অগ্রগতি কিছু হয়ে থাকলে তাকে ছোট করে দেখানো হয়েছে। মোটামুটি উদ্দেশ্য ছিল যেন এই বলা : (১) শেখ সাহেবের আমল খুব খারাপ ছিল; (২) এখন ভালো দিন এসেছে; (৩) পাকিস্তান আমল ভালো ছিল।’
বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ‘পাকিস্তান আমল ভালো ছিল’ বলে বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যারা চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে আসছিল, পনেরোই আগস্টের পরবর্তী সরকারটি এখন তাদেরই পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলো। এ রকম সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই তারা বুক চিতিয়ে চলতে লাগলো, আর এরই বিপরীতে, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ধারক সকলকে লুকিয়ে চুরিয়ে থেকে আত্মরক্ষার পথ খুঁজতে হলো।
বঙ্গবু হত্যার ঠিক এক মাস পর, ১৩ সেপ্টেম্বর, সে-সময়কার পরিস্খিতি সম্পর্কে আবদুল হক সাহেবের পর্যবেক্ষণ ছিল এ-রকম :
‘১৫ আগস্ট থেকে আজ একমাস। প্রেসিডেন্ট ভবন ও বেতার ভবন এখনও ট্যাঙ্কবেষ্টিত। কোনো মন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট এখনো জনতার সম্মুখীন হন নি। মাঝখানে চাল ইত্যাদির দাম কমেছিল। আগে থেকেই কমছিল, তবে ১৫ আগস্ট তারিখের ধাক্কায় বোধ হয় কিছু দ্রুত কমেছিল কিছুদিন। তারপর আবার বাড়তে আরম্ভ করেছে। চালের দাম প্রায় ১৪ আগস্টেরই সমান। চাল ও বিভিন্ন জিনিসের দাম কমেছে এমন কথা খবরের কাগজে আর লেখা হচ্ছে না। ১৫ আগস্টের ঘটনায় অবুঝ অজ্ঞ লোকদের মধ্যে যে খুশি খুশি ভাব দেখা গিয়েছিল এখন তা আর দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে নানা রকমের গুজব, কখনো কখনো শোনা যাচ্ছে পাল্টা ঘটনার সম্ভাবনার কথা। এতদিনে মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে, ১৫ আগস্ট ঘটনা ঘটিয়েছিল কয়েকজন তরুণ অফিসার। তাদের পেছনে আছে আরও চার-পাঁচশ’ তরুণ অফিসার। যে কয়েকজন তরুণ অফিসার সব কিছুতে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের মধ্যে আছে বরখাস্তকৃত অফিসার অতএব অভ্যুথানের পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তিগত আক্রোশ। প্রধানত এই তরুণ অফিসাররা নীতিনির্ধারণ করে দিচ্ছে ঊর্ধ্বতন বাহিনী-নায়কদের কাছে। এই বাহিনী নায়কদের মন্ত্রিসভায় সেই নীতি সম্বে তদারক করেন এবং বেসামরিক মন্ত্রিসভা সেই সব নীতি অনুযায়ী কর্মপদ্ধতি উদ্ভাবন করেন অর্থাৎ আসল নায়কেরা সামনে তো নেই-ই, সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ স্খানেও নেই। সর্বোচ্চ স্খানীয় সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তিবর্গ এভাবে কতদিন চালাবেন অথবা চালাতে পারবেন অথবা চালাতে চাইবেন?
বিশিষ্ট নেতৃবর্গ অথবা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমপিবৃন্দ যে পদ্ধতিতে ক্ষমতা গ্রহণ করা হয়েছে তা সমর্থন করে অথবা বর্তমান সরকারকে সমর্থন করে বিবৃতি দেন নি। অধ্যাপকবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীরাও নীরব। কোনো রকম মতবাদী বিশিষ্ট লেখকবৃন্দ ও বর্তমান সরকারের সমর্থনে নিবাদি লেখেন নি।’
এটিকে একটি বস্তুনিষ্ট পর্যবেক্ষণ রূপেই আমরা গ্রহণ করতে পারি। তবে ‘অভ্যুথানের পেছনে কাজ করেছে ব্যক্তিগত আক্রোশ’ তাৎক্ষণিকভাবে সে-সময়ে অনেকের কাছেই এ-রকম মনে হলেও, পরে প্রমাণিত হয়েছে যে বিষয়টি মোটেই এত সরল ছিল না। পনেরোই আগস্টের চরম প্রতিক্রিয়াশীল অভ্যুথানটির শেকড় ছিল অনেক গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রুদের গভীর ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনার সার্থক বাস্তবায়নই ঘটে এর মধ্যে দিয়ে।