দুর্ভাগ্যজনক হলেও একথা সত্যি যে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের ইতিহাস এ পর্যন্ত খুব একটা ভালো হয়নি। রাষ্ট্রপতি লে. জে. জিয়াউর রহমানসহ তিনজন মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়ক সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যু-ত্থানে নিহত হয়েছেন। দু’জন সেনাপ্রধান মেয়াদ পুরো করতে পারার আগেই অপসারিত হয়েছেন। লে. জে. এরশাদ অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করে নয় বছর সরকার চালিয়ে পরে গণ-অভ্যুত্থানের চাপে রাষ্ট্র-পতি পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে দিয়ে দেশে জরুরি অবস্হা ঘোষণা করালে তিনিও বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চের পাদপ্রদীপের সামনে এসে পড়েন। তাকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও বিতর্ক কম হয়নি। তার কারণও আছে নিশ্চয়ই।
জেনারেল মইন একটা নতুন রেকর্ড গড়েছেন। তিনি চাকরিরত অবস্হায় একটি স্মৃতিচারণমুলক গ্রন্হ প্রকাশ করেছেন। বইটির শিরোনাম ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’। সরকারি চাকরিতে থেকে বই লিখলে তা প্রকাশ করতে যথাযথ কতৃ�পক্ষের অনুমতি লাগে বলে শুনেছি। মিলিটারি চাকরি হলে তো বটেই। জেনারেল মইন সেই যথাযথ অনুমতিক্রমে বইটি প্রকাশ করেছেন বলে মনে করছি। আশা করি একই ধারায় তার মতো আরো কেউ কেউ তাদের দায়িত্ব পালন বিষয়ে এই লিখবেন ভবিষ্যতে।
সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ-এর ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপুর্ণ অংশ হওয়া উচিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামক অংশটি। এতে গত ১১ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ হঠাৎ করে যে জরুরি অবস্হা ঘোষণা করলেন, তা কেন করলেন, কীভাবে করলেন, কাদের পরামর্শে করলেন-তার বর্ণনা রয়েছে। ঐ জরুরি আইনের শাসনে দেশ জর্জরিত হয়েছে প্রায় দু’বছর। কাজেই পাঠকরা যে জেনারেল মইন-এর বইটি পড়তে উন্মুখ হবেন তা প্রায় নিশ্চিত। তবে যারা জরুরি অবস্হা জারি করা সম্পর্কে জেনারেল মইন উ আহমেদ-এর বিবরণটি পড়বেন তাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তার বর্ণনাই ঘটনার একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিবরণ বলে বিবেচিত হতে পারে না। কারণ, ১/১১’র নাটকে আরো চরিত্র আছে। আর আছে এ নাটকের ঐ অংকের আগে ও পরে আরো বহু জানা-অজানা ঘটনা। তাই, অন্যান্য গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রের কথা না শোনা পর্যন্ত জেনারেল মইন উ আহমেদ-এর বিবরণটি কেবলই তার নিজের ভাষ্য হিসেবে দেখতে হবে।
জেনারেল আহমেদ ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে কিছু বড় ফাঁক রয়েছে। যার দরুন খুবই গুরুত্বপুর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন উঠছে। এমন গোটা পাঁচেক প্রশ্ন হলোঃ
এক. ২২ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভুত ‘সাংঘর্ষিক পরিস্হিতি’ থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই যদি জরুরি অবস্হা ঘোষণা করা প্রয়োজন হয়েছিল, তবে তা ১ বছর ১১ মাস ২ দিন ধরে চললো কেন? রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ কেউই কি তখন জানতেন না যে, অতদিন জরুরি অবস্হা জারি রাখা হবে সংবিধানের লংঘন? তাহলে ‘আইন যাই বলুক, আমরা দু’বছর থাকবই’-এই মনোভাবটি কি পরিকল্পিতভাবে কিছু ঘটানোর সাক্ষ্য দেয় না?
দুই. জেনারেল মইন উ আহমেদ-এর ভাষ্য অনুযায়ী ১/১১’র আগে থাকতেই কয়েকটি প্রভাবশালী দেশের কুটনৈতিক প্রতিনিধি তাকে যোগাযোগ করে ‘উদ্ভুত পরিস্হিতিতে’ সেনাবাহিনী দেশের দায়িত্ব নেবে কিনা জানতে চেয়েছিলেন। এর একটি অর্থ কি এমন হতে পারে যে, ঐ বিদেশিরাই চেয়েছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গোলযোগকে উছিলা করে দেশের সেনাবাহিনী অথবা তাদের ক্রীড়নকরা ক্ষমতায় বসুক?
তিন. ১/১১’র পর হঠাৎ করেই ‘দুর্নীতি দমন’ নামে একটি বিষয় প্রবলভাবে দেশবাসীর সামনে এনে খাড়া করা হয় এবং তার দু’এক মাসের মধ্যেই সরকার, ডিজিএফআই ও নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘জরুরি অবস্হা’ নামক নাটকটির প্লটের ভেতর রাজনৈতিক সংস্কার নাম দিয়ে চমক সৃষ্টিকারী একটি সাব-প্লট উপস্হাপন করা হয়। ঐ সাব-প্লটে একটি থিম ছিল ‘মাইনাস’। এগুলো দেশবাসী চাক্ষুষ করেছেন। কাজেই নাটকের এই অংক নিয়ে কোনো প্রমাণ দেখাবার প্রয়োজন নেই। তাহলে ‘জরুরি অবস্হা’ নামক যাঁতাকল দিয়ে ‘সংস্কারের’ নামে কি বাংলাদেশে বিদেশীদের আজ্ঞাবহ একটি সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্হাপনা চাপিয়ে দেবার জন্যই ১/১১ সৃষ্টি করা হয়েছিল?
চার. সেনাপ্রধান নিজেই বলছেন, ঢাকায় বিদেশি কুটনীতিকরা তাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছিল যে, ২২ জানুয়ারি নির্বাচনে সব দল অংশ না নিলে সেনাবাহিনী যেন সেই ভোট অনুষ্ঠানে কোনো দায়িত্ব পালন না করে। তা করলে বাংলাদেশী সৈন্যদের বাড়তি আয়-রোজগার করার জন্য আর বিদেশে শান্তি মিশনে যেতে হবে না। সেনাপ্রধান কি ঐ কুটনীতিকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা বা তাদের নিজ নিজ দেশের সরকার কি বাংলাদেশ সরকারকে ওই কথিত বিপদের কথা জানিয়েছে? অথবা সেনাপ্রধান নিজেই সরকারকে তথা ঐ সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে এই হুমকির কথা জানিয়েছিলেন কি?
পাঁচ. সেনাপ্রধান ১/১১’র সময়ের পরিস্হিতি সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ভাবতেন ‘এ সমস্যা রাজনীতিবিদদের তৈরি, রাজনীতিবিদদেরই এগিয়ে এসে এর সমাধান খুঁজতে হবে’। জেনারেল মইন-এর এই লেখায় বিষয়টির উল্লেখ নেই বলে আমরাই এখানে স্মরণ করি যে, ১৯৯০ এবং ১৯৯৬ সালে রাজনীতিবিদরা আসলেই কোন গৃহযুদ্ধ ছাড়া ‘সাংঘর্ষিক পরিস্হিতি’ থেকে বেরিয়ে এসে রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান করেছেন। তখন কোনো মার্শাল ল বা বিদেশীদের নির্দেশে সেনাপতিদেরকে ‘জরুরি অবস্হা’ আমদানি করতে হয়নি। এবার সেভাবে সমাধান করার শেষ সুযোগ পাওয়া গেল না কেন?
এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া গেলে ১/১১’র কোনো বর্ণনাই পুর্ণাঙ্গ বা গ্রহণযোগ্য হবে না। জেনারেল মইন উ আহমেদ-এর লেখায় একটি বিষয় বারেবারে এসেছে। তা হলো যে, আমাদের সৈনিকদের জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে যাওয়া খুবই জরুরি। ঐ কাজটি না করতে পারলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নাকি ভেঙে যেতে পারে।
আমাদের প্রশ্ন, কোনো দেশের কোনো পেশাদার সৈনিক (ঢ়ৎড়ভবংংরড়হধষ ংড়ষফরবৎ) কি এরকমটি ভাবে? তাহলে কি তার পেশাদারিত্ব (ঢ়ৎড়ভবংংরড়হধষরংস) বজায় থাকে? তা যদি না থাকে, তাহলে ওই সৈনিকের প্রতি সেই দেশের অন্য নাগরিকদের কী ধারণা হবে। আর যদি ধরা যায় যে, একদিন জাতিসংঘ আর শান্তিরক্ষা বাহিনী রাখবে না বা তা রাখার প্রয়োজন বোধ করবে না, তখন বাংলাদেশের সৈনিকদের দৃষ্টিভঙ্গী কি হবে?
জেনারেল মইন উ আহমেদ তাঁর স্মৃতিগ্রন্হের ‘ওয়ান ইলেভেন’ অধ্যায়ের শেষাংশে লিখেছেন ‘দেশের ইতিহাসই এ দিনটির সফলতা কিংবা ব্যর্থতা বিচার করবে।’ হয়তোবা তাই। কিন্তু দেশের ওপর এ দিনটির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আমরা এখনই কিছু বলে দিতে পারি। যেমন ১/১১ দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, রাজনীতিকে বিকৃত করেছে, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করেছে, অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়েছে, দেশে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়িয়েছে, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে রিমোট কন্ট্রোল পরিচালিত রোবটে পরিণত করেরেছ, যা এখন ফ্র্যাঙ্কেনষ্টাইনে রুপ নিতে চাইছে, বিচার বিভাগকে হাস্যকর করেছে, সর্বোপরি দেশব্যাপী সর্বস্তরে আস্হার সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে জেনারেল মইন উ আহমেদ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার দ্বার খুলে দেয়ায় তাঁকে ধন্যবাদ।