Wednesday, April 1, 2009

পাকিস্থান প্রশ্নে শেখ মুজিব

পাকিস্থান প্রশ্নে শেখ মুজিব

অসংগতি, স্ববিরোধীতা, কথা ও কাজে গরমিল শেখ মুজিবের সমগ্র রাজনৈতিক জীবনেরই একটি বৈশিষ্ট। তবে, আপাতত: একাত্তর থেকেই শুরু করা যাক:

এক)
১৯৭০-এর নির্বাচনের পরে আওয়ামীলীগের পক্ষে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বড় সমাবেশ প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১-এর ৩ জানুয়ারী রমনা রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে। এদিন আওয়ামীলীগের টিকেটে নির্বাচিত জাতীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান শেখ মুজিব। এই শপথের শেষ বাক্যটি ছিল: জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান
(সূত্র: দৈনিক পাকিস্তান, ৪ জানুয়ারী, ১৯৭১)

দুই)
এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে দৈনিক পাকিস্তানের ভাষ্য:
"দেশের সর্বত্র শান্তি-শৃংঙ্খলা বজায় রাখার ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়া মেখ মুজিব গণতান্ত্রিক বিজয়কে সুসংহত করার স্বার্থে সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের দালালদের বাড়াবাড়ি দমনের জন্য দেশবাসীকে সদাপ্রস্তুত থাকার আহবান জানান। তিনি বলেন, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, মহল্লায় মহল্লাহ আওয়ামীলীগ গঠন করুন এবং রাতের অন্ধকারে যাহারা ছোরা মারে তাহাদের খতম করার জন্য প্রস্তুত হোন। রাতের অন্ধকারে যাহারা মানুষ হত্যা করে, সেইসব বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, চোরের মত রাতের অন্ধকারে মানুষ হত্যা করিয়া বিপ্লব হয় না। বিপ্লব চোরের কাজ নয়। সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদের দালালদের খতম করার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের বাঁশের এবং সুন্দরী কাঠের লাঠি বানাইবার পরামর্শ দিয়া শেখ সাহেব বলেন, প্রত্যেকের হাতে আমি হয় বাঁশের নয় সুন্দরী কাঠের লাঠি দেখতে চাই।"

উপরোক্ত দুটো ঘটনার প্রথমটিতে অর্থ্যাৎ শপথে 'জয় পাকিস্তান' শ্লোগান দিয়ে স্টষ্টত তিনি পাকিস্তানের প্রতি তার আনুগত্য অক্ষুন্ন রেখেছেন। দ্বিতীয় ঘটনাটিও এই আনুগত্যেরই বর্ধিতাংশ। কেননা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তথা 'স্বাধীনতা পূর্ব বাংলা' কায়েমের প্রস্তাব তুলে সশস্ত্র যুদ্ধের কর্মসূচী দিয়েছিল যে বিপ্লবীরা, শেখ মুজিবের কাছে তারা হয়েছেন 'সন্ত্রাসবাদী' ও 'সান্ত্রাসবাদের দালাল' এবং স্বাধীনতাকামী এই সন্ত্রাসবাদীদের 'খতম' করার জন্য বাঁশ ও সুন্দরী কাঠের ব্যাপক আয়োজন করেছেন তিনি।


তিন)
একই ভাষণে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য "ধন্যবাদ" জানান। এ সম্পর্কে ঐদিনের পাকিস্তান অবজারভারের প্রতিবেদন:
Sheikh Muzib thanked President Yahiya for fulfilling his (Yahiya's) commitment in holding the elections. However, he said that there was a section among his (Yahiya's) subordinates who are still conspiring to undo the election results.
বক্তব্যটা পরিষ্কার। নির্বাচনি ফলাফল বাস্তবায়নে অর্থাৎ শেখ মুজিব তথা আওয়ামীলীগের কাছে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে ইয়াহিয়া খান প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। তার কিছু অধ:স্তন এটা বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে মাত্র। শেখ মুজিবের এ অভিনন্দন যে যথার্থই অভিনন্দন ছিল তার প্রমাণ জেনারেল ইয়াহিয়াও রেখেছেন- ৩ মার্চ ঢাকার জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহবানের নির্দেশ দিয়ে (১৩ ফেব্রুয়ারি) এবং মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করে (২২ ফেব্রুয়ারী)।

৭১ নিয়ে কে কি বলেন?

৭১ নিয়ে কে কি বলেন?

আওয়ামীলীগ নেতৃপৃন্দ দেশকে স্বাধীন করার কোন চিন্তা-ভাবনা করেননি- শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চিন্তা করেছিলেন।- মেজর (অব:) জলিল

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কোন ব্যাক্তি বা দলের একক অবদান ছিল না।- আ স ম আবদুর রব

মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামীলীগ দলীয়করন করে ফেলিছিল।- সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত

৭১ সালে আমরা যখন স্বাধীনতার জন্য জনগনকে প্রস্তুতি গ্রহণের কথা বলি, তখন ২৩ মার্চ আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে পাকিস্থান দিবস পালন করা হয় এবং আমাদের তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে অভিযুক্ত করে।- আবুল বাশার

প্রত্যক্ষ যুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোন সহকারী নেতাও অংশগ্রহন করেনি। - হায়দার আকবর খান রনো

আওয়ামীলীগের পালানোর প্রস্তুতি ছিল। - সানজিদা খাতুন

৭১ এবং আওয়ামী লীগের মিথ্যাচার
১। ২ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুব সমাজের পক্ষ থেকে ডাকসু ভিপি আ.স.ম আবদুর রব বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। এই পতাকা উত্তোলনের জন্য শেখ মুজিব ছাত্র নেতাদের যে র্ভৎসনা করেছিলেন- তার প্রত্যক্ষ শ্রোতা ও দর্শক অনেকেই আছেন।
২। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্র লীগের জনসভায় ছাত্র লীগের সাধারন সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন। আগে ঘোষণা করা হয়েছিল, এই জনসভার পর শেখ মুজিব মিছিলে নেতৃত্ব দিবেন। কিন্তু শেষ মুহুর্তে বক্তৃতার পর্যায়ে তিনি মিছিল কর্মসূচী বাতিল করেন। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠই তার কারন কি-না, সেটা গবেষনার বিষয়।
৩। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব ভাষণ দেন এবং এই প্রথম স্বাধীনতা কথাটি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন: এবাের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। অবশ্য, ভাষণ সমাপ্তিতেই আবার তিনি এর ব্যালান্স করার চেষ্টা করেন- একই সাথে 'জয় বাংলা, জয় পাঞ্জাব, জয় সিন্ধু, জয় বেলুচিস্তান, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় পাকিস্তান' শ্লোগান দিয়ে। (স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস: দলিলপত্র-এ জয় পাঞ্জাব, জয় সিন্ধু, জয় বেলুচিস্তান, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় পাকিস্তান- এ কটি স্লোগানের উল্লেখ নেই। এর রহস্য কি? তবে, সে সময়কার পত্র-পত্রিকা এবং যারা জনসমাবেশে ছিলেন, তারাই সাক্ষ্য দিবেন এ সম্পর্কে।)
৪। ১৪ মার্চ শেখ মুজিব ঘোষণা করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত। অতপর ১৫ মার্চই ইয়াহিয়া খান ঢাকা চলে আসেন এবং ১৬ মার্চ ১১টায় জেনারেল ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিব দেড় ঘন্টা কোন সাহায্যকারী ছাড়া 'রুদ্ধদ্বার' বৈঠক করেন। ১৭ মার্চ একই ভাবে একান্ত বৈঠক হয়- সাহায্যকারী ছাড়া। মুজিব- ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা 'রুদ্ধদ্বার' বৈঠক হয় ১৯ মার্চ শুক্রবার। এ দিন রাতে দুই পক্ষের ৩ জন করে উপদেষ্টা আলাদা বৈঠকে মিলিত হন। পরদিন অথ্যাৎ ২০ মার্চ শনিবার আওয়ামীলীগের ৬ জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী নিয়ে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ১৩০ মিনিট আলোচনা করেন এবং পরে তাঁর বাসভবনে সাংবাদিকদের শেখ মুজিব বলেন, "আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।" তিনি বলেন, "রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে তিনি এগুচ্ছেন।" ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকা আসেন ১২ জন উপদেষ্টা নিয়ে। জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা শেষে সাবংবাদিকদের তিনি বলেন, "সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।" ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেন। এ সংক্রান্ত দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদনটি লক্ষণীয়:
'গতকাল সোমবার ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবনে মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়া বৈঠক চলাকালে প্রেসিডেন্ট জনসংযোগ অফিসার বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে প্রেসিডেন্টের উপরোক্ত ঘোষণা প্রকাশ করেন।'
অর্থটা পরিষ্কার। আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার সমঝোতার ভিত্তিতেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে। লক্ষনীয়, গোলমালটা কিন্তি লেগেছিলো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা নিয়েই। প্রথমবার স্থগিতে ছিল আপত্তি। এবার সম্মতি। একই দিনে জেনারেল ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা হিশাবে আগত বিশিষ্ট আইনজীবী এ কে ব্রোহী লিখিতভাবে মতামত দেন যে, সামরিক আইন প্রত্যাহার ও ক্ষমতা হস্তান্তরে কোন আইনগত বাধা নেই।

৭ই মার্চের ভাষণ......."জয় পাকিস্তান" বিতর্ক ........

৭ই মার্চের ভাষণ......."জয় পাকিস্তান" বিতর্ক ........


১ মার্চ ১৯৭১ সাল। প্রেস ক্লাবে বসেছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠের অধিকারী প্রেস ক্লাবে ঢুকেই বলল, ‘সর্বনাশ হো গিয়া।’ আমি তার দিকে তাকালাম। সে লোকটি আর কেউ না, পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আসরার আহমদ। তখন সারা পাকিস্তানে এই ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নই একমাত্র অবিভক্ত ছিল। আমি আসরারের দিকে তাকালাম, বললাম ‘কেয়া হুয়া?’ আসরার সবেমাত্র পিআইএ বিমানে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় পৌঁছেছে। সে বলল, পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এর ফল যে ভালো হবে না তা সবাই জানে। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তারই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নানা টালবাহানা করে শেখ সাহেবকে মন্ত্রিসভা করতে ডাকছেন না। কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্য একটি ধারণা এবং পরিকল্পনা ছিল। সেনাবাহিনী ভেবেছিল, শেখ সাহেব নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। বাকি দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তাদের কাছে নির্বিঘ্নে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। কিন্তু জনতার রায় ছিল ভিন্ন। তারা শেখ সাহেবকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিল। কিন্তু সামরিক বাহিনী শেখ সাহেবকে ক্ষমতা দিতে রাজি নয়। তাই নানা টালবাহানা শুরু করেছিল। সর্বশেষ ইয়াহিয়া বলেছিল, ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু সেই অধিবেশন না বসার খবর নিয়েই বিভ্রান্ত হয়ে আসরার ঢাকায় এসেছিল।

এছাড়া আসরারের ঢাকা আসার অন্যতম কারণ ছিল, এ পরিস্থিতিতে কি করা যায়, তা পরামর্শ করতে হবে। তার সাধারণ সম্পাদক মিনহাজ বার্না পাকিস্তান টাইমসের প্রতিনিধি। তিনি ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গে আলাপ করতে হবে। আর ইউনিয়নের প্রধান নেতা হলো খন্দকার গোলাম মোস্তফা, যিনি সমধিক কেজি মোস্তফা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে ইউনিয়ন চলতে পারে না। এই দুই কারণে আসরার ঢাকায় এসেছিল। কেজি মোস্তফা যে সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে এত জনপ্রিয় তা বোঝাতে হলে একটি ঘটনার কথা বলি।

পাকিস্তানের শেষ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সম্মেলন বসেছে ইসলামাবাদে। তখন ইউনিয়নে আলোচনা চলছিল, প্রুফ রিডার ও কাতিবদের ইউনিয়নে সদস্য পদ দেওয়া হবে কি-না। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা আগেই ইউনিয়নের সদস্য ছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে কাতিবরা ছিল না। রাওয়ালপিন্ডি সম্মেলনে আমি একটি প্রস্তাব তুললাম, এবারে কাতিবদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেওয়া হোক। পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যরা একযোগে চিৎকার করে উঠল, না হবে না। আমি বললাম আপনারা কি জানেন আমার প্রস্তাবের সমর্থক কেজি মোস্তফা। এ কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। সবাই পরে বলল তোমার প্রস্তাব এক বছরের জন্য স্থগিত থাক। শুধু কেজি মোস্তফা নামের গুণে এটা সম্ভব হয়েছিল। এ ধরনের ছিল সারা পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে কেজি মোস্তফার জনপ্রিয়তা। আজকে কেজি মোস্তফা ঢাকায় থাকেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তবে ইয়াহিয়ার ঘোষণায় যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমরা অচিরেই টের পেলাম। সেদিন দুপুরে হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংবাদ সম্মেলন ছিল। সে সম্মেলন ছাত্র এবং জনতা, অফিস কর্মচারীসহ সবাই ঘেরাও করল। তাদের দাবি এখনি বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে। সমস্ত বাংলাদেশে আকাশ-বাতাস মথিত হলো একটি শ্লোগানে। সেই শ্লোগানটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাই; স্বাধীন বাংলা চাই। অবাঙালিদের সঙ্গে আমরা থাকব না। সেদিন বুঝিয়ে-সুঝিয়ে জনতাকে শেখ সাহেব নিবৃত্ত করলেন। বলা হলো, রেসকোর্সে ৭ মার্চ শেখ সাহেব ভাষণ দেবেন। আমরা সেই ৭ মার্চের ভাষণের জন্য গভীর প্রতীক্ষায় ছিলাম। এর মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেছে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ৭ মার্চ এলো। তারপর ৭ মার্চ রেসকোর্স লোকে লোকারণ্য। দক্ষিণ রমনা কালীবাড়ি, উত্তরে ঢাকা ক্লাব, মানুষ যেন উপচে পড়ছে। চারদিক মানুষ যেন আসছে আর আসছে। সবার হাতে লাঠি। এ যেন রেসকোর্সে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবে। সবার কণ্ঠে স্বাধীনতা চাই। আজকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চাই, মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। তাদের কণ্ঠে আমাদের নেতা পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যাবেন না। শেখ মুজিব পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না। পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্ট মানি না মানি না, সবাই হাতে অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

শেখ সাহেব জনসভায় আসার আগেই জনসভা মুখরিত হয়ে উঠল। এক দফা এক দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের নেতা পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে যাবেন না।

এর মধ্যে শেখ সাহেব জনসভায় এসে পৌঁছলেন। তখন লাখ জনতার কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি, তারা বারবার বলছে, পাঞ্জাবিদের পার্লামেন্টে আমাদের নেতা যাবেন না। এরপর বজ্রনির্ঘোষের মতো গগনবিদারী কণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করলেন। এমন সুলিখিত ভাষণ কোনোদিন শুনিনি। কি ভাষণ? আর শেখ সাহেবের কি গগনবিদারী কণ্ঠ? গোটা জনসভায় এক উন্মাদনা সৃষ্টি করল। শেখ সাহেবের ভাষণের মাঝে মাঝে পেছনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পেছনে ছিল ছাত্রলীগ নেতারা। তিনি এবারের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম বলে একটু থামলেন এবং পেছনে ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানের কাছে কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর তিনি বললেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান। শেখ সাহেবের মঞ্চে সামনের সারিতে চেয়ারে আমি ও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বসে ছিলাম, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। শেখ সাহেবের ভাষণের প্রতিটি অক্ষর গোগ্রাসে গিলছিলাম। এরপর সভা ভাঙল। জনতার একটি অংশের মনে যেন কিছু না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গেল। তারা সবাই ওইদিনই চেয়েছিল শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। কিন্তু তা শেখ সাহেবের পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংগ্রামের সময় উপস্থিত না-ও থাকতে পারেন। এই দুরদৃষ্টির ফলে তিনি বলেছিলেন আমি যদি নির্দেশ দিতে না পারি তাহলে তোমাদের কাছে নির্দেশ রইল যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এরচেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আর কি নির্দেশ থাকতে পারে? আজকে যারা বলেন, শেখ সাহেব সেদিন স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তারা কি বলতে পারেন এর চেয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা বেশি কী হতে পারে? আজকেও একদল লোক বলেন, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে আমি বলতে চাই, স্বাধীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সব তৈরি করে গিয়েছিলেন এবং সে ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান নিশ্চয়ই সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সাহস হলো একজন বেতার ঘোষকের সাহস। তার আগে এবং পেছনে সবকিছু প্রস্ট‘ত করে রেখেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে একথা সত্য, শেখ সাহেব ৭ মার্চের বক্তব্যের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’।

আমি জানি, আমার এ বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক আছে, কানাডা থেকে একদল ছেলে লিখে জানিয়েছেন, আপনি মিথ্যা লিখেছেন। কানাডা কেন? ঢাকারও অধিকাংশ লোকের বিশ্বাস আমি মিথ্যা বলেছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার স্মৃতি আমাকে বিভ্রান্ত করেনি। এবং আমার মতে, সেদিন জয় পাকিস্তান বলে শেখ সাহেব সঠিক কাজ করেছিলেন। একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে আমি একটি ভিন্ন কথা শুনেছি। বিশেষ করে বামপন্থী মহল এটা বলেছে। তারা সমালোচনা করেছে, শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন না কেন? আবার একই মুখে বলেছেন শেখ সাহেব বুর্জোয়া নেতা। তিনি কিছুতেই স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে পারেন না। আমার মত হচ্ছে, জয় পাকিস্তান না বলে কোনো উপায় ছিল না। তখনো আলোচনা শেষ হয়নি। ক’দিন পর ইয়াহিয়াদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা। একটি লোকও স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত নয়। সেদিন যদি জয় পাকিস্তান না বলে শুধু ‘জয় বাংলা’ বলতেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেন তাহলে ইয়াহিয়া বাহিনী মারমুখী আক্রমণ করত। লাখ লাখ লোক প্রাণ হারাতো। তখন এই মহলটিই বলত জনতাকে কোনো প্রস্তুত না করে এ ধরনের স্বাধীনতা ঘোষণা বালখিল্যতা। এ জন্যই অসংখ্য লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং এর জন্যই শেখ মুজিবের বিচার হওয়া উচিত।

এছাড়া জয় পাকিস্তান বলা সম্পর্কে আমার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলাপ হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি জয় পাকিস্তান বললেন কেন? শেখ সাহেবের মুখ কালো হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, ‘আমরা খাবার টেবিলে ছেলেমেয়ে সবাই খেতে বসতাম। প্রথমে আমরা এক হাতের পাঁচটি আঙ্গুল অপর হাতের একটি আঙ্গুল অর্থাৎ ছয়টি আঙ্গুল দেখাতাম। অর্থাৎ এই ছয়টি আঙ্গুল ছিল ছয় দফা। পরে পাঁচটি আঙ্গুল নামিয়ে ফেলতাম। বাকি থাকত একটি আঙ্গুল। অর্থাৎ এক দফা। অর্থ হচ্ছে ছয় দফার শেষ কথা হচ্ছে এক দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেদিন পাঁচ আঙ্গুল নামিয়ে ফেলার পর আমার কনিষ্ঠপুত্র রাসেল জিজ্ঞাসা করেছিল। তুমি আজকের জনসভায় জয় পাকিস্তান বলতে গেলে কেন?

আমি কি রাসেলের প্রশ্নের জবাব আপনাকে দেব? আমাকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হলে অনেক পথ অতিত্রক্রম করতে হবে। ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারকে শেষ কথা বলতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে ভুট্টো। তার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। আমি এই আলোচনা শেষ না করে কিছু করলে পৃথিবীতে আমি জবাবদিহি করতে পারব না। আমি এখন ভালো অবস্থানে আছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হয়েও আমাকে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না। এই প্রেক্ষিতে আমি কিছুটা ধমমৎবংংরাব হতে পারি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। আমাকে আমাদের সেনাবাহিনী ও সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। সেই আলাপ এখনো শেষ হয়নি। সবদিকে এত অপ্রস্তুত রেখে একটি দেশকে আমি সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি কি বোঝেন না ওইদিন চারদিকে শত্রু বেষ্টিত অবস্থায় আমার অন্য কিছু বলার ছিল না। এই হচ্ছে ৭ মার্চ শেখ সাহেবের বক্তব্য সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা। আমার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে এখনো অনেক মন্তব্য শুনি। কিন্তু তাদের কি স্মরণ নেই, ২৫ মার্চ কি অগোছালো অবস্থায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল? এটা যদি ৭ মার্চ হতো তাহলে আরো লাখ লাখ প্রাণ আমাদের হারাতে হতো। একথা কি সত্য নয়? যারা সেদিন শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছিলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন, শেখ সাহেব কি ভুল করেছিলেন? ওই ভুলটুকু না করলে আপনারা কোথায় পালিয়ে যাবেন সে সন্ধানও করার সময় পেতেন না। শেখ সাহেব যে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক লন্ডন প্রবাসী আবদুল গাফফার চৌধুরী। আমি জানি না, সে কথা আজ তার মনে আছে কিনা। তবে তিনি আমার সঙ্গে জনসভায় প্রথম সারিতে বসে ছিলেন।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতিক...নির্মল সেন