সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক পরিচয় দিতে সাহস পাইতেছে- বিষয়টি উদ্বেগজনক
নব নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসিবার পর জাতীয় জীবনে নতুন আশা-উদ্দীপনা সৃষ্টি হইয়াছে সত্য, তবে কোথাও কোথাও হঠাৎ করিয়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনমনে উদ্বেগ-উৎকক্তারও সৃষ্টি হইয়াছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারির ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হইয়াছে, কারামুক্ত দাগী, খুনি, চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা তাহাদের পূর্বের এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করিতেছে। কারামুক্ত সন্ত্রাসীদের র্যাব ও পুলিশ পুনরায় সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেফতার করার উদ্যোগ লইলে রাজনৈতিক চাপের মুখে অনেক ক্ষেত্রে উহা সম্ভব হয় নাই। পুলিশ ও র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে রাজনৈতিক চাপের কথা বলা হইয়াছে। বিষয়টি সত্যই উদ্বেগজনক। কারণ দলীয় রাজনীতি সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক হইয়া উঠিলে, গোটা রাজনীতি কীভাবে সন্ত্রাস কবলিত হইয়া পড়ে- পুরনো সেই রক্তাক্ত ও তিক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতি জাতি এখনো ভুলিয়া যায় নাই।
আইনি প্রক্রিয়ায় সন্ত্রাসীরা মুক্ত হইলে উহাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর করার কিছু নাই। কিন্তু মুক্ত হইবার পর সন্ত্রাসীদের পুনরায় অপরাধমূলক কার্যক্রমে তৎপর হওয়ার প্রমাণ পাইলেও পুলিশ-র্যাব যদি উপরওয়ালার ভয়ে হাত গুটাইয়া বসিয়া থাকে, তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পতন কেহ ঠেকাইতে পারিবে না। কারা সূত্রে জানা গিয়াছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নোটিশ বোর্ডে প্রতিদিন এখন সাড়ে ৪শ হইতে সাড়ে ৫শ আসামির নাম জামিনের জন্য টানানো হইতেছে। গত ২ বছরে র্যাব ও পুলিশের হাতে যেসব সন্ত্রাসী আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধরা পড়িয়াছে, তাহার অর্ধেকই ইতিমধ্যে জামিনে কারামুক্ত। ইহাছাড়া সন্ত্রাসের গডফাদার হিসাবে পরিচিত এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গা ঢাকা দিয়াছিল যাহারা, এখন প্রকাশ্যেই তাহারা ফিরিতে শুরু করিয়েছে। তাহাদের ব্যাপারে সরকার বিশেষ কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে বলিয়া জানা যায় নাই। এই পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট সন্ত্রাসীরাও আইনি প্রক্রিয়ায় কারাগার হইতে বাহির হইবার পর যদি পুরনো গডফাদারের পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তাহারা তৎপর হইয়া ওঠে, তবে অবধারিতভাবে খুনখারাপির ঘটনা বাড়িতে থাকিবে। সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাইলেই কতোটা নৃশংস ও ভয়ঙ্কর হইয়া ওঠে, অতীতে অসংখ্য ঘটনায় উহার প্রমাণ রাখিয়াছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যে কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ সারা দেশে অপরাধের মাত্রা বাড়িয়া যাওয়ার লক্ষণ সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হইয়াছে। শিক্ষাঙ্গনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশের প্রবণতাও স্পষ্ট। সরকারের সময়োচিত কঠোর পদক্ষেপে শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি এখন অনেকটা শান্ত হইয়া আসিয়াছে। জমি দখল, ক্যাব সার্ভিস সেন্টার দখল ইত্যাকার কয়েকটি ক্ষেত্রেও সরকার যথেষ্ট কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করিয়া যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়াছে। কিন্তু দেশব্যাপী ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ খুন-খারাপির মাত্রা যদি বাড়িতেই থাকে এবং সেইসব ঘটনায় জামিনে কারামুক্ত সন্ত্রাসী বা দলীয় রাজনীতির সংযোগ জনমনে সন্দেহ জাগায়, তাহা হইলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ক্রমেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাওয়ার আশঙ্কা বাড়িবে ইহাতে সন্দেহ করার কোনই কারণ থাকিবে না।
অতীতেও দেখা গিয়াছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকার আমলে নানা অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের ছাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। কারণ রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী বা সমর্থকদের বিভিন্ন মামলা দিয়া হয়রানি করার দৃষ্টান্ত কমবেশি সব সরকারের আমলে দেখা গিয়াছে। কিন্তু রাজনৈতিক হয়রানির শিকারদের মুক্ত করিবার সুযোগে যদি চিহ্নিত সন্ত্রাসীরাও মুক্ত হইতে থাকে, তাহা হইলে গোটা রাজনীতি আবার সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হইয়া পড়ার ভয় অমূলক নহে। তাহাছাড়া অতীতে আরো দেখা গিয়াছে, একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাসীদের ক্ষমতাসীন দলে ভিড়িয়া যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এবং ইহাও অনস্বীকার্য, সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকিয়াই সন্ত্রাস রাজনীতিকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইয়াছিল। অতীতের পুনরাবৃত্তি রোধে বর্তমান দিন বদলের পক্ষের সরকারকে অবশ্যই সর্বোচ্চ সতর্কতা দেখাইতে হইবে। রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব ধরনের সন্ত্রাসের লাগাম শক্ত হাতে টানিয়া ধরিতে হইবে এখনই।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা থাকিলেও, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কোনো প্রকার রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করিয়াছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। সদিচ্ছা থাকিলে নির্বাচিত সরকারের পক্ষেও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন নহে। জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থী নির্মূলের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাহার সরকারের শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করিয়াছেন। পাশাপাশি অন্যান্য সন্ত্রাসী-অপরাধীদের দমনের ব্যাপারেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিরপেক্ষ কঠোর ভূমিকা নিশ্চিত করিতে হইবে। সন্ত্রাসী-অপরাধী যেই হউক, তাহাকে গ্রেফতার করিবার নির্দেশ দিয়াছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। তাহার পরও সন্ত্রাসীদের অনেকে রাজনৈতিক পরিচয় দিয়া পুলিশের উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করিতে সাহস পাইতেছে।
Wednesday, February 4, 2009
সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক পরিচয় দিতে সাহস পাইতেছে- বিষয়টি উদ্বেগজনক
Labels:
ইত্তেফাক,
দিন বদলের কথা,
রাজনৈতিক প্রবন্ধ,
সন্ত্রাস
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment