Wednesday, February 4, 2009

ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের এখনই সময় ঃ ক্রেইগ ব্যারেট

ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের এখনই সময় ঃ ক্রেইগ ব্যারেট

ক্রেইগ ব্যারেট বিগত দশকগুলোতে তার ব্যবসায়িক দক্ষতার সুনিপুনতায় ইন্টেলকে রূপান্তর করেছেন বিশ্বের এক নম্বর ও সবচেয়ে শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিতে। তিনি যে তার কর্মক্ষেত্রে সফল একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এখন তিনি নতুন এক চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। এই চ্যালেঞ্জের নাম ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ বা ডিজিাল পার্থক্য দূরীকর। এজন্য উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে কম দামে কম্পিউটার সরবরাহ, ক্লাসমেট পিসি প্রদান এবং শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা করে চলেছেন তিনি। ২০০৫ সালে ইন্টেলের সিইও পদ ছেড়ে দিয়ে এ সকল মানব সম্পদ উন্নয়নমূলক কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন। কিছুদিন আগে ডিজিটাল ডিভাইড দূরীকরণ নিয়ে তিনি একটি পশ্চিমা মিডিয়াকে সাক্ষাতকার দিয়েছেন ও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরেছেন।

আফ্রিকার দেশ উগান্ডার দারিদ্র দূরীকরণে ইন্টেলের সাবেক সিইও ক্রেইগ ব্যারেট হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কিভা অরগ (িি.িশরাধ.ড়ৎম) ওয়েব সাইটের মাধ্যমে। অনলাইনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা দিয়ে সাহায্য করে এই সংস্থা। মূলত ঋণটি দেওয়া হয় কম্পিউটার যন্ত্রাংশ মেরামত ও সংযোজন, কম্পিউটার একসেসরিজ বিক্রির জন্য ছোট দোকান কিংবা ছোটখাট আইটি সার্ভিস ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে। উগান্ডায় এভাবে অনেক কম্পিউটারের দোকান খুলতে সাহায্য করেছে এই ঋণ। তবে এর ফলে কি ডিজিটাল ডিভাইড বা ডিজিটাল বৈষম্য দূর হচ্ছে? ক্রেইগ ব্যারেট এখানে দু’টি কারণ চিহ্নিত করেছেন যা তাকে আশা জোগায় এভাবে ডিজিটাল বৈষম্য ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে। তার মতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আইসিটি মার্কেট ক্রমেই বৃহৎ পরিসরে উন্মুক্ত হচ্ছে, যার ফলাফল হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি। আফ্রিকার মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়নের স্রোতধারাটি বুঝতে হবে, প্রথমে তাদের কাছে কোন প্রযুক্তিই ছিল না, তারপর তাদের কাছে মোবাইল ফোন নতুন দ্রুত যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে এল আর এখন চলছে ইন্টারনেটের জনপ্রিয়তা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এসব প্রযুক্তিগত উত্তরণের জন্য প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশের ৫-৬ বছর সময় লেগেছে। আফ্রিকার মোবাইল ফোন ব্যবহারের জনপ্রিয়তা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। গত বছর কিলিমাঞ্জেরো পর্বতমালা ভ্রমণ করতে আমি আর আমার স্ত্রী আফ্রিকায় গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের যে গাইড ছিল, সে সারাদিন মোবাইল ফোনে কথা বলছিল তার পরিবারের সদস্যদের সাথে। আফ্রিকার উপর দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চারটি সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ গিয়েছে তাই সেখানে ব্রডব্যান্ড ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেট অবকাঠামো খুব সহজেই গড়ে উঠছে।

এছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারও কিছু অর্থনৈতিক সহায়তা প্রকল্প চালু করে তথ্যপ্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। এ বিষয়ে উদাহরণ দিতে গেলে সবার আগে চলে আসে চীনের নাম। চীন বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেলফোন মার্কেট আর দ্বিতীয় বৃহত্তম কম্পিউটার মার্কেট। দু’তিন বছরের মধ্যেই আশা করা হচ্ছে চীন বিশ্বের বৃহত্তম কম্পিউটার মার্কেটে পরিণত হবে। এ জন্য চীনের সরকারেরও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রকল্প রয়েছে। আর প্রতিবেশী দেশ ভারত চীন থেকে চার পাঁচ বছর প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আছে, আফ্রিকা আবার ভারতের চেয়ে পাঁচ-ছয় বছর পিছিয়ে আছে। কিন্তু সবগুলো দেশই এগিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। এই চেষ্টা অব্যাহত রাখলে ডিজিটাল বৈষম্য খুব শীঘ্রই দূর না হলেও একদিন হয়ত থাকবে না। কিন্তু আমাদের ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে। এখন যে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে একে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের এখনই সময়। তবে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল অশিক্ষা ও নিরক্ষরতা। বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে এমনকি অনেক উন্নত দেশের তরুণ ও কিশোর সমাজ শিক্ষার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা সাধারণ শিক্ষারই যেখানে সুযোগ পাচ্ছে না সেখানে আইসিটি ভিত্তিক শিক্ষার বিষয়টি তুললে তা স্বপ্নই ধরে নিতে হবে। একইভাবে অনেক উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশও শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করছে। এর মানে হল হতাশার বিপরীতে যথেষ্ট আশাও রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণের মধ্যে আমাদেরকে আইসিটি ছড়িয়ে দিতে হবে। কমমূল্যে ক্লাসমেট পিসি সরবরাহ করার ব্যবস্থা আমরা করেছি এবং অনেক দেশের সরকারই ভর্তুকী দিয়ে হলেও এ সুবিধা গ্রহণ করেছে। এভাবে শিশুদের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। যদি তরুণদের মধ্যে এই হতাশা ঢুকে যায় যে, তাদের কোন ভবিষ্যত নেই, কোন কিছু করার নেই, তাহলে তারা মনে মনে ফন্দি আটবে অন্য কাউকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিতে। আমাদের এখনই সতর্ক হয়ে এ দিকগুলোও ভাবতে হবে নতুবা ডিজিটাল বৈষম্যের ফলাফল ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আর প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও একটি সমস্যা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতির মতো শক্তিশালী না হওয়ায় সফটওয়্যার সুবিধা তারা খুব বেশি পাচ্ছে না। আবার বিভিন্ন দেশের ভাষা বিভিন্ন হওয়ায় ইন্টারনেটের বিষয়বস্তুগুলোও সবাই গ্রহণ করতে পারছেনা। কেবলমাত্র ভারতেই ১৪টি জাতীয় ভাষা রয়েছে আর অনেক উপভাষাত্ত ব্যবহার রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ভাষা ১১টি। তাই ভাষাগত সমস্যা দূর করে প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে দিতে হবে সব অঞ্চলের ভাষায়। এভাবে তথ্যপ্রযুক্তির জন্য অবকাঠামো সব জায়গায় তৈরি করতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে আমরা ক্লাসমেট পিসি তৈরি করেছি যা ১০০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে খরচ পড়ে। আর এর ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোও তাদের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরিতে সহায়তা পেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলাকে আমি মনে করি ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে প্রথম পদক্ষেপ। সেই সাথে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগও ছড়িয়ে দিতে হবে। অবশ্যই কম মূল্যে। তাহলে সেদিন আর খুব দূরে নয় যেদিন ডিজিটাল বৈষম্য একদম দূর হয়ে যাবে। ইন্টারনেটে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চীনের শিক্ষক প্রযুক্তির ক্লাস নিবে ব্রাজিলের ছাত্রদের।

No comments: