ডিজিটাল বাংলাদেশের বইমেলায় ডিজিটাল স্পর্শ নেই
মোস্তাফা জব্বার : ৬ জানুয়ারি শপথ নেয়ার পর ৭ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে কার্যকর শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়ের নাম ডিজিটাল বাংলাদেশ। হাটে-মাঠে-ঘাটে, আমলাদের মুখে বা মন্ত্রীদের বক্তৃতায় এই একটি শব্দই বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। গত ২৭ জানুুয়ারি ২০০৯ বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার সঙ্গে এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে জানালেন যে, তাকে সংসদে এই প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে কী বোঝায়। ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করার পর শেখ হাসিনাকে এমন শত শত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ তিনি একটি নতুন স্বপ্ন একটি নতুন লক্ষ্যের কথা বলেছেন। পত্রিকার পাতা বা টিভির পর্দা, মোবাইল ফোন বা চায়ের আড্ডা; সবখানেই ডিজিটাল বাংলাদেশ। ভালো কি বা মন্দ, আশার বা নিরাশার এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করতে হচ্ছে আমলা, মন্ত্রী এবং রাজনীতিকদেরকে। বুঝে হোক আর না বুঝেই হোক তাদের কণ্ঠ থেকে এই কথা নিঃসৃত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
শেখ হাসিনা এই একটি শব্দ উচ্চারণ করে প্রথমে আতঙ্ক তৈরি করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার মাঝে। তড়িঘড়ি বেগম জিয়া হাসিনার আগেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও তার শেষ রক্ষা হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়। ধারণা করা হয় যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ শব্দটি দিয়েই শেখ হাসিনা নির্বাচনে বাজিমাত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হাসিনা সরকারের কাজে কি ডিজিটাল বাংলাদেশ এর সরব উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে? সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কি আদৌ উপলব্ধি করতে পারছে যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ করার জন্য তাদের পুরোনো সব ধারণা বদলাতে হবে এবং যে কোনো অবস্থাতেই হোক না কেন কর্মপদ্ধতির মাঝে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ঠাঁই দিতে হবে? আমরা প্রকাশনার বিবর্তন ও এর রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করতে পারি যখন বাংলা একাডেমীর একুশের বইমেলা শুরু হয়েছে।
যেহেতু সরকারটি শেখ হাসিনার বা তিনি সরকার প্রধান এবং হাসিনার প্রত্যয় হলো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার, সেহেতু সরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো। কিন্তু তেমনটি কি শুরু হয়েছে? বিশেষত বাংলা একাডেমী নামক যে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ভাষা শহীদদের নামে জন্ম নিয়ে ঐতিহ্যবাহী একুশে বই মেলার আয়োজন করে আসছে তাদের মাথায় ডিজিটাল বাংলাদেশ তো দূরের কথা ডিজিটাল শব্দটিই প্রবেশ করানো যাচ্ছে না।
স্মরণ করতে পারি, প্রায় এক যুগ আগেই আমি বাংলা একাডেমীকে কাগজের প্রকাশনার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রকাশনার দিকে যাত্রা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তখন আমার একজন শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে একমতও হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এই লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নেননি। মহাপরিচালকের পদ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার ডিজিটাল প্রকাশনার কী হলো? তিনি বলেছিলেন, একাডেমীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাথায় ডিজিটাল শব্দ ঢোকানো সম্ভব হয়নি। হতে পারে, তিনি সত্য বলেছিলেন। হতে পারে তার নিজের মাথায়ও ডিজিটাল শব্দটি ঢুকেনি। এরপর হাসিনা-খালেদার আমল মিলিয়ে আমার আরো দুইজন শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু তাদের কেউ ডিজিটাল প্রকাশনা তো দূরের কথা সেই শব্দটিই উচ্চারণ করেননি। সেই লক্ষ্যে কোনো কাজও করেননি। আমি তাদের কাছে কলিকাতা ও ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার নজির দিয়েছি। ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলায় যে ডিজিটাল বইয়ের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে সেই কথাটিও বলেছি। কলিকাতা বইমেলায় যে ডিজিটাল প্রকাশনাকে অবারিতভাবে প্রবেশ করতে দেয়া হয় এবং দিনে দিনে যে এসব প্রকাশনার পরিধি সম্প্রসারিত হয় সেটিও জানিয়েছি। কিন্তু বইমেলা নিয়ে আলোচনা এলেই তারা ডিজিটাল প্রকাশনাকে মেলায় ঠাঁই দেন না। এবার ২০০৯ সালেও যে কটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রকাশনা নিয়ে বইমেলায় স্থান বরাদ্দ চেয়েছিল তার একটিকেও স্টল বরাদ্দ করা হয়নি। দুনিয়ার কোথাও এমন নজির আছে বলে আমার মনে হয় না।
এই সংকট বাংলা একাডেমীর অস্থিমজ্জায় আছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ না খাওয়ানোতে এই প্রতিষ্ঠানটি অনড়। কথা ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা ভাষার উন্নয়নে কাজ করবে, কারণ কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড এর সঙ্গে একীভূত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশনা, যা এ দেশেরই আরো শত শত প্রতিষ্ঠান করে থাকে, তার বাইরে কিছু লোকের জন্মদিন ও মৃত্যু দিবস পালন করার বাইরে বাংলা একাডেমী আর কোনো কাজ করে না। বরং বাংলা ভাষার উন্নয়নে তারা সংকটই তৈরি করে। আমি একাডেমীর টাইপরাইটার উন্নয়ন প্রকল্পের কথা স্মরণ করতে পারি। ঐ প্রকল্পে বিপুল টাকা ঢেলে, দেশ-বিদেশ সফর করে একটি তিন স্তরের কিবোর্ড প্রস্তাব করা হয়েছিল যা কোনোদিন জন্মই নেয়নি। এই প্রতিষ্ঠানটি একাডেমী কিবোর্ড নামে একটি কম্পিউটারের কিবোর্ড অনুমোদন দিয়েছিল যা ছিল বিজয় কিবোর্ড এর হুবহু নকল। একই প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রনিক টাইপরাটারের জন্য ফেরদৌস কোরেশীর একটি কিবোর্ডকে মনোপলি হিসেবে অনুমোদন দিয়ে কোরেশীর ব্যবসার পরিধি বাড়িয়েছিল। কিন্তু কখনো বাংলা ভাষার উন্নয়নে তেমন কোনো অবদান রাখেনি। বারবার অনুরোধ করার পরও একাডেমী প্রকাশনায় বিবর্তন আনার জন্যও কোনো কাজ করেনি। একবাক্যে বলা যায়, যন্ত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য শহীদ মুনীর চৌধুরীর প্রচেষ্টার পর বাংলা একাডেমীর কাজকর্ম ছিল ন্যক্কারজনক ও ব্যর্থতায় ভরা।
আমি প্রস্তাব করি একাডেমীর উচিত অবিলম্বে তাদের পুরোনো অবয়ব ফেলে দিয়ে দেশ ও জাতির মননশীলতাকে ভিন্ন অবয়বে নিয়ে যাওয়ার। এতোদিন আমরা ভাবতাম একাডেমী যা করছে তা তাদের পুরোনো ছকে করছে, এদের সামনে কোনো লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু এখন এটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা যায় যে, কেবল বাংলা একাডেমী নয়, পুরো জাতির একটি ভিশন বা লক্ষ্য আছে। সেই লক্ষ্যটি হলো ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে কেবল কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যারকে বোঝেন তাদের জন্য এই কথাটি বলা দরকার যে, ধারণাটি সঠিক নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ হচ্ছে একটি দেশের একুশ শতকের তথ্যযুগে রূপান্তরের প্রত্যাশা। প্রধানত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের জীবনযাপনের মান উন্নত করা হলো ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল ভিত্তি। দারিদ্র্য ও বৈষম্যহীন একটি দেশে সকল মানুষের জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ডিজিটাল ডিভিশন দূর করা এবং দেশের নাগরিকদের মাথাপিছু আয় বাড়ানো ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলোর উন্নয়ন ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমার ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির ৪.৭ অনুচ্ছেদে রয়েছে, ‘রাষ্ট্রকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙ্গালির সংস্কৃতিসহ দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ডিজিটাল দুনিয়াতে রাষ্ট্রভাষাসহ বাংলাদেশের সকল ভাষার প্রচার, প্রকাশ ও বিকাশসহ বাঙালি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সার্বিক সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রকে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা ছাড়াও ডিজিটাল প্রকাশনাকে সর্বপ্রকারে উৎসাহিত ও সহায়তা করতে হবে।
আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম একাডেমী নিজে ডিজিটাল প্রকাশনা না করলেও ডিজিটাল প্রকাশনায় জড়িতদেরকে সহায়তা করবে। কিন্তু তারা পরিবর্তনের স্পর্শটি উপলব্ধিই করতে পারেনি। খুব সঙ্গত কারণেই আমরা আরো একটি গতানুগতিক বইমেলা দেখতে পেলাম। জানি না কবে এর রূপান্তর হবে। অথবা বলা যায় আদৌ এটি বদলাবে কিনা!
২৯ জানুয়ারি, ২০০৯
মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, লেখক।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment