যুদ্ধাপরাধীদের দেশত্যাগ ঠেকাতে সব রুটে তালিকা
নজরদারিতে অর্ধ শতাধিক গোয়েন্দা
নেসারুল হক খোকন : জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের তৃতীয় দিনে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বিল পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই নড়েচড়ে বসেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী গত দুদিনে যুদ্ধাপরাধীদের দেশত্যাগের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা দেয়ার পর প্রায় অর্ধ শতাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাদের নজরদারির আওতায় রেখেছেন। স্থল, জল ও বিমানবন্দরে পাঠানো হয়েছে দেশদ্রোহীদের প্রাথমিক তালিকা।
গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ আইন সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন যুদ্ধাপরাধীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে প্রথম মুখ খোলেন। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি ছিল
ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্র“তি। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন হলে সর্বসম্মতভাবে তা পাস হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে গতকাল শনিবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ সাংবাদিকদের বলেছেন, কোনো যুদ্ধাপরাধীকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে দেয়া হবে না। যুদ্ধাপরাধীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করে সীমান্তসহ বিমানবন্দরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে গতকাল সকালে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ক্যামেরা ট্রায়ালে নয়, স্বচ্ছ আইনী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে দেশের বাইরের পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে এ বিচার কাজ শুরু করা যেতে পারে। স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত রুম টু রোড-এর কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম নিয়ে যেন কেউ কোন প্রশ্নের সৃষ্টি না হয় সেদিকেও সরকারকে দৃষ্টি রাখতে হবে। সমাজকে সামনে এগিয়ে নিতে এ বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত বলে মনে করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের একটি তালিকা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানোর পাশাপাশি দেশের শীর্ষ গোয়েন্দাসহ ১২ কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিক মোতায়েন রাখা হয়। স¤প্রতি জাতীয় সংসদে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে গোয়েন্দা সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে গোয়েন্দাদের দেয়া হয়েছে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট। এদের মধ্যে সামরিক, এসবিসহ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যও রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ব্যক্তিরা যাতে কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
সূত্র জানায়, গোয়েন্দারা প্রাথমিক অবস্থায় প্রায় ৩০ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করলেও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের ঘোষিত তালিকায় যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ শতাধিক। সেগুলোও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করে অপরাধ সংঘটন, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ আহরণ এবং দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা উল্লেখযোগ্য যুদ্ধাপরাধীরা হচ্ছেনÑ জামাত নেতা গোলাম আজম, মওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, আবু ইউসুফ, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুস সোবাহান, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ প্রায় ৩০ জন।
সূত্র জানায়, গত ১ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকাটি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সবগুলো সীমান্তে কর্তব্যরত গোয়েন্দাদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তাকে এ সকল ব্যক্তিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। দেশের ভেতরে সকল এয়ারলাইন্সকে তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধীর অনুকূলে টিকেট ইস্যুর আগে গোয়েন্দা সংস্থাকে জানাতে বলা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য দেশের অন্য ইমিগ্রেশন পয়েন্টগুলোতে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
গোয়েন্দাদের মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment