নির্বাচনের পরে শেখ হাসিনার বক্তব্য
নির্বাচনোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা
০ এ বিজয় সমগ্র জাতির, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসনের বিজয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বিজয়
০ ডেপুটি স্পিকার নেয়া হবে বিরোধী দল থেকে ফ বিরোধীদলের সংখ্যা বিবেচনা না করে একসঙ্গে কাজ করব
।। ফারাজী আজমল হোসেন ।।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দিন বদলের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেছেন, এ বিজয় শুধু আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের নয়, এ বিজয় সমগ্র জাতির, এ বিজয় গণতন্ত্রের। তিনি বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে এই বিজয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সুশাসনের বিজয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির বিজয়। অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের বিজয়। তিনি অতীতের কষ্ট ও সকল ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
মহাজোটের অবিস্মরণীয় বিজয়ের পর গতকাল বুধবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ভাবি প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। শেখ হাসিনা বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে কাজ করার আশা ব্যক্ত করে বলেন, আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা অতীতেও যখন সরকারে ছিলাম তখন ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিরোধী দল থেকে দুইজনকে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলাম। নবম সংসদে ডেপুটি স্পীকার এবং আনুপাতিকহারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান পদ বিরোধী দলকে দেয়া হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সকল ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলকে আমরা সংখ্যা দিয়ে বিচার করবো না। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদাকে আমরা সমুন্নত রাখবো। বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। উপহার দিতে চাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জনগণ আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু, আর বড় শত্রু হচ্ছে দারিদ্র্য। আমাদের দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হবে। এজন্য শিক্ষাই হবে একমাত্র বাহন।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সকলের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ফসল এই বিজয়। বাংলার জনগণ যে আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের ওপর রেখেছে তার মর্যাদা আমাদের দিতে হবে। অতীতে আমাদের ওপর অনেকেই অনেক অন্যায় করেছে। সে ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। তবে যেহেতু আমরা বিজয় অর্জন করেছি, তাই সবকিছু ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে হবে। সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে সংযত থাকতে হবে। জনগণের সেবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু দারিদ্র্য। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ আমাদের গড়তেই হবে। দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে, মানুষের জীবনমান উন্নত করতে হবে। বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির দেশ হিসাবে। আমাদের প্রকৃত বিজয় তখনি হবে যখন আমরা বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, বিজ্ঞান প্রযুক্তিসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসাবে উন্নত করতে পারবো; আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবো, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারবো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারবো।
নতুন ভোটার যারা প্রথমবারের মত ভোট দিয়েছে তাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু আগামী দিনে তাদেরকেই দেশের নেতৃত্ব নিতে হবে, তাই গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখা ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নতুন প্রজন্ম দেশকে নতুন রাজনৈতিক চেতনায় এগিয়ে নিয়ে যাবে। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় শিক্ষিত জাতি হিসাবে দেশকে গড়ে তুলতে হবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী স্বত:স্ফূর্তভাবে তাদের পক্ষে রায় দেয়ার জন্য মা-বোন তথা নারী সমাজকে অভিনন্দন জানান। বাংলার গরীব-দুঃখী মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভয়-ভীতি, প্রলোভন উপেক্ষা করে তারা আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। মহাজোট নেত্রী সকল নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। সীমিত আয়ের মানুষ, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত যারা ভোট দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং যারা তাদের ভোট দেননি তাদেরও ধন্যবাদন জানান একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। তিনি বলেন, আমরা সকলের প্রতি সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। আমাদের সরকার হবে সকলের সরকার। তাই সকলের সহযোগিতা চাই।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে শেখ হাসিনা নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের জন্য প্রথমেই সর্বশক্তিশান আল্লাহতালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট দিয়ে আপনারা আমাদের এক বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। আপনাদের ভোটের মর্যাদা যাতে রক্ষণ করতে পারি সে জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। এই বিশাল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সহযোগিতাও চান তিনি। তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। সশস্ত্র বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটি ভোটার তালিকা প্রণয়নে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুলিশ, বিডিআর, র্যাব, আনসার, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের এবং নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রব্যমূল্য কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসাই হবে আমাদের প্রথম কাজ। কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। তাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এর থেকে তাদের মুক্ত করতেই হবে।
কলকাতার একটি পত্রিকার এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মাটি সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতে দেব না। আমি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। কেউ কারো বিরুদ্ধে যেন অভিযোগ করতে না পারে সেজন্য আমি জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের কথা বলেছি।
মিয়ানমারের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী সুচিকে মুক্তি দেয়া উচিত। আমরা অবিলম্বে সুচির মুক্তি চাই।
সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের পর এই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখলেন শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে দেশী-বিদেশী বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, মহাজোটের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যবৃন্দ ও দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা বেলা ১১-৫৬ মিনিটে তার লিখিত বক্তৃতা শুরু করেন। শেষ করেন ১২-১৪ মিনিটে। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় তার ডান পাশে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান এবং বাম পাশে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ও তার দুই মেয়ে, পুত্র বধূ উপস্থিত ছিলেন।
নীলপাড়ের শাড়ী পরিহিতা শেখ হাসিনা ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল। বেলা ১১-৫২ মিনিটে তিনি সংবাদ সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করেই মঞ্চ থেকে সকলকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তিনি ছিলেন অনেক বেশি শান্ত এবং সুস্থির। তার বক্তব্য ছিল গোছালো ও সাবলীল। তার বক্তব্যে সহনশীলতা এবং রাষ্ট্র নায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ছিল।
No comments:
Post a Comment