Wednesday, February 4, 2009

স্পর্শকাতর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের প্রস্তুতি

স্পর্শকাতর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের প্রস্তুতি

০ ট্রানজিট ০ টিফা ০ পোর্ট

।। জামাল উদ্দীন ।।

দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলে থাকা কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। ‘স্পর্শকাতর’ মনে করায় অতীতে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেছে এবং দ্রুতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসছে। বাণিজ্যমন্ত্রী লে: ক: (অব) ফারুক খান মঙ্গলবার বলেছেন, ট্রানজিট ও টিফার বিষয়ে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

এদিকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যুটিরও সুরাহা হচ্ছে শীঘ্রই। এই বন্দর দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়ার বিষয়টি ছিল বেশ আলোচিত এবং এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তবে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দরে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয় এবং ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার বিষয়ে প্রাথমিক কার্যাদিও অগ্রগতি লাভ করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ বিষয়গুলোর ওপর পর্যালোচনা করে গেছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত্ গ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেছে, যা শীঘ্রই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে।

জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ট্রানজিট ও টিফার বিষয়ে পজিশন পেপার তৈরি করেছে। আসছে ৯ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে ট্রানজিটের বিষয়টি হবে অন্যতম আলোচ্য বিষয়। ট্রানজিট অর্থ্যাৎ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের পণ্য পরিবহনের সুযোগ এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ দেয়া হবে। এর ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়বে এবং বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইতিবাচক হবে বলে মনে করছে সরকার। গত তিনটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ট্রানজিট ইস্যুটি আলোচিত হলেও সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

গতকাল আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (এ্যামচেম) মাসিক মধ্যাহ্ন ভোজ সভায় বলেছেন, ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। এ নিয়ে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়েছে। রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তুু দুর্ভাগ্য যে আমাদের রাজনীতিবিদরা বাণিজ্যকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে ভাবতে পারছে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এমন কোন সিদ্ধান্ত নেবে না যা জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। এসব দেশের সরকারগুলোকে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনতে হবে। আমি আশা করি সরকারগুলো সাধারণ জনগণের উন্নয়নের জন্যই এক সঙ্গে কাজ করবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, একজন বাণিজ্যমন্ত্রী হিসাবে আমি অবশ্যই মনে করি ট্রানজিট থেকে বাংলাদেশ লাভবান হবে। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতের পক্ষে প্রণব মুখার্জি এবং বাংলাদেশের পক্ষে তানভীর আহমদ সিদ্দিকী চুক্তিতে সই করেন। ঐ চুক্তির আর্টিকেল নম্বর ৮ এ সড়ক, রেল ও জলপথে ভারতকে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই চুক্তি প্রতি তিনবছর পর পর নবায়নযোগ্য এবং বিগত সময়েও চুক্তিটি নবায়ন করা হয়েছে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো চুক্তি (টিফা) সম্পাদনের বিষয়েও সরকার প্রস্তুুতি নিচ্ছে। টিফা চুক্তিকে ‘ইন্টারেস্টিং এগ্রিমেন্ট’ অভিহিত করে ফারুক খান বলেন, গত ৫ বছরে দু’দেশের সরকারের মধ্যে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। এসব চুক্তির ব্যাপারে সংসদে আলোচনা হবে কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

এদিকে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বিষয়ক এক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, ট্রানজিট নিয়ে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। প্রয়োজনে জনগণের ম্যান্ডেট নিতে হবে। ভারত কি চায়, কিভাবে চায় - সেটা জনগণকে জানাতে হবে। জনগণকে অন্ধকারে রেখে কিছু করা যাবে না। একই সঙ্গে ট্রানজিট নিয়ে অহেতুক বিলম্ব করা হলে এর সুফল থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে বলেও তাঁরা মন্তব্য করেন।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আনিসুল হক। আলোচনায় অংশ নিয়ে এফবিসিসিআই সাবেক প্রেসিডেন্ট সালমান এফ রহমান বলেন, বাংলাদেশ ভারতের ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজার। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বাজারের আকার হলো ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আর অনানুষ্ঠানিক বাজারের আকার হলো ৩ বিলিয়ন ডলার। এটাই ভারতের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের জন্যে একটি বড় কার্ড হতে পারে। এখন এই কার্ড আমরা কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করব সেটা আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়। বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের স্বার্থেই আমাদের ভারতের বাজারে প্রবেশের অধিকার দরকার। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে আমাদের বাজারে ঢুকে গেছে। বাজার দখল করে নিয়েছে। দেশে যখন ভারত বিরোধী সরকার থাকে তখনই ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বেশী সুযোগ পায়। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের ব্যবসা বিপুলভাবে বেড়েছে। ভারতকে দেয়ার মতো আমাদের আর কিছু নেই। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের সমস্যা হলো আমরা ভারতের সঙ্গে কথা বলতে চাই না। তারা এফটিএ-এর কথা বলেছে। আমরা এটি নিয়ে নিশ্চুপ। আমাদের অবস্থা উট পাখির মতো।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনার সময় তাদের হাতে অনেক কার্ড থাকে। কিন্তু আমাদের হাতে কার্ড হলো একটি। সেটা হলো ট্রানজিট। এই কার্ডটি অনেক ভেবে-চিন্তে ব্যবহার করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শাহীদুজ্জামান বলেন, ভৌগলিকভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় রাজ্যগুলো আমাদের বাজার। আমরা কেন এ সুবিধা ছেড়ে দেব। কিসের বিনিময়ে ছাড়ব। এ বিষয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার প্রয়োজন আছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারতে বাংলাদেশের জন প্রতি রফতানির পরিমাণ ৩০ সেন্ট। আর বাংলাদেশে ভারতের জন প্রতি রফতানির পরিমাণ ৩০ ডলার। তবে দ্বিপাক্ষিক এই ঘাটতিকে বড় করে দেখার কোন কারণ নেই। ভারতের সঙ্গে ঘাটতি আছে, সেটা আবার পূরণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে। তুলা, সুতা আসছে ভারত থেকে, সেটা আবার গার্মেন্টস হয়ে চলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। এখন নতুন ভাবে চিন্তার সুযোগ এসেছে। রাজনীতিতে এখন অর্থনীতি ঢোকানোর সময় এসেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি হলে সেটা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে, আর চীনের সঙ্গে হলে হয় না - এমন ধারাটা ঠিক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে চামড়া রফতানি করে আসছি। মনে রাখতে হবে ভারতের বাজারটি উন্নত দেশের মতো নয়। সেখানে চেইন শপের মতো ব্যবস্থা খুবই কম। আমদানিকারকরা খুব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একক ভাবে তাদের আমদানির ক্ষমতাও কম। ট্রানজিট প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা নিয়ে বেশী দিন বসে থাকা যাবে না। কারণ তারা বেশী দিন বসে থাকবে না। সেভেন সিস্টার্সের চিকেন নেক দিয়ে রেল লাইন নিয়ে তারা বেরিয়ে যাবে। আমরা আগের জায়গাতে বসে থাকব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সিএম শফি শামী বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আমাদের দরকার রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা। আমার গভীর বিশ্বাস বর্তমান সরকারের সে ইচ্ছে আছে। এখন দরকার এই ইচ্ছেকে গণমানুষের আকাঙক্ষার রূপ দেয়া। অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে অর্থনৈতিকভাবেই দেখা উচিত।

No comments: