৪ দল থেকে ছিটকে পড়ছে জামাত
আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার গঠন- জোট সৃষ্টির ৩ এজেন্ডাই উধাও য় সামনে কেবল যুদ্ধাপরাধ ইস্যু
আফজাল বারী : নির্বাচনে ভরাডুবির পর এরার চারদলীয় জোটের শরিকরা একে অপরের মুখোশ উন্মোচন করছে। ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিএনপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত দল হিসেবে আখ্যায়িত করে দূরত্ব বজায় রেখেছিল জামাত। এবার যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে বিএনপিও দূরে ঠেলে দিয়েছে জামাতকে। পরস্পরের দোষারোপের ফলে দীর্ঘ ১০ বছরের বিএনপি-জামাতের সেই মৈত্রীবন্ধ থেকে এবার ছিটকে পড়ছে জামাত।
জোটের শরিক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের পর ১৯৯৮ সালে তিনটি ইস্যুকে সামনে রেখে জোট গঠন করা হয়। বিএনপির নেতৃত্বে জোটের শরিক হয় জামাত, বিজেপি ও ইসলামী ঐক্যজোট (আমিনী)। আর এজেন্ডা ছিল আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন। জোট গঠনের কিছুদিন পর থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে তারা। ২০০০ সালে এসে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে সক্ষম হয় তারা। এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে নির্বাচন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৯টি আসনে বিজয় লাভ করে তারা। এর মধ্যে বিএনপি এককভাবে পায় ১৯৫টি আসন। আর শরীক দল জামাত ১৭টি, বিজেপি ৪টি ও ইসলামী ঐক্যজোট পায় ৩টি আসন। এরপর ১০ অক্টোবর ৬০ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে জামাতকে ২টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ক্ষমতার স্বাদও নিয়েছে জোটগতভাবে। কিন্তু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল জামাত।
রাজনৈতিক সিডরে বিধ্বস্ত বিএনপির দুর্দিনে শরিক দল হিসেবে পা বাড়ায়নি তারা। খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারেও কোনো প্রতিবাদও জানানো হয়নি জামাতের পক্ষ থেকে। উল্টো বিবৃতি দিয়ে বলেছে, কারো দুর্নীতির দায়ভার কাঁধে নেবে না জামাত। ওই সময় থেকেই পরস্পরের মধ্যে টানাপড়েন অবস্থা বিরাজ করছিল। নির্বাচনের খাতিরে ফের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনী লড়াইয়ে নামে চারদল। গত ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩৩টি আসন পায়। এর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জামাত ২টি ও বিজেপি ১টি আসন পায়। নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিএনপি-জামাত। জামাতের বক্তব্য ছিল বিএনপির মনোনয়ন ঠিক ছিল না। সংগঠন ছিল দুর্বল। তাদের প্রার্থীর অনেকেই ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই দলের ভরাডুবি হয়েছে।
অপরদিকে বিএনপির সকল স্তরের নেতাকর্মীর অভিযোগ ছিল নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি কাজে লাগিয়ে চারদলীয় প্রার্থীকে ধরাশায়ী করেছে প্রতিপক্ষ। সেই দোষে দোষী স্বয়ং জামাত। তাই জামাতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করাই ছিল তাদের বড় ভুল। নির্বাচনের পর বিএনপির দলের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক, তৃণমূল নেতাকর্মী ও কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ তরুণ নেতাসহ সারা দেশে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘জামাত মুক্ত বিএনপি’ স্লোগান জোরালো হয়ে উঠেছে। জামাতের কারণে নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে মনে করে তারা জামাতপ্রীতি বাদ দিয়ে দলকে নিজেদের মতো করে ঢেলে সাজানোর দাবি করছে। সারা দেশের মাঠ কর্মীরাই এ অবস্থান নিয়েছে। হাইকমান্ড তাই ২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন জোটগতভাবে করেনি।
এদিকে ২৯ জানুয়ারি সরকার সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব পাস করলে বিএনপির তরফ থেকে ৩০ জানুয়ারি সে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। ওইদিন বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে নীতিগতভাবে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। জোটের প্রধান দল বিএনপির এ মন্তব্যে নাখোশ জামাত। তার এ মন্তব্যের সময়ই চলছিল জামাতের মজলিসে শুরার বৈঠক। বিএনপির এ অবস্থান জানার পর জামাত গত ৩০ জানুয়ারি সংগঠনের মজলিসে শুরার বৈঠক করে একলা চলো নীতি অবলম্বন করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সূত্র জানায়, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মন্তব্যের পর ওই দিন রাতেই জামাতের পক্ষ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। জবাবে খালেদা জিয়া জানিয়ে দিয়েছেন, জোট গঠনের এজেন্ডার বিষয়ে নজর দিন। রাজনৈতিকভাবে কিছু করা হলে তা রাজনীতি দিয়েই মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিন। ওই দূতের বার্তা পেয়ে তুমুল আলোচনা চলছে জামাতে। শুরা কমিটির একজন সদস্য বলেন, জোটগতভাবে শরিকরা তাদের সহযোগিতা করবে না এমনটি তাদের মগজে আছে। তাই তারাও বিকল্প সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। বিএনপি তাদের এ অবস্থান পরিবর্তন না করলে ভবিষ্যতে উচিত শিক্ষা দিতেই আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দেবে। আলাপকালে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা বলেন, জামাতে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। তার পরও সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে হাঁটলে জামাতও রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে মোকাবেলা করবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জোট গঠন করা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙার ঘোষণা দেয়া হয়নি। তবে শরিকরা সহযোগিতা না করলে একলা চলো নীতিতে চলবে সংগঠন।
জোটের অপর শরিক দল বিজেপির মহাসচিব শামীম আল মামুন বলেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায় না এমন মানুষ নেই। দেরিতে হলেও সে বিচার আমরাও চাই। তবে কাউকে যেন রাজনৈতিকভাবে হয়রানি না করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো দলের কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার মোকাবেলা সে দলই করবে। যে এজেন্ডা নিয়ে জোট তার বাইরে আমরা যেতে পারি না।
অপর শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী বলেন, আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন Ñ এ তিন এজেন্ডা সামনে রেখে ৯৮ সালে জোট গঠন করা হয়েছে। এখন তিন এজেন্ডার কোনোটিই নেই। তাই জোটের কার্যক্রমও নেই। শুধু জামাত নেতা কেন যে কোনো দলের নেতাই যুদ্ধাপরাধী হলে আইন তার গতিতে চলবে। বিচার হবে। তাতে জোটগতভাবে কিছু করার আছে বলে আমার মনে হয় না।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়েছে। সত্যিকারের যুদ্ধাপরাধীর বিচার হোক। তিনি বলেন, আমরা জিয়ার আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যেতে চাই। আর জামাতের সঙ্গে ঐক্য থাকবে নাকি থাকবে না তা জামাতের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে। আইন তার নিজ গতিতে চলবে। কোন দলের নেতারা ফেঁসে গেলো তাতে বিএনপির চিন্তার কিছু নেই। ইস্যুভিত্তিক গড়া জোট থেকে কোনো দল ছিটকে পড়লে কারো কিছু করার নেই। আজকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জোটের জামাতের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে বলে তিনি জানান।
বিএনপি ও বিজেপির একাধিক নেতা জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে চারদল থেকে জামাতকে বাদ না দেয়ার ঘোষণা না হলেও আগামী সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জোটে তাদের অবস্থান সম্পর্কে জাতি জানতে পারবে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment