Thursday, February 5, 2009

দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স ও করিডোরঃ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা

দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স ও করিডোরঃ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা
ড. মাহবুব উল্লাহ
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘নির্বাচনী ইশতেহার-২০০৮’ প্রকাশ করে। ইশতেহারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্হাপন করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ইশতেহারের ১৫ অনুচ্ছেদটি ছিল যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো সম্পর্কে। এই অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘এশীয় রেল ও জনপথের আওতায় পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমুহের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্হাপন করা হবে।’ একই অনুচ্ছেদের ৫ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে আধুনিকায়ন করে এশিয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।’ ইশতেহারের ২৩ অনুচ্ছেদটি পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত। এই অনুচ্ছেদের ‘ঘ’ উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।’ ইশতেহারে উল্লিখিত উপ-অনুচ্ছেদগুলো পাঠ করে ধারণা করা যায়, নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর প্রদান এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সামরিক সহযোগিতাসহ সব ধরনের সহযোগিতা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। এশিয়ার জন্য ‘উন্মুক্ত করে দেয়া’ এবং দক্ষিণ এশীয় কথাগুলোর ধুম্রজালের আড়ালে বহু বছর ধরে প্রতিবেশী ভারতের উত্থাপিত দাবিগুলো পুরণ করাই হলো আওয়ামী লীগের মুল লক্ষ্য।

রাজনৈতিক ব্যবস্হা হিসেবে গণতন্ত্রের চাইতে উন্নততর কোনো ব্যবস্হা দার্শনিক ও রাজনীতিবিজ্ঞানীরা অদ্যাবধি নির্দেশ করতে পারেননি। কিন্তু আমরা সবাই জানি, গণতন্ত্রেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। অধিপতি শ্রেণী নিয়ন্ত্রিত শ্রেণী বিভক্ত সমাজে গণতন্ত্র কখনো সার্থক রুপ পায় না। সর্বোপরি পরাশক্তি ও আঞ্চলিক পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্হায় দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর খবরদারি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো এসব দেশের সরকার গঠনে অশুভ এবং অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের তৎপরতা চালায়। বাংলাদেশও এই অশুভ তৎপরতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। দেশপ্রেমের দিক থেকে দুর্বল এবং মুৎসুদ্দি চরিত্রের রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশি প্রভুদের তুষ্টি অর্জন এবং দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নির্বাচনী মেনিফেষ্টোতে এমন কিছু কর্মসুচি যোগ করে যার ফলে আধিপত্যকামী রাষ্ট্রগুলো এদের নির্বাচনে বিজয়ী হতে কুটনৈতিক সম্পদসহ সব ধরনের সম্পদ ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। গত ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ ধরনের কলাকৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে অনুসন্ধান গবেষকরা করতে পারেন।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, এবারের নির্বাচনটি হবে ১৯৭০-এর নির্বাচনের মতো। কার্যত তাই হয়েছে। বাংলাদেশ-উত্তরকালে ১৯৭৩-এর নির্বাচনের ফলাফলও একই রকম হয়েছিল। যদিও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ সুচিন্তিতভাবেই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চেয়েছিল, তৎসত্ত্বেও তারা চায়নি যে, পার্লামেন্টটি প্রাজ্ঞ বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের ভুমিকাশুন্য থাকুক। বেশ কিছুসংখ্যক প্রাজ্ঞ বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ এমন এক পরিস্হিতিতে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ১৯৭৫-এর ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সংসদে ‘ব্রুট মেজরিটি’ অর্জন করেও আওয়ামী লীগ তার একচেটিয়া কতৃ�ত্ব সম্পর্কে পরিতৃপ্ত থাকতে পারেনি। একচেটিয়া কতৃ�ত্বকে সব ধরনের সংশয় ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার জন্যই ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের মৌল চরিত্র পাল্টে দিয়ে চালু করা হয়েছিল একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্হা। এ যাত্রায় আওয়ামী লীগের অবিশ্বাস্য বিশাল বিজয় জাতির ললাটে কি চিহ্ন এঁকে দেবে-সেটা একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারে।

শপথ নেয়ার পর থেকে আওয়ামী শাসকরা ভিনদেশি সুহৃদদের ঋণ পরিশোধের জন্য অস্হির হয়ে উঠেছে। তাদের এই অস্হিরতা অনুধাবন করা যায় ৫ জানুয়ারি-পরবর্তী সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালে। ১১ জানুয়ারি ২০০৯ দৈনিক ‘নয়াদিগন্ত’ পত্রিকায় পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ‘ভারত ও চীনকে ট্রানজিট দেয়ার বিষয়টি বর্তমান সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে গতকাল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একথা জানান।.... পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে চীনকে ট্রানজিট দেয়ার নতুন একটি দিক চলে এসেছে। বিএনপি সরকারের সময়কার পুর্বমুখী নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সড়ক সংযোগের কথা বলেছেন তিনি। চীনকে ট্রানজিট দেয়া হলে এ সড়ক পথ ব্যবহার করে বেইজিং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতে পণ্য আনা-নেয়ার সুযোগ পেতে পারে। ড. হাসান মাহমুদ অবশ্য এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে তিনি আগের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন।.... সেভেন সিষ্টার হিসেবে পরিচিত ভারতের উত্তর-পুর্বের সাতরাজ্য এবং চীনকে বন্দরের মাধ্যমে ট্রানজিট দেয়ার বিষয়টি বর্তমান সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে উল্লেখ করে ড. হাসান মাহমুদ বলেন, দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বিবেচনায় নিয়েই সরকার এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’ উলফা গেরিলাদের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, উলফা গেরিলা এবং ভারতে আটক বাংলাদেশী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে (সুত্রঃ আমার দেশ, ১১ জানুয়ারি, ২০০৯)।

সম্ভবত এই প্রথম বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী উলফা গেরিলারা বাংলাদেশে আছে বলে প্রকারান্তরে মেনে নিলেন। তা না হলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে উলফা গেরিলা এবং ভারতে আটক বাংলাদেশী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলা হবে কেন? এতকাল আমরা বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক সুত্রে জেনে এসেছি বাংলাদেশে ভারতীয় কোনো বিদ্রোহী গেরিলার অবস্হান নেই। তাহলে কি বলতে হবে এসব গেরিলা এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বাংলাদেশে অবস্হান নিয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেছেন, সরকার প্রতিবেশী কয়েকটি দেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার বিষয় চিন্তা করছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, মিয়ানমার ও চীন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি মাসে বাংলাদেশ সফরে এলে ট্রানজিট বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের ক্যাপাসিটি বাড়ানোসহ মংলা বন্দরকে আরো কার্যকর করা হবে। ২৩ জানুয়ারি ২০০৯ বিকালে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় গত ২৪ জানুয়ারি ২০০৯ পরিবেশিত এক সংবাদ থেকে এই খবর জানা যায়। এর আগে অবশ্য ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সাংবাদিকের জানিয়েছিলেন, ‘ভারতের দিক থেকে এজেন্ডাগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট।’ ট্রানজিট, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ এবং ভারত কথিত উত্তর-পুর্ব ভারতে বিদ্রোহী গেরিলা নেতাদের প্রত্যর্পণের বিষয়গুলো যে এসব এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত তাতে সন্দেহ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত তোষণনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেছিলেন, তারা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবেন যার ফলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার সেই অবস্হায় কোনো পরিবর্তন সাধন করতে না পারে। আমরা লক্ষ্য করেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দেয়ার জন্য রীতিমত দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ভারতের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী জয়রাম রমেশ বাংলাদেশ সফরে এসে গত ২২ জুলাই ২০০৭ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বৈধ বাণিজ্যের লক্ষ্যে ট্রানজিট সুবিধা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত কমে আসবে এবং উত্তর-পুর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি বৈধ বাণিজ্য চালু হবে। এতে দু’দেশই লাভবান হবে। তিনি একই সঙ্গে চট্টগ্রাম নিউমুরিং বন্দর ব্যবহারের অনুমতি ভারতকে দেয়ারও অনুরোধ জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই নৌ-বন্দরটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হলে, এই বন্দরের ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে (সুত্রঃ ইত্তেফাক, ২৩ জুলাই, ২০০৭)। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিটের নামে করিডোর দাবি করে আসছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ইষ্টার্ন কমান্ডের উপ-অধিনায়ক জেনারেল জেএফআর জ্যাকব মুক্তিযুদ্ধে তার অভিজ্ঞতার ওপর [ &ৗ৬৫৫৩৩; ]ঝঁৎৎবহফবৎ ধঃ উধপপধঃ ইরৎঃয ড়ভ ধ ঘধঃরড়হ[ &ৗ৬৫৫৩৩; ] গ্রন্হটি রচনা করেন। এই গ্রন্হে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে তার সঙ্গে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা প্রয়াত ডি পি ধরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। জেনারেল জ্যাকব ডি পি ধরকে বাংলাদেশের কাছ থেকে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার কথা বলেন। বিষয়গুলো হলো-বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ছিটমহলগুলোর যৌক্তিকীকরণ এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ। জেনারেল জ্যাকবের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ডি পি ধর বলেছিলেন, এসব রাজনৈতিক বিষয়। সঠিক সময়ে এগুলোর নিষ্পত্তি করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দাবি করার পেছনে ভারতের উদ্দেশ্য হলো কলকাতা ও বিশাখাপত্তম থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্হলপথ ব্যবহার করে ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সহজসাধ্য ও সাশ্রয়ী করা।

ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে তার ঘোষিত সুযোগ-সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য রাজনৈতিকভাবে সঠিক সময়ের ব্যবহার করতে চায়। ১৯৯৬-২০০১ সময়কালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে সেই সুযোগের সৃষ্টি হয়। সেই সময় ৩০ বছর মেয়াদি গ্যারান্টি ক্লজবিহীন গঙ্গার পানি চুক্তি করা হয়। ভারত একতরফাভাবে গঙ্গার উজানে পানি প্রত্যাহার করে এবং গ্যারান্টি ক্লজ না থাকার সুযোগ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে শুকনো মৌসুমে পানি থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে। সেই সময়কার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতকে করিডোর সুবিধা দেয়ার জন্য ভারতপন্হী থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন ত্রিভুজের আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছিল। ভারতকে করিডোর সুবিধা দিলে বাংলাদেশ বছরে দু’হাজার কোটি টাকা আয় করবে বলে প্রলোভনের জাল বিস্তার করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিরোধের মুখে ভারতের দাবি পুরণে সাহস পায়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয় ভারতকে আবারো প্রচন্ড রকমের আশাবাদী হতে উৎসাহী করেছে। ‘জঙ্গি দমন চেয়ে ঢাকা যাচ্ছেন প্রণব’ শিরোনামে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিকে উদ্ধৃত করে গত ২ জানুয়ারি ২০০৯ লেখা হয়েছে, প্রণববাবু বললেন, ‘ভোটের ফল ঘোষণার পর আমার সঙ্গে দু’বার শেখ হাসিনার কথা হয়েছে। আমরা সবাই খুশি। প্রধানমন্ত্রী এবং সোনিয়া গান্ধী দু’জনই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে।’ পত্রিকাটি আরো জানায়, প্রণব মুখার্জির সফরে সন্ত্রাস দমনের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি জলপথে যোগাযোগ, ভারতের উত্তর-পুর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের স্হল যোগাযোগ এবং দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর মতো বিষয়গুলোও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের তালিকায় অগ্রাধিকারে রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, গত দেড় বছরে জরুরি অবস্হার সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ কিছুটা এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু অনেক পথ হাঁটা এখনো বাকি বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আনন্দবাজার পত্রিকার মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা প্রতিবেশী এই দেশের সন্ত্রাসের ডেরায় পরিণত হওয়া। বাংলাদেশে শক্তঘাঁটি বানিয়েছে আলফা জঙ্গি গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার আসামের গোহাটির তিন জায়গায় বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলা হয়, উলফা এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তাছাড়াও উত্তর-পুর্বের রাজ্যগুলোর একাধিক জঙ্গিঘাঁটি বাংলাদেশে রয়েছে বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনটিতে। ঞযব ওহফরধহ ঊীঢ়ৎবংং পত্রিকায় ঞযব ওহংঃরঃঁঃব ভড়ৎ উবভবহপব ঝঃঁফরবং ধহফ অহধষুংরং-এর বিশেষজ্ঞ ড. অরবিন্দ গুপ্ত এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অশোক কে বেহুরিয়া যৌথভাবে লেখা এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনের ফলাফল কী ধরনের বার্তা বহন করছে? বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের শাসন দু’দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালো ছিল না। চারদলীয় জোটের শরিকদের ভারতবিরোধী মনোবৃত্তি ছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সম্পর্ক খানিকটা উন্নত হয়। কিন্তু তাকে মোটেই যথেষ্ট বলা যায় না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সঠিক পথে পুনর্স্হাপিত করার জন্য শেখ হাসিনা এবার অভুতপুর্ব এক সুযোগ পেয়েছেন। পুর্ববর্তী মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি ভাগ করে নেয়ার জন্য তিনি এক গুরুত্বপুর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এই চুক্তি ছিল বাংলাদেশের স্বার্থে খুবই উদার ও সুবিধাজনক। কিন্তু বিরোধী দলগুলো ও সেনাবাহিনীর চাপের মুখে তার গৃহীত রীতিনীতি সম্পর্কে তিনি খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু এবার তিনি ‘ব্রুট মেজরিটি’ লাভ করেছেন। কাজেই তিনি ভারতবিরোধী শক্তিগুলোর আপত্তি খারিজ করে দেয়ার এক বিরল সুযোগ পেয়েছেন।... ‘পরিবর্তনের সনদ’ নামে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্কের অঙ্গীকারের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ রয়েছে, আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার। এটা বিশেষ তাৎপর্যপুর্ণ যে, ইশতেহারে নাম ধরে ভারতের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়নি।’ আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয়ে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও মিডিয়ায় যে উচ্ছ্বাসের প্রকাশ ঘটেছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। প্রত্যেক দেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার আলোকেই বৈদেশিক সম্পর্ক নিরুপণ করে। ভারতীয় শাসক মহল সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছে যে, বাংলাদেশের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। এই সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে কেন?

ভারতের জন্য মহাজোটের মহাবিজয়ের মধ্য দিয়ে যে মহাসুযোগটি এসেছে তার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত তৈরি করে গেছে ‘জরুরি সরকার’। জরুরি সরকারের সময়ই ভারত ও বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসবাদবিরোধী যৌথ মহড়া অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার, জরুরি সরকার এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণকে জানাতে সাহস পায়নি। জরুরি সরকারের সময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে অনেক বাগাড়ম্বর করা হলেও পুরো বিষয়টি থেকে যায় অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিতাবিহীন। দুঃখের বিষয়, এ সম্পর্কে আমাদের জানতে হচ্ছে ভারতীয় সুত্র থেকে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও বিশেষ প্যারা-কমান্ডো বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন আর কে দাশ গত ১৪ জানুয়ারি বলেছেন, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসী এবং জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলা করার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এক যৌথ মহড়ায় অংশ নেবে। আসামের জোড়হাটে ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত এই যৌথ মহড়া চলবে। গ্রুপ ক্যাপ্টেন আর কে দাশ আরো জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদের হুমকির মুখে দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য এই যৌথ মহড়ার ব্যবস্হা করা হয়েছে।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন আর কে দাশ আরো বলেছেন, ভারত চায় ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো, যারা বাংলাদেশের ভুমি থেকে তৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের পরাভুত করতে বাংলাদেশ সুদৃঢ় সমর্থন যোগাবে। এই যৌথ মহড়া যে ভারতের নিরাপত্তা চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে-সেটা ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল দীপক কাপুরের বক্তব্য থেকেও আঁচ করা যায়। জেনারেল কাপুরের আশা, বাংলাদেশের নতুন সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্হান নেবে এবং ভারতের কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে নয়াদিল্লির কাছে হস্তান্তর করবে। জেনারেল দীপক কাপুর ভারতের ৬১তম সেনাবাহিনী দিবসের প্রাক্কালে গত ১৪ জানুয়ারি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, তারা সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করবে। দলটি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুরণ করবে বলে আমরা আশাবাদী।’ সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশের ভু-খন্ড ব্যবহার করতে না দেয়ার জন্য ঢাকার প্রতি আহ্বান জানিয়ে জেনারেল কাপুর বলেন, ভারতের উত্তর-পুর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা বন্ধ করার জন্য নতুন সরকারের সব ধরনের ব্যবস্হা নেয়া উচিত। কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদীকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে আমরা আশা করছি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের অরক্ষিত এলাকা দিয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা পারাপার হচ্ছে (সুত্রঃ প্রথম আলো, ১৬ জানুয়ারি, ২০০৯)।
উত্তর-পুর্ব ভারতে যা কিছু ঘটছে, সেটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িত হওয়ার যে কোনো ইঙ্গিত বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যে কোনো প্রয়াসকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রশক্তি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলেই বিবেচনা করে থাকে। পাকিস্তানও বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, উত্তর-পুর্ব ভারতের আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামকে ভারত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ বলে মনে করছে। বাংলাদেশ যদি এ ব্যাপারে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে উৎসাহ দেখায়, তাহলে বাংলাদেশ ভারতীয় বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ‘দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। আমরা নিশ্চিত নই, তবে মনে হচ্ছে এ ধরনের একটি টাস্কফোর্সের প্রক্রিয়া জরুরি সরকারের আমলেই শুরু হয়ে গেছে। সম্ভবত আসামের জোড়হাটে অনুষ্ঠেয় যৌথ সামরিক মহড়াটি তারই সুচনা। আওয়ামী লীগের ইশতেহারের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়াকে হয়তো রাজনৈতিক শুদ্ধতা দেয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সটির অবয়ব কী হবে-সে সম্পর্কে বর্তমান সরকারের নেতৃবৃন্দ এখন পর্যন্ত খোলাসা করে কিছু বলেননি। এর দক্ষিণ এশীয় চরিত্র কীভাবে বজায় থাকবে সেটিও স্পষ্ট নয়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্হা সার্কের একটি প্রোটোকল রয়েছে। সেই প্রোটোকলকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেয়ার কোনো রুপ প্রচেষ্টা না নিয়ে পৃথকভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠনের চিন্তা দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার মনোভাবকে ক্ষুণ্ন করবে কিনা-সেটাও ভাবা হয়নি। ভারত বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী নয়। বৃহত্তর পরিসরজুড়ে এবং দুইয়ের অধিক দেশকে নিয়ে যেসব সমস্যা সেগুলোকেও ভারত দ্বিপাক্ষিকতার সীমিত গন্ডিতে আবদ্ধ করতে চায়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স প্রশ্নে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ হয়েছে বলেও শোনা যায়নি। অথচ আপ্তবাক্যের মতো আওড়ানো হয়, সন্ত্রাসের কোনো সীমান্ত নেই, দেশ নেই। আমাদের একথাও বুঝতে হবে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসের যে সমস্যা রয়েছে তার প্রকৃতি ও উৎস দেশভেদে ভিন্ন। সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নিয়েও রয়েছে তীব্র মতপার্থক্য। ভারত যে সন্ত্রাসের মুখোমুখি, তার মধ্যে রয়েছে জাতিতাত্ত্বিক উপাদান। পাকিস্তান যে সন্ত্রাসের মুখোমুখি, সেটি স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি এবং স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে তার প্রলম্বিত রুপ। শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসবাদ নিরঙ্কুশভাবে একটি জাতিতাত্ত্বিক সমস্যা। নেপালে মাওবাদীরা যে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছিল, তার উৎস ছিল নেপালের স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং অতি পশ্চাৎপদ শোষণমুলক সমাজ ব্যবস্হা। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদে ধর্মীয় উপাদান বিদ্যমান। তবে এখন পর্যন্ত এটিকে ভারত বা পাকিস্তানে যা ঘটছে তার সঙ্গে তুলনীয় বলা যায় না। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও নজরের মধ্যেই আছে। সর্বোপরি এ ধরনের সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং বাস্তব বিচারে সন্ত্রাসবিরোধী দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্সের কর্মতালিকা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন। যখন সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনো কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির কলাকৌশলগুলো একাকার হয়ে যায়, তখন কোনো সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায় না।

দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্সের প্রস্তাব যে আসলে দক্ষিণ এশীয় থাকছে না, সেটি বোঝা যাচ্ছে ভারতীয় হাইকমিশনারের মন্তব্য থেকে। তিনি এটা ভারত ও বাংলাদেশকে নিয়েই দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে হতে পারে বলে মনে করেন। সুতরাং, কেউ যদি মনে করেন যে, ভারত আসলে চাইছে বাংলাদেশকে তার উত্তর-পুর্ব ভারতের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে, তাহলে এই আশঙ্কাকে অমুলক বলা যাবে কি? ধরা যাক, দু’দেশ মিলে প্রস্তাবিত টাস্কফোর্সটি গঠিত হলো এবং এরই ছত্রছায়ায় কথিত সন্ত্রাসবাদীদের তাড়া করতে কিংবা কথিত আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল, তখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কী হবে?
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ফেডারেলি অ্যাডমিনিষ্টার্ড এলাকায় তালেবানদের আস্তানার ওপর চালকবিহীন মার্কিনি ড্রোন বিমানগুলো প্রায় প্রতিদিনই বোমা হামলা চালাচ্ছে। এতে বহু নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অনেকে আহত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বাড়িঘর। ফলে সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে এবং তালেবানদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লংঘন করে এ ধরনের আগ্রাসন তালেবান জঙ্গি সমস্যার কোনো সমাধান তো করবেই না বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনীতি কাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে-এটি বোধহয় মার্কিনিরাও বুঝতে পারছে না। সুতরাং পরিণতির কথা বিবেচনা না করে ভারতের সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করে কোনো রকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্হিতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য কোনোক্রমেই সমীচীন হবে না।

ভারতের পক্ষ থেকে ট্রানজিট তথা করিডোর প্রশ্নে বাংলাদেশকে প্রলুব্ধ করতে বলা হচ্ছে, এর ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার পর্বতপ্রমাণ বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পাবে। কারণ বাংলাদেশ ভারতকে স্হল ও জলপথ ব্যবহার করতে দিয়ে বড় অংকের টোল আদায় করতে পারবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো ভারতীয় যানবাহনের বিশাল চাপ বহনের ক্ষমতা রাখে কি? এই অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে, তার যোগান কে দেবে? করিডোর প্রদানের জন্য সড়ক পথের সম্প্রসারণ করতে যে পরিমাণ আবাদী জমি হারিয়ে যাবে তার ফলে বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ম্ভর হওয়ার লক্ষ্যের কী হবে? করিডোর-সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের পৌনঃপুনিক ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে? ভারতীয় পরিবহন শ্রমিকদের মাধ্যমে এইডসের মতো জীবনঘাতী রোগ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, সেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্হ্যগত ঝুঁকির দায় কার ওপর বর্তাবে? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের নাক গলানোর অভ্যাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে যে ইনসার্জেসি চলছিল, তার প্রতি ভারতের যে নৈতিক ও বস্তুগত সমর্থন ছিল তাতো কোনো অজানা বিষয় নয়। ভারতীয় পণ্যবাহী কন্টেইনারগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার বাহনে পরিণত হবে না-তার নিশ্চয়তা কী? সর্বোপরি ভারত করিডোরের সুযোগ উত্তর-পুর্ব ভারতে বিদ্রোহ দমনের জন্য সৈন্য, অস্ত্র ও রসদ পরিবহনে কাজে লাগাবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কী? এর প্রতিক্রিয়ায় যদি বাংলাদেশ উত্তর-পুর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তাহলে এর ধকল সামলানোর ক্ষমতা বাংলাদেশের কি আছে?
মনে হচ্ছে, দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্সের প্রশ্নে সদ্য ক্ষমতাসীন সরকার অনেক দুর এগিয়ে গেছে। ১৭ জানুয়ারি ২০০৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাস দমনে দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনে ব্রিটেনের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই অনুরোধের জবাবে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সন্ত্রাসবাদকে বিশ্বের সব দেশের জন্য হুমকি আখ্যায়িত করে সন্ত্রাস নির্মুলে বাংলাদেশকে সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ৯/১১ ঘটনার পর মার্কিন নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যে যুদ্ধ ফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল তা থেকে বেশ ক’টি দেশ সরে এসেছে। সরে আসার কারণ ফ্রন্টে অংশগ্রহণকারী দেশসমুহে বিরুপ জনমত এবং যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে চরম অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ কি এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখবে না?

ভারতকে করিডোর দিলে বাংলাদেশ কতভাবে উপকৃত হতে পারে, তার নসিহত আমরা ভারতীয় নেতৃবৃন্দ, ভারতীয় কুটনীতিক এবং এদেশের কিছু আত্মবিক্রীত বুদ্ধিজীবীর কাছে শুনেছি। ভারত বার বার বলতে চেয়েছে, বিষয়টি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয় (সুত্রঃ আমার দেশ, ১১ জুলাই, ২০০৮)। অথচ ব্যয় ও লাভের উপাদানগুলো বিবেচনায় আনলে প্রাথমিকভাবে বলে দেয়া সম্ভব, বাংলাদেশের লাভের গুড়ে বালি। করিডোর পেয়ে ভারত নিজে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে চায়-উত্তর-পুর্ব ভারতকে ভারতের বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে শামিল করাতে চায়। কিন্তু এসবের তুলনায় ভারতের মুল বিবেচনা একান্তভাবেই ষ্ট্র্যাটেজিক। এখন যদি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, তাহলে সেই ষ্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ বহুলাংশে হাসিল হয়ে যাবে। ভারতকে করিডোর দেয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিরুপ মনোভাব আছে। তাই এই বিরুপ মনোভাবের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে টাস্কফোর্সের মতো নতুন ্লোগান ভারতের ষ্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ পুরণ করার কৌশল। এই লক্ষ্য পুরণ হলে করিডোরের বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়তে পারে। কারণ তখন দুই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্হা প্রতিযোগী না হয়ে, হয়ে দাঁড়াবে সম্পুরক। এই অবস্হা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বপ্রিয় জনগণের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে-সেই প্রশ্ন থাকল।
ভারত বাংলাদেশকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে টাস্কফোর্স গঠনের জন্য কোনো প্রকাশ্য প্রস্তাব দেয়নি। অথচ আওয়ামী লীগ বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে যোগ করে না চাইতে জল দেয়ার মতো আচরণ করল। এখন করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি ভারতের জন্য হবে বোনাস পাওয়া। টাস্কফোর্স পাকাপোক্ত হলে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ভারতীয় বিদ্রোহী দমনে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে আশঙ্কা করা হলে তাকে অমুলক আশঙ্কা বলা হবে কি করে? আল্লাহ না করুন, তেমন কিছু ঘটলে আমাদের গর্বের ধন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সুনাম ও মর্যাদা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? ক্ষমতাসীন সরকার কি আমাদের জানাবে সীমান্তে বিএসএফ কতৃ�ক নিরীহ বাংলাদেশীদের হত্যা, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, ভারত-বাংলাদেশ অচিহ্নিত সীমান্ত চিহ্নিতকরণ, তিনবিঘা করিডোর, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্য, তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা, সমুদ্র সীমানা চিহ্নিতকরণ, পুশইন প্রভৃতি সমস্যার কোনো একটির ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের হাত বাড়িয়েছে? আর তাই যদি না হলো তাহলে হাঙ্গরের চোয়ালে দেশটাকে গলিয়ে দেয়ার জন্য কিসের বাধ্যবাধকতা?
লেখকঃ প্রফেসর, ডেভেলপমেন্ট ষ্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (সূত্র, আমার দেশ,০৫/০২/২০০৯)

No comments: