Monday, March 30, 2009

ট্রানজিট ও বিবিধ প্রসঙ্গ: ড. তারেক শামসুর রেহমান

ট্রানজিট ও বিবিধ প্রসঙ্গ: ড. তারেক শামসুর রেহমান

96169_bangladesh.gif

ট্রানজিটের বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ১০ জুলাই ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রানজিটের প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ভারতকে ট্রানজিট দেয়া বা না দেয়ার বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা না করে অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনা করা উচিত। শ্রী চক্রবর্তীর এই তথ্যটি বেশ গুরম্নত্বপূর্ণ। কেননা তিনি ওই মনত্দব্যটি করেছিলেন এমন একটি সময় যার এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশ ও ভারত নয়াদিলিস্নতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠকে মিলিত হয়েছিল। গত ১৬-১৭ জুলাই ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এবং বৈঠকে ট্রানজিটের বিষয়টি ছিল অন্যতম একটি আলোচিত বিষয়।

দ্বিতীয়. আরও একটি বিষয় গুরম্নত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে আর তা হচ্ছে বাংলাদেশে যখন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৰমতায়, তখন ভারত বাংলাদেশের কাছে এই দাবিটি উত্থাপন করল। সাধারণত এ ধরনের কোনো নীতি নির্ধারণী সিদ্ধানত্দ একটি রাজনৈতিক সরকারকেই নেয়ার কথা। আগামী ডিসেম্বরে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করছি ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের শুরম্নতেই আমরা বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সরকার পাব। এৰেত্রে মাত্র কয়েক মাস যখন বাকি, তখন ভারত একটি অরাজনৈতিক সরকারের কাছে এই দাবিটি উত্থাপন করল। এখনে বলা ভালো, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই ভারতকে এয়ার ট্রানজিট দেয়া হয়েছে। এটা নিয়েও কম বিতর্ক হয়নি। তৎকালীন বিমান সচিব এয়ার ট্রানজিট সংক্রানত্দ একটি চুক্তি নয়াদিলিস্ন স্বাৰর করার পর ঢাকায় ফিরে এলে, তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। আর ভারতকে অনেক আগেই নৌট্রানজিট দেয়া হয়েছিল। ভারত এখন যা চাচ্ছে, তা মূলত স্থল ট্রানজিট। অর্থাৎ ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে (আসাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, আরম্নণাচল, মেঘলয় ও ত্রিপুরা) পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে চায়। এরই নাম ট্রানজিট। আর ভারত যে এই প্রথম ট্রানজিট চাইল, তা নয়। এর আগে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ৰমতায় ছিল (১৯৯৬-২০০১) তখনও ভারত বাংলাদেশের কাছে ট্রানজিট চয়েছিল। তখন এর নামকরণ করা হয়েছিল ট্রান্সশিপমেন্ট। পরে জোট সরকার ৰমতাসীন হওয়ার পর (২০০১-২০০৬) ভারত বিভিন্ন সময় এই দাবি উত্থাপন করে। যদিও কোনো সরকারের আমলে ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট বা ট্রানজিট কোনোটাই দেয়া হয়নি। তবে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য সচিবদের মধ্যে যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে যে একটি সম্মত কার্যবিবরণী স্বাৰরিত হয়েছিল, সেখানে 'গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস' কথাটা উলেস্নখ হয়েছে। সার্ভিসেস-এর আড়ালে ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার ও ট্রানজিট সুবিধা চাইছে। সেই দাবি থেকে ভারত কখনো ফিরে আসেনি। এজন্য তখন ভারতীয় হাই কমিশনার ট্রানজিটের দাবি তোলেন, তাতে আমি অবাক হই না। কেননা গত প্রায় বারো-তের বছর ভারত প্রত্যৰ ও পরোৰভাবে এ দাবি জানিয়ে আসছে।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আবার ভারতীয় হাই কমিশনার এ দাবি উত্থাপন করলেন। তবে পিনাক বাবুর সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত হতে পারছি না। তিনি যখন বলেন ট্রানজিটের বিষয়টি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক নয়, তখন তার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। ট্রানজিটের বিষয়টি অবশ্যই রাজনৈতিক এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের নিরপত্তার প্রশ্নটি সরাসরিভাবে জড়িত। কেন রাজনৈতিক, সে প্রশ্নেই এখন আসছি।

ভারত আসলে ট্রানজিট কেন চায়? ভারত বলেছে তারা তাদের পণ্য এক রাজ্য থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে অন্য রাজ্যগুলোতে নিয়ে যেতে চায়। এই যুক্তিতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। ইউরোপের অনেক দেশ কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশ এই সুবিধা ভোগ করছে। এখানে পার্থক্যটা হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো তাদের পণ্য স্থলপথে অন্য একটি দেশের মধ্য দিয়ে তৃতীয় আরেকটি দেশে নিয়ে যেতে চায়। ভারতের মতো এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্য নয়। ল্যাতিন আমেরিকার অবস্থাটাও ঠিক তেমনি। এর চাইতেও বড় যে পার্থক্য তা হচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত বোন রাজ্য 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আন্দোলন চলছে, যা ইউরোপে বা ল্যাতিন আমেরিকায় নেই। অভিযোগ আছে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যে পণ্য সরবরাহ করতে চায়, সেখানে পণ্যের আড়ালে তারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অবস্থানরত কয়েক লাখ সৈন্যের জন্য খাদ্য, রশদ ও সামরিক সরঞ্জামও সরবরাহ করবে। এতে তাদের খরচ কম ও সুবিধা অনেক। কেননা পরিবহন খরচ আগে বেশি। এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে এ কারণে যে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় পণ্যের যে 'ট্রান্সশিপমেন্ট' হবে, তার কোনো চেকিং অধিকার বাংলাদেশর থাকবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ কখনই জানতে পারবে না পণ্যের আড়ালে কী ধরনের মালামাল উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতবোন রাজ্যে নেয়া হয়েছে। আলোচনার কোনো এক পর্যায়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিবহনে ওইসব পণ্য ভারতীয় সীমানত্দে পেঁৗছে দেয়ার প্রসত্দাব করলেও ভারতীয়পৰ তাতে রাজি হয়নি। আর তাতে করেই সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার একটি সাৰাৎকারের কথা উলেস্নখ করা প্রয়োজন। বড়ুয়া এই সাৰাৎকারটি বিবিসি বাংলা বিভাগকে দিয়েছিলেন ১৯৯৭ সালের ১১ জানুয়ারি। তাতে তিনি বলেছিলেন, গত সাত বছর ভারতীয় বাহিনী তাদের বিরম্নদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেও তাদের কিছু করতে পারেনি। আজ বাংলাদেশ যদি ভারতের সঙ্গে যোগ দেয়, তাতেও কোনো লাভ হবে না। ভবিষ্যতে উলফা গেরিলাদের প্রতি আক্রমণের জন্য ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও তৈরি থাকতে হবে। পরেশ বড়ুয়ার এই হুঁশিয়ারি বলে দেয় বাংলাদেশ ভবিষ্যতে উলফা গেরিলাদের নতুন লৰ্যস্থলে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের হুমকিকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অভ্যনত্দরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বিঘি্নত হোক_ এমন কোনো সিদ্ধানত্দ আমরা নিতে পারব না। বলা ভালো, সাত বোন রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীতার ইতিহাস অনেক পুরনো। এখানে 'বিদ্রোহ দমনে' ৩ লাখ ৬৫ হাজার ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ৯৩ হাজার অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এ অঞ্চলে মোট ১৬টি গেরিলা গ্রম্নপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা ভারতীয় কতর্ৃপৰের বিরম্নদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে এবং তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরম্নদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। যেসব বিদ্রোহ গ্রম্নপের খবর পাওয়া গেছে, সেগুলো হচ্ছে আসামের (১) ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা) ও মোড়ো নিরাপত্তা বাহিনী। নাগাল্যা-ের (১) ন্যাশনাল সোসালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড (মুভিয়া গ্রম্নপ ও কাপলং গ্রম্নপ), (২) নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (আদিবো গ্রম্নপ ও খোদাও গ্রম্নপ)। মনিপুরের (১) পিপলস লিবারেশন আর্মি, (২) ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট, (৩) পিপলস রেভু্যলিউশনারী পার্টি। মেঘালয়ের (১) আচিন লিবারেশন পার্টি, (২) হাইনিট্রেপ ভলান্টিয়ার কাউন্সিল। অরম্ননাচলের (১) ইউনাইটেড লিবারেশন ভলান্টিয়ার অফ অরম্নণাচল, (২) ইউনাইটেড পিপলস ভলান্টিয়ার অফ অরম্নণাচল, (৩) ইউনাইটেড লিবারেশন মুভমেন্ট অব অরম্নণাচল। মিজোরামের হোমার পিপলস কনভেনশন। ত্রিপুরার (১) এল ত্রিপুরা টাইগারস ফোর্স ও (২) ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অফ ত্রিপুরা। এর বাইরেও আরও কিছু উপদল রয়েছে। যারা সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছে। এ অঞ্চলে নাগারই প্রথমে 'নিদ্রোহ' করেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় নাগারা মনে করেছিল ব্রিটিশরা তাদের স্বাধীনতা দিয়ে যাবে। ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগের দিন নাগাল্যা- স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল; কিন্তু ভারতের শাসকবর্গ নাগাদের এই স্বধীনতা মেনে নেয়নি। ১৯৫৩ সালে নাগা ফেডারেল আর্মি গঠিত হয় এবং এরাই সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। ষাটের দশকে মিজোরামে বড় ধরনের দুর্ভিৰ হয়। এতে বহু লোক মারা যায়। ওই দুর্ভিৰ প্রতিরোধে ভারতীয় কতর্ৃপৰ কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারেনি। ফলে সেখানকার মানুষদের অসনত্দোষকে পুঁজি করে লাল ডেঙ্গার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল মিজো জাতীয় ফ্রন্ট। আর ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ত্রিপুরায় বিজয় রাংকেলের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ট্রাইবাল ন্যাশনাল ভলান্টিয়ারস ফোর্স। যারা বাঙালি অধিবাসীদের বিরম্নদ্ধে তাদের সংগ্রাম শুরম্ন করে। ইতিমধ্যে সেখানে গঠিত হয়েছে অল ত্রিপুরা টাইগার্স ফোর্স। আসামে উলফার জন্মও ১৯৭৮ সালে। এরা ভারতীয় কতর্ৃপৰকে চ্যালেঞ্জ করে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করে আসছে। উলফা ছাড়াও আসামে বোড়োদের সশস্ত্র সংগ্রামের কথা জানা যায়। এই বোড়োরা ষাটের দশক থেকে উদয়াচল নামে আলাদা একটি রাজ্যের দাবি করে আসছে।

সাতবোন রাজ্যের সশস্ত্র সংগ্রামের এই হচ্ছে সংৰিপ্ত ইতিহাস। স্বতন্ত্র পরিচিতি বোধ, দিলিস্নর তামহেলা, অপাহাড়িদের আগ্রাসন ইত্যাদি কারণ পাহাড়িদের আন্দোলনের ইতিহাস প্রায় চলিস্নশ বছরের পুরনো। দিলিস্ন দীর্ঘদিন ধরে সপ্তকন্যার সশস্ত্র সংগ্রাম অবসানে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইছে। আজ ট্রানজিটের সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ বিদ্রোহী গ্রম্নপগুলোর টার্গেটে পরিণত হতে পারে না। আশার কথা পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র সচিবও আমাদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ বিঘি্নত হয়, এসব কোনো সিদ্ধানত্দ তারা নেবেন না। দিলিস্ন বৈঠকে কোনো সিদ্ধানত্দও হয়নি। দ্বিতীয়ত. বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় হেভী ট্রাক চলাচলের জন্য যে অবকাঠামো দরকার, সেই অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই। রাসত্দাঘাট প্রশসত্দ নয় এবং তা হেভি ট্রাফিকের জন্য উপযুক্ত নয়। সুতরাং ভারতীয় হেভি ট্রাকগুলোকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চলাচলে সুযোগ দিলে অবধারিতভাবে অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা বাংলাদেশের জন্য হয়ে যাবে বোঝাস্বরূপ। তৃতীয়ত. ভারতের সাত বোন রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বেশ চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারিভাবে যেসব পণ্য ভারতে রফতানি করে, তার একটা বড় অংশ যায় 'সাত বোন রাজ্যে'। ট্রানজিট সুবিধা দিলে বাংলাদেশি পণ্য রফতানি হ্রাস পাবে। এমনিতেই নানা শুল্ক প্রতিবন্ধকতার কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি পণ্য ভারতে যেতে পারছে না। চতুর্থত. ভারত বাংলাদেশের কাছে ট্রানজিট সুবিধা চাইলেও ভারত বাংলাদেশকে কখনো ট্রানজিট সুবিধা দেয়নি।

বাংলাদেশ বাংলাবান্ধা ও নেপালের কাকরভিটার মধ্যে যোগাযোগের ট্রানজিট সুবিধা পাচ্ছে না। ভারত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি সড়কও সংস্কার করেনি ভারত। ওই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্য আরও বাড়ত। যেখানে ভারত নিজেই তার নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ ও নেপাল ট্রানজিট সুবিধা দিচ্ছে না, সেখানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা যেখানে ঝুঁকির মুখে, সেখানে বাংলাদেশ ট্রানজিট দেয় কীভাবে? পঞ্চমত. ভারত তার 'সাত বোন রাজ্যে' পণ্য সরবরাহ করার জন্যই মূলত ট্রানজিট চায়। ভারত খুব সহজেই বাংলাদেশের সীমানত্দে একটি 'ইপিজেড' প্রতিষ্ঠা করে ওই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য শতকরা ১০০ ভাগ শুল্কমুক্তভাবে 'সাত বোন রাজ্যে'গুলোতে নিয়ে যেতে পারে। তখন ট্রানজিটের আর প্রয়োজন হবে না। চট্টগ্রামের দৰিণে কোরিয়ার নিজস্ব 'ইপিজেড' রয়েছে। জাপানিরাও আলাদা 'ইপিজেড' প্রতিষ্ঠা করে তাদের কিছু কিছু শিল্প বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চায়, যেখানে উৎপাদিত পণ্য তারা এখান থেকেই বিদেশে রফতানি করবে। দৰিণ কোরিয়া তাই করছে। ভারত এ কাজটি করতে পারে। কিন্তু ভারত তা করছে না কেন? এখানেই ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। ষষ্ঠত. ভারত বলছে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। এর একটি ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। ট্রানজিট ফি বাবদ বাংলাদেশ বছরে ৭০০ কোটি টাকা পেতে পারে। এ টাকা দিয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যাবে না। ওই ৭০০ কোটি টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি (বাণিজ্য) হ্রাস, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা কয়েকগুণ বেশি। সপ্তমত. একবার স্থল ট্রানজিট দিলে ভারতকে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহার করতে দিতে হবে। যা বাংলাদেশকে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। কেননা এমনিতেই চট্টগ্রাম পোর্ট কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর উপরে সাত বোন রাজ্যগুলোর কনটেইনার যদি হ্যান্ডলিং করতে হয়, তাহলে তা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের রফতানি তাতে ৰতিগ্রসত্দ হবে। অষ্টমত. ট্রানজিট সুবিধা না থাকার কারণে ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলীয় বেশ কিছু পণ্য, যেসব কাঠ, বনজ সম্পদ, নানা ধরনের খনিজ সম্পদ, রাবার, ফলমূল ইত্যাদি কম মূল্যে বাংলাদেশে রফতানি করে। মেঘালয়ের কাঠ, কয়লা, কমলা বাংলাদেশ কম মূল্যে আমদানি করে। ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা পেলে তখন এসব পণ্য সহজেই কলকাতা বাজার পাবার সুযোগ পাবে ও বাংলাদেশ বর্তমানের সুযোগ হারাবে। সুতরাং যে কোন বিবেচনায় ভারতকে ট্রানজিট দেয়া হলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা যেমনি ঝুঁকির মাঝে থাকবে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতি বিপর্যসত্দ হবে, ভেঙে পড়বে।
দিলিস্ন বৈঠক শেষ করে পররাষ্ট্র সচিব ঢাকায় ফিরে এসে বলেছেন, ট্রানজিট প্রশ্নে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। দ্বিপাৰিক বৈঠকে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলাদেশকে দেখতে হবে তার জাতীয় স্বার্থ রৰিত হয় কীসে, তা বিবেচনায় নেয়া। ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রৰা করতে পারব না। বাংলাদেশ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি 'কমিশন' গঠন করতে পারে, যারা ট্রানজিটের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। ওই ট্রানজিট ইসু্য নিয়ে জল ইতিমধ্যে কম ঘোলা হয়নি। উচ্চ আদালতে একটি রিটও হয়েছে। সুতরাং খুব সতর্কতার সঙ্গে ট্রানজিটের বিষয়টি 'ডিল' করতে হবে। আমার কথা সরকার কোনো 'চাপ' এর কাছে নতি স্বীকার করেনি। তবে আগামী দিনগুলোতেও ট্রানজিটের বিষয়টি যে আলোচিত হতে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেস্নষক ও অধ্যাপক

বাংলাদেশে সেনা-সম্পাদক বৈঠক প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা-২

বাংলাদেশে সেনা-সম্পাদক বৈঠক প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা-২

সেনাপ্রধানের চাকরির মেয়াদ-যে এক বছর বেড়ে গেলো, তাতে আমি খুশি। এজন্যে তাকে অভিনন্দনও জানাই। কিন্তু তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে 'জনস্বার্থে' তার অবসর গ্রহণের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলাতে একটু বিস্মিত হয়েছি। বিশ্বের যে-কোনো সেনাপ্রধান চাকরির মেয়াদ তখনই বাড়ে, ক্ষমতাসীন সরকার যখন তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে আরও কিছুকাল সেনাবাহিনী পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মনে করেন। 'জনস্বার্থ' কথাটির ব্যবহার কস্মিনকালেও কখনও দেখিনি।

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল অরোরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে) অসীম নৈপুন্যের পরিচয় দেবার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাকে চাকরিতে এক্সটেনশন দেবেন। তার চাকরির মেয়াদ একদিনও বাড়ানো হয়নি। বাংলাদেশে জেনারেল মইনের চাকরির মেয়াদ কী-ধরণের 'জনস্বার্থে' বাড়ানো হলো, তা আমি জানি না। সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে জেনারেল মইন বলেছেন, তিনি এ-ব্যাপারে কোনো তদবির করেননি, অর্থাৎ কোনো প্রভাব খাটাননি। তাহলে বর্তমান উপদেষ্টা সরকারই কি বর্তমান সেনাপ্রধানের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশতঃ তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন এবং 'জনস্বার্থে' তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে দেশবাসীকে জানাচ্ছেন? এ-সিদ্ধান্তটি যদি উপদেষ্টা সরকার নিজেই গ্রহণ করে থাকে, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই সিদ্ধান্তটি সম্পাদকদের কাছে ব্যাখ্যা করলে হয়তো প্রমাণ করা যেতো সেনাবাহিনীর প্রধান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সত্য-সত্যই এ-সরকারের আছে এবং সেনাবাহিনী বা সেনাকম্যান্ড নিজেরাই এ-সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেনি।

বর্তমান উপদেষ্টা সরকার ক্ষমতায় আছেন প্রায় ষোলো মাস হতে চললো। এ-ষোলো মাসে এ-সরকারের ক্ষমতা, উদ্দেশ্য, দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে নানা সন্দেহ জন্ম নিয়েছে। নির্বাচন কবে এবং কীভাবে হবে, আদৌ হবে কি-না, বাংলাদেশে এভাবে মাসের পর মাস জরুরী আইন বহাল রেখে দেশটার নাম গিনিস বুক অফ রেকর্ডস-এ তোলা হবে কি-না, বর্তমান সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে আসল সম্পর্কটা কী, বর্তমান সরকারের সকল ব্যর্থতার দায়িত্বের ভাগ সামরিক বাহিনী গ্রহণ করবে কি-না এবং সত্য-সত্যই বর্তমান সরকার তাদের ভার বহনে অনিচ্ছুক জাতির কাঁধ থেকে অবতরণ করবেন কি-না, এসব প্রশ্নই খাদ্যমূল্যে পীড়িত দেশের অসহায় মানুষের মনে ধিকি-ধিকি জ্বলছে। জনগণের মনের এ-ক্রমবর্ধিষ্ণু ক্ষোভ ও জিজ্ঞাসা সম্পর্কে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান-যে সচেতন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মাঝে-মাঝেই নির্বাচন ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই বর্তমান সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কে দু'জনেরই আশ্বাসবাক্য উচ্চরণে। জনসাধারণের মনে সরকারের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে সন্দেহ ও অনাস্থা দেখা না দিলে সরকার প্রধান ও সেনাপ্রধান-যে বারবার একই আশ্বাসবাণী উচ্চারণ করতেন না, তাও স্পষ্টভাবেই বুঝা যায়। সম্পদকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকেও সেনাপ্রধান ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন-যে অনুষ্ঠিত হবেই, তার উপর জোর দিয়েছেন।

শুধু প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে নয়, দেশে নতুন চেহারায় দূর্নীতি ও সন্ত্রাসের পুনরাবির্ভাব, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিদারুণ ব্যর্থতা, দুই নেত্রীর বিচারে দণ্ডলাভের আগেই তাদের অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যেই নানা ধরণের রাজনৈতিক দরকষাকষি, ভারত থেকে কয়েকজন সাবেক জেনারেলকে আনা ও কয়েটি ঘোড়া আমদানির কূটনীতিতে সাফল্য ছাড়া চাল আমাদানিতে কার্যতঃ ব্যর্থতা, ইত্যাদি নানা প্রশ্নে জনমন আজ আলোড়িত। প্রধান উপদেষ্টার উচিত এ-ব্যাপারে জনমনের অস্বস্তি, সংশয় ও ক্ষোভ দূর করার জন্য সংযোগ বৃদ্ধি করা এবং দেশে পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে সংবাদপত্র-সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘন-ঘন বৈঠকে বসে দেশের সঙ্কট ও সমস্যা সমাধানে সরকারের নির্দিষ্ট ও ইতিবাচক কোনো কর্মসূচি থাকলে, তা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করা।

দেশের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর বদলে কেবল বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠানে গিয়ে লালফিতা কাটা বা জনগণকে নানা হিতোপদেশ শোনালে কোনো কাজ হবে না। সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিকদের সঙ্গে দেশের সমস্যা সম্পর্কে ঘন-ঘন আলাপ-আলোচনায় না বসে এবং তাদের পরামর্শ না নিয়ে, কেবল রহস্যাবৃত নির্বাচনী রৌডম্যাপের কথা বলা হলেই এ-সরকার দেশের কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। ষোলো মাসে তারা যা পারেনি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আটমাসে তারা তা পারবে, তা বিশ্বাস করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই।

আমি ডঃ ফখরুদ্দিন আহমদের একান্ত শুভাকাঙ্খী বলেই তাকে এ-কথাটা বলছি যে, ইতিহাস তাকে সম্পূর্ণ অভাবনীয় ও বিরাট একটা সুযোগ এনে দিয়েছিলো। বিশ্বব্যাঙ্কের একজন অখ্যাত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অসংখ্য সাবেক গভর্নরদের একজন হিসেবে যার অবসর জীবনের বিস্মৃতিতে চলে যাওয়ার কথা, তাকে প্রাচীন কালের বাংলায় হাতীর মতো ইতিহাস যেনো শুঁড়ে তুলে রাজপথ থেকে একেবারে সিংহাসনে এনে বসিয়েছে। তার কাছে ইতিহাসের সম্ভবতঃ প্রত্যাশা ছিলো, তিনি বাংলার হতদরিদ্র মানুষের সকল সমস্যার সমাধান হয়তো করতে না পারেন, অন্ততঃ তাদের জীবনে তার সব উপদেষ্টাকে নিয়ে স্বস্তি ভাবটুকু এনে দিতে পারবেন। জাতির সমানে এগুবার রাস্তা নির্মাণের মাটি কাটার কাজটুকু অন্ততঃ শুরু করে যাবেন। যে-আলাদীনের দৈত্যকে তিনি তার সব অসম্ভব দায়িত্ব সম্ভব করার সহায়ক শক্তি হিসেবে পেয়েছিলেন, তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজে লাগাবেন। সেই দৈত্যকেই কাঁধে জাঁকিয়ে বসতে দেবেন না। তার হুকুম মেনে চলবেন না।

ইতিহাস ও জাতির এ-প্রত্যাশাটুকু প্রধান উপদেষ্টা এবং তার মনোনীত(?) একজন সহকর্মীও পূরণ করতে পারেননি। আমি আমার সাংবাদিক জীবনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মতো আর একটাও অনির্বাচিত সরকার দেখিনি, যারা জাতির এতোটা আস্থা, প্রত্যাশা ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন। আর সেই আস্থা, সমর্থন ও প্রত্যাশা যেনো ষোলো মাসের মধ্যেই কর্পুরের মতো উবে গেলো। আর যে-রাজনীতিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনা হয়েছে এবং যাদের ঘাড়ে দেশের সব সঙ্কটের দোষ চাপানো চেষ্টা চলছে, তারাই দেশবাসীর কাছে আবার পরিত্রাতা হিসেবে সম্মান ও সমর্থন লাভ করছেন এবং হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছেন। আজ না হয় কাল এ-রাজনীতিকদের হাতেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। (চলবে)

১৪ এপ্রিল, ২০০৮