Monday, March 30, 2009

বাংলাদেশে সেনা-সম্পাদক বৈঠক প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা-২

বাংলাদেশে সেনা-সম্পাদক বৈঠক প্রসঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা-২

সেনাপ্রধানের চাকরির মেয়াদ-যে এক বছর বেড়ে গেলো, তাতে আমি খুশি। এজন্যে তাকে অভিনন্দনও জানাই। কিন্তু তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে 'জনস্বার্থে' তার অবসর গ্রহণের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলাতে একটু বিস্মিত হয়েছি। বিশ্বের যে-কোনো সেনাপ্রধান চাকরির মেয়াদ তখনই বাড়ে, ক্ষমতাসীন সরকার যখন তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে আরও কিছুকাল সেনাবাহিনী পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মনে করেন। 'জনস্বার্থ' কথাটির ব্যবহার কস্মিনকালেও কখনও দেখিনি।

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল অরোরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে) অসীম নৈপুন্যের পরিচয় দেবার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাকে চাকরিতে এক্সটেনশন দেবেন। তার চাকরির মেয়াদ একদিনও বাড়ানো হয়নি। বাংলাদেশে জেনারেল মইনের চাকরির মেয়াদ কী-ধরণের 'জনস্বার্থে' বাড়ানো হলো, তা আমি জানি না। সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে জেনারেল মইন বলেছেন, তিনি এ-ব্যাপারে কোনো তদবির করেননি, অর্থাৎ কোনো প্রভাব খাটাননি। তাহলে বর্তমান উপদেষ্টা সরকারই কি বর্তমান সেনাপ্রধানের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশতঃ তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন এবং 'জনস্বার্থে' তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে দেশবাসীকে জানাচ্ছেন? এ-সিদ্ধান্তটি যদি উপদেষ্টা সরকার নিজেই গ্রহণ করে থাকে, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই সিদ্ধান্তটি সম্পাদকদের কাছে ব্যাখ্যা করলে হয়তো প্রমাণ করা যেতো সেনাবাহিনীর প্রধান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সত্য-সত্যই এ-সরকারের আছে এবং সেনাবাহিনী বা সেনাকম্যান্ড নিজেরাই এ-সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেনি।

বর্তমান উপদেষ্টা সরকার ক্ষমতায় আছেন প্রায় ষোলো মাস হতে চললো। এ-ষোলো মাসে এ-সরকারের ক্ষমতা, উদ্দেশ্য, দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে নানা সন্দেহ জন্ম নিয়েছে। নির্বাচন কবে এবং কীভাবে হবে, আদৌ হবে কি-না, বাংলাদেশে এভাবে মাসের পর মাস জরুরী আইন বহাল রেখে দেশটার নাম গিনিস বুক অফ রেকর্ডস-এ তোলা হবে কি-না, বর্তমান সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে আসল সম্পর্কটা কী, বর্তমান সরকারের সকল ব্যর্থতার দায়িত্বের ভাগ সামরিক বাহিনী গ্রহণ করবে কি-না এবং সত্য-সত্যই বর্তমান সরকার তাদের ভার বহনে অনিচ্ছুক জাতির কাঁধ থেকে অবতরণ করবেন কি-না, এসব প্রশ্নই খাদ্যমূল্যে পীড়িত দেশের অসহায় মানুষের মনে ধিকি-ধিকি জ্বলছে। জনগণের মনের এ-ক্রমবর্ধিষ্ণু ক্ষোভ ও জিজ্ঞাসা সম্পর্কে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান-যে সচেতন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় মাঝে-মাঝেই নির্বাচন ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই বর্তমান সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কে দু'জনেরই আশ্বাসবাক্য উচ্চরণে। জনসাধারণের মনে সরকারের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে সন্দেহ ও অনাস্থা দেখা না দিলে সরকার প্রধান ও সেনাপ্রধান-যে বারবার একই আশ্বাসবাণী উচ্চারণ করতেন না, তাও স্পষ্টভাবেই বুঝা যায়। সম্পদকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকেও সেনাপ্রধান ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন-যে অনুষ্ঠিত হবেই, তার উপর জোর দিয়েছেন।

শুধু প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে নয়, দেশে নতুন চেহারায় দূর্নীতি ও সন্ত্রাসের পুনরাবির্ভাব, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিদারুণ ব্যর্থতা, দুই নেত্রীর বিচারে দণ্ডলাভের আগেই তাদের অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যেই নানা ধরণের রাজনৈতিক দরকষাকষি, ভারত থেকে কয়েকজন সাবেক জেনারেলকে আনা ও কয়েটি ঘোড়া আমদানির কূটনীতিতে সাফল্য ছাড়া চাল আমাদানিতে কার্যতঃ ব্যর্থতা, ইত্যাদি নানা প্রশ্নে জনমন আজ আলোড়িত। প্রধান উপদেষ্টার উচিত এ-ব্যাপারে জনমনের অস্বস্তি, সংশয় ও ক্ষোভ দূর করার জন্য সংযোগ বৃদ্ধি করা এবং দেশে পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে সংবাদপত্র-সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘন-ঘন বৈঠকে বসে দেশের সঙ্কট ও সমস্যা সমাধানে সরকারের নির্দিষ্ট ও ইতিবাচক কোনো কর্মসূচি থাকলে, তা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করা।

দেশের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর বদলে কেবল বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠানে গিয়ে লালফিতা কাটা বা জনগণকে নানা হিতোপদেশ শোনালে কোনো কাজ হবে না। সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিকদের সঙ্গে দেশের সমস্যা সম্পর্কে ঘন-ঘন আলাপ-আলোচনায় না বসে এবং তাদের পরামর্শ না নিয়ে, কেবল রহস্যাবৃত নির্বাচনী রৌডম্যাপের কথা বলা হলেই এ-সরকার দেশের কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। ষোলো মাসে তারা যা পারেনি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আটমাসে তারা তা পারবে, তা বিশ্বাস করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই।

আমি ডঃ ফখরুদ্দিন আহমদের একান্ত শুভাকাঙ্খী বলেই তাকে এ-কথাটা বলছি যে, ইতিহাস তাকে সম্পূর্ণ অভাবনীয় ও বিরাট একটা সুযোগ এনে দিয়েছিলো। বিশ্বব্যাঙ্কের একজন অখ্যাত কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অসংখ্য সাবেক গভর্নরদের একজন হিসেবে যার অবসর জীবনের বিস্মৃতিতে চলে যাওয়ার কথা, তাকে প্রাচীন কালের বাংলায় হাতীর মতো ইতিহাস যেনো শুঁড়ে তুলে রাজপথ থেকে একেবারে সিংহাসনে এনে বসিয়েছে। তার কাছে ইতিহাসের সম্ভবতঃ প্রত্যাশা ছিলো, তিনি বাংলার হতদরিদ্র মানুষের সকল সমস্যার সমাধান হয়তো করতে না পারেন, অন্ততঃ তাদের জীবনে তার সব উপদেষ্টাকে নিয়ে স্বস্তি ভাবটুকু এনে দিতে পারবেন। জাতির সমানে এগুবার রাস্তা নির্মাণের মাটি কাটার কাজটুকু অন্ততঃ শুরু করে যাবেন। যে-আলাদীনের দৈত্যকে তিনি তার সব অসম্ভব দায়িত্ব সম্ভব করার সহায়ক শক্তি হিসেবে পেয়েছিলেন, তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজে লাগাবেন। সেই দৈত্যকেই কাঁধে জাঁকিয়ে বসতে দেবেন না। তার হুকুম মেনে চলবেন না।

ইতিহাস ও জাতির এ-প্রত্যাশাটুকু প্রধান উপদেষ্টা এবং তার মনোনীত(?) একজন সহকর্মীও পূরণ করতে পারেননি। আমি আমার সাংবাদিক জীবনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মতো আর একটাও অনির্বাচিত সরকার দেখিনি, যারা জাতির এতোটা আস্থা, প্রত্যাশা ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসেছেন। আর সেই আস্থা, সমর্থন ও প্রত্যাশা যেনো ষোলো মাসের মধ্যেই কর্পুরের মতো উবে গেলো। আর যে-রাজনীতিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনা হয়েছে এবং যাদের ঘাড়ে দেশের সব সঙ্কটের দোষ চাপানো চেষ্টা চলছে, তারাই দেশবাসীর কাছে আবার পরিত্রাতা হিসেবে সম্মান ও সমর্থন লাভ করছেন এবং হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছেন। আজ না হয় কাল এ-রাজনীতিকদের হাতেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। (চলবে)

১৪ এপ্রিল, ২০০৮

No comments: