March 27, 2009
বিশেষ প্রতিনিধি - ২০০৯-০৩-২৭
দৈনিক আমার দেশ
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার এক নিবন্ধে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিডিআর বিদ্রোহসহ নানা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, ‘দিল্লি এবার আর তার রাডার থেকে ঢাকাকে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে না।’ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালে শেষ হয়ে যায়নি। এ যুদ্ধ এখনো অব্যাহত আছে এক ‘গ্রেট গেম’ হিসেবে। এ খেলার প্রধান অভিনেতারা বাংলাদেশকে নিজ নিজ প্রভাববলয়ের মধ্যে রাখার জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। ১৯৭১ সালে পুর্ব পাকিস্তানে সামরিক বিজয়, বাংলাদেশ সৃষ্টি এবং শেখ মুজিবকে এ দেশটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে ভারত ‘রাউন্ড ওয়ান’-এ বিজয় লাভ করে। গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ, ২০০৯) দিল্লি, কলকাতা ও লন্ডন থেকে একযোগে প্রকাশিত দি এশিয়ান এজ পত্রিকায় ‘দিল্লি কান্ট এফোর্ড টু লেট ঢাকা ্লিপ অব ইটস রাডার’ শিরোনামে লেখা এক নিবন্ধে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী এ কথা বলেন। এ নিবন্ধে তিনি বিডিআর বিদ্রোহ ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়, মুজিবকে ‘ভারতের শরণাগত ব্যক্তি’ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু তিন বছরের মধ্যেই তার হত্যা এবং ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্হাগুলোর এই চক্রান্তের খবর সংগ্রহ করা, হুশিয়ারি দেয়া ও বঙ্গবন্ধুকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়াকে কিছু মহলে ভারতীয় নীতির বড় ধরনের পরাজয় বলে গণ্য করা হয় এবং প্রকৃত অর্থে তা ‘অপর পক্ষের’ বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কাজেই ‘রাউন্ড টু’ যায় পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির সহিংস ও যন্ত্রণাকর পথযাত্রা এর পরও কোনো সহজ বা সামঞ্জস্যপুর্ণ পরিণতির দিকে এগোয়নি। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তা ভারতের কাছে সুখকর বলে প্রতিভাত হয়েছে। অন্যদিকে একই কথা বিএনপি সম্পর্কে পাকিস্তানের জন্যও সত্য। তাই যেহেতু আওয়ামী লীগ পরিচালিত এক সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে, বিডিআর বিদ্রোহকে তখন এই ‘গ্রেট গেম’-এর পরবর্তী রাউন্ডের ঘণ্টাধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা যায়। মনে করা যেতে পারে এর উদ্দেশ্য হচ্ছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ পরিচালিত ভারতবন্ধুু সরকারকে অস্হিতিশীল করে বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির পাকিস্তানবন্ধু এক সরকারকে ঢাকায় পুনঃস্হাপিত করা। কিন্তু এ ধরনের কিছু ঘটুক নয়াদিল্লি তা কোনোমতেই চায় না। কারণ আগের আওয়ামী লীগ সরকারগুলো বাংলাদেশকে জিহাদি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী যেমন ‘হরকাতুল জিহাদ-ই-ইসলামী বাংলাদেশ’ (হুজি-বি) এবং উত্তর-পুর্ব ভারতবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর আশ্রয়স্হলকে অপারেশনের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। নয়াদিল্লি বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে পুরোপুরি এবং চুড়ান্তভাবে সমর্থন করে। কিন্তু এ বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য স্বীকৃতি অবশ্য আওয়ামী লীগের জন্য মৃত্যুচুম্বনও হতে পারে। এ বিষয়ে ভারতের বিকল্প সীমাবদ্ধ এবং নয়াদিল্লিকে তার তাস খেলতে হবে সৃজনশীল কল্পনাশক্তি নিয়ে এবং খুবই বিচার-বিবেচনা করে।
নিবন্ধে বলা হয়, নয়াদিল্লিকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সতর্কতা আরো কঠোর করতে হবে এবং সীমান্তে বেড়া দেয়ার কাজকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া বিএসএফের জনশক্তি, নজরদারির সরঞ্জাম এবং ব্যবস্হাপনা আরো শক্তিশালী করতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতকে অর্থনৈতিক, করপোরেট, সাংস্কৃতিক এবং পিপল টু পিপল বা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে দুই বাংলার মধ্যে সম্পর্ককে উৎসাহ প্রদানও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। আর এ সবকিছু করতে গেলে প্রয়োজন দৃঢ় সঙ্কল্পযুক্ত বিরতিহীন কুটনীতি।
নিবন্ধে জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ যখন বিডিআর বিদ্রোহ সম্পর্কে তিনটি অনুসন্ধানের ফলাফলের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে, কট্টরপন্হী জিহাদি সংগঠনগুলো যাদের মধ্যে রয়েছে জামা’আতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ এবং হুজি-বি’র মতো সংগঠন তাদের নাম ছায়া থেকে বেরিয়ে সামনে আসছে। এই সংগঠনগুলোর সুপরিচিত ও সুদীর্ঘকালের সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়্যেবা এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে। এই সংযোগ পরিচিত এক কাহিনীকেই তুলে ধরে। তবে এতে কারো বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। কারণ পুরনো ‘ গ্রেট গেম’ এখনো অব্যাহতভাবে জারি রয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা, বাংলাদেশ খুব সহজে এবং বারবার প্রায়ই নয়াদিল্লির রাডার থেকে সরে যাচ্ছে। এবার তা আর হতে দেয়া যাবে না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরুপ মন্তব্য করে নিবন্ধে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে সেনা এবং বিডিআর তাদের পেশাগত ও করপোরেট মুল্যবোধ, সংস্কৃতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তান রেঞ্জার্সের মডেল বা অনুকরণে গড়ে তুলেছে, মুক্তিবাহিনীর প্রভাব এতে নেই। বিশেষ করে বেসামরিক রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা এবং ভারতের প্রতি বিতৃষ্ণা, যা প্রতিস্হাপন করেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে আসা বিশালসংখ্যক বাঙালি অফিসার। এখানে রয়েছে পাক সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য। এই বাঙালি অফিসারদের পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আবার বহাল করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে এ ধরনের বদান্যতা প্রদর্শন না করার জন্য তার পরামর্শদাতারা কিন্তু উপদেশ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য তা প্রাণঘাতী প্রতিপন্ন হয়। এটা হচ্ছে অন্যতম কারণ, যার জন্য শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্হানীয় নেতারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কখনোই উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেননি। এ হচ্ছে অনেকটাই পরলোকগত বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্পর্কের মতো। বেনজির ভুট্টো এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজত্ব করেছেন; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের শাসন করার সুযোগ দেয়া হয়নি। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়টি এ ধরনের নয়। বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির সঙ্গে সেনাবাহিনীর অনেকটাই সুসংবদ্ধ সম্পর্ক রয়েছে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদার মর্যাদা এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভুমিকা রেখেছে।
নিবন্ধে জেনারেল শঙ্কর রায় চৌধুরী বলেন, ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির সিপাহী বিদ্রোহের উত্তপ্ত বাতাস এখনো বাংলাদেশের পরিমন্ডলে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। বোধশক্তিকে প্রথমেই যা আঘাত করে তা হলো, অনুভুতিবর্জিত বিষম বর্বরতা নিয়ে রাইফেলধারী বিডিআর জওয়ানরা তাদের অফিসারদের নিধন করেছে আর কিছু ক্ষেত্রে একই সঙ্গে হত্যা করেছে অফিসারদের পরিবারবর্গকেও। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে, মনে করিয়ে দেয় একইভাবে খুন করা হয়েছিল পুর্ব পাকিস্তানি সেনা অফিসার ও তাদের পরিবার-পরিজনকে। হয়তোবা সেই ইউনিটগুলোর কিছু সদস্য এতে জড়িত ছিল।
অতি অবশ্য খুবই মন্দ কিছু ঘটেছিল, যার ফলে ইউনিফর্মধারী সেনারা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই ‘মন্দ কিছু’ কি এমন হতে পারে? হয়তো এর পেছনে ছিল এক ধরনের চরম মতবাদ কিংবা বিশ্বাসে বিদ্রোহীদের দীক্ষা প্রদান, সম্ভবত তার মধ্যে ছিল ধর্মীয় এক প্রবণতা। আর এর মাধ্যমেই এমন এক উন্মত্ততা চাগিয়ে তোলা হয় যার তীব্র ভাবাবেগ ও গভীরতা বেতন, রেশন অথবা অন্য কোনো প্রশাসনিক সমস্যার মতো সাধারণ বিষয়ের অনেক ঊর্ধ্বে ছিল। এই বিদ্রোহের জন্য যে সময়কে বেছে নেয়া হয় তা থেকেও অবশ্যম্ভাবী সেই প্রশ্নটিই উঠে আসে, ঠিক এই সময়েই কেন? এই বিদ্রোহ আগেই কেন সংঘটিত হলো না, যখন ঢাকার রাজনৈতিক ব্যবস্হাপনা ভিন্ন প্রকৃতির ছিল? এ প্রশ্নও উঠতে পারে, এই বিদ্রোহ আরো কিছু দিন পর কেন হলো না, যার মধ্যে শেখ হাসিনা ওয়াজেদের আওয়ামী লীগ সরকার একটু গুছিয়ে ওঠার সময় পেত এবং ক্ষমতার বাগডোর আরো কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতো? সব লক্ষণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিডিআরের বিদ্রোহ ছিল সংগঠিত এবং পুর্ব-পরিকল্পিত এক অশুভ প্রচেষ্টা। আর এর উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা এবং তার সরকারকে ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত করে ভারসাম্যহীন করে তোলা। উদ্দেশ্য ছিল, এ সরকারকে তাদের শাসনকালের একেবারে প্রথম থেকেই চাপের মুখে রাখা। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, কারা এ কাজ করল? তাদের উদ্দেশ্য কি ছিল? আর এর মাধ্যমে কাদের লাভবান হওয়ার কথা? এর পেছনে কি কোনো বিদেশি হাত ছিল? আর যদি বিদেশি হাত থেকেও থাকে, তা ভারতীয় হওয়ার সম্ভাবনা নেহাতই ক্ষীণ। তাহলে এরা কারা?
পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরের সেই ভয়াবহ ৩৩ ঘণ্টার ঘটনাবলির কারণ অনুসন্ধান, ঘটনা পরম্পরা এবং দায় নির্ধারণের জন্য তিনটি সমান্তরাল তদন্তের ব্যবস্হা করা হয়েছে। প্রথমটি করছে বাংলাদেশ সরকার, দ্বিতীয়টির দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা পুলিশের সিআইডি আর তৃতীয় অনুসন্ধানটি করছে সেনাবাহিনী। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খানকে এই তিনটি অনুসন্ধানের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই তিন অনুসন্ধানেরই ফলাফল মার্চের শেষ নাগাদ জানা যাবে। অবশ্য এটা নির্ভর করবে প্রতিটি তদন্তের অগ্রগতি কিভাবে হচ্ছে তার ওপর।
শেখ হাসিনা ভারতের প্রতি বিশেষভাবে প্রসন্ন বলে পরিচিত। আর ঠিক এ বিষয়টিই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক মহল, আইন প্রণেতা ও বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং সেই সঙ্গে বিশেষভাবে সেনা ও গোয়েন্দা বিভাগের উঁচুতলার কর্মকর্তাদের কাছে অভিসম্পাতমুলক। আর পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রায়ই বন্দুকের নল থেকে উৎসারিত হয়ে থাকে। ঘটনাবলি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে ভারতের অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। কারণ বিডিআর বিদ্রোহের ফলে উদ্ভুত পরিস্হিতিতে অস্হিরতার ইঙ্গিত রয়েছে। এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল পুর্ববর্তী সময়েও। যেমন ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কালে এবং অবশ্যই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের সময়।
No comments:
Post a Comment