Wednesday, February 4, 2009

পুকুর নয় সাগরচুরি


মুসতাক আহমদ
চার লাখের মধ্যে দেড় লাখ রিম কাগজেরই হদিস নেই। ওই কাগজে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির ৫২টি বইয়ের ১ কোটি ৮৪ লাখ কপি ছাপানোর কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, কিছু প্রকাশক সরকারের দেয়া কাগজে বই না ছেপে তা কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। যে কারণে সরকারের দেয়া কাগজে ছাপা হয়ে একদিকে যেমন বাজারে বই আসেনি এবং নিউজপ্রিন্ট কাগজে বই ছাপিয়ে বাজার ভরে দেয়া হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে বইয়ের হাহাকার লেগেই আছে। এর ফলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বই কিনতে হচ্ছে। সমস্যার এখানেই শেষ নয়, একদিকে কাগজ চুরি হয়েছে, অন্যদিকে সংকট সামনে রেখে একশ্রেণীর প্রকাশক বই গুদামজাত করে সংকটকে আরও চাঙ্গা করেছেন। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই দুই ধরনের প্রকাশকের তালিকাই এখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের হাতে রয়েছে। কাগজ চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করতেই তারা ৭ তারিখের মধ্যে আড়াই কোটি বই বুঝিয়ে দেয়ার জন্য প্রকাশকদের সময় দিয়েছেন। তারা আরেকটু নিশ্চিত হতে চান। সূত্রটি জানায়, র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ওই তালিকা ইতিমধ্যে তুলে দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বই মজুদ করা হয়েছে না ছাপা হয়নি, তা বের করার জন্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করবে। আর চুক্তি অনুযায়ী ২ কোটি ৬০ লাখ বইয়ের সব কপি ৭ ফেব্র“য়ারির মধ্যে বাজারে আসতে হবে। প্রকাশকদের সে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তবে মন্ত্রীর এই আদেশ বা সরকারি সিদ্ধান্তে বিচলিত নন প্রকাশকরা। মঙ্গলবার বিকালে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রকাশক ও মুদ্রকররা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, প্রথম কিস্তির সব বই ও দ্বিতীয় কিস্তির বেশিরভাগ বই এনসিটিবিকে দিয়েছেন। আর ঔদ্ধত্য দেখিয়ে মুদ্রণ শিল্প সমিতির একজন বলেছেন, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি কালো তালিকাভুক্ত করা এবং ভবিষ্যতে কাজ না দেয়া। দিনপ্রতি ২০০ টাকা করে জরিমানা করা। এর বেশি আইন অনুযায়ী করতে পারবে না এনসিটিবি।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. সিরাজুল হক মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে জানান, বই ছাপার জন্য সরকার এবার যে কাগজ দিয়েছে ভর্তুকিসহ তার মোট দাম প্রায় ৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের ভর্তুকি রয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। তিনি বলেন, প্রথম কিস্তির বই তাদের বুঝিয়ে দেয়ার পরও গুদামজাত করে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া নিউজপ্রিন্টে বই ছেপে তা বাজারে দেয়া হয়েছে। অধ্যাপক হক বলেন, সিন্ডিকেট তারা আবিষ্কার করেছেন। এর মূল্যোৎপাটন করে ছাড়বেন।
সরকারের সঙ্গে প্রকাশকদের চুক্তি অনুযায়ী ২১ জানুয়ারির মধ্যে সব বই বাজারে আসবে। কিন্তু আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে তা ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তীর্ণ করা হয়। এনসিটিবির ব্যবস্থা অনুযায়ী মাধ্যমিকের মোট ৭৬টি বইয়ের মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ ১৪টি বই প্রথম কিস্তিতে ৯৪ লাখ, দ্বিতীয় কিস্তিতে ৩৮টি বইয়ের ৯০ লাখ এবং তৃতীয় কিস্তিতে ২৪টি বইয়ের ৭৬ লাখ কপি বাজারে ছাড়ার কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির বেশি চাহিদার বইয়ের সংকট বাজারে ব্যাপক। এগুলোই নিউজপ্রিন্টে প্রকাশ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিউজপ্রিন্টে বই ছাপা হলে কাগজ গেল কোথায়। নামপ্রকাশ না করে একজন প্রকাশকই বলেছেন, তাদের একজন নেতা এনসিটিবিতে বলেছে, নিউজপ্রিন্টে বই ছাপার অনুমতি পেলে ১০ দিনে বাজার স্বাভাবিক করে দেবেন। আর সাদা কাগজে ছাপতে চাইলে দু’মাসেও হবে না। যদি তাই হয়, তবে সাদা কাগজ গেল কোথায় আর নিউজপ্রিন্টে বই ছাপানো রয়েছে কিনা। গত ২৮ জানুয়ারি এনসিটিবির সভায় আরেকজন প্রকাশক প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি নিজে কমপক্ষে দুটো গোডাউন দেখাতে পারবেন যারা বই মজুদ করে রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাগজ দিয়ে থাকে সরকার। কর্ণফুলীর যেই সাদা কাগজের বাজারে দাম ১৩শ’ টাকা রিম, এনসিটিবি ভর্তুকি দিয়ে তা সাড়ে ৬শ’ টাকায় দিয়ে থাকে। ফলে বই না ছেপে কাগজ বিক্রি করে দিলেই বিনিয়োগের শতভাগ লাভ আসে। আর এই অপকর্মটিই করেছে কিছু প্রকাশক। এনসিটিবি সূত্র জানায়, এরকম ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে তারা চিহ্নিত করেছেন। প্রকাশকদের অপকর্মের এখানেই শেষ নয়, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিউজপ্রিন্টে বই ছেপেছে তারা। ফলে একদিকে যেমন সংকট তীব্রতর হয়েছে, অন্যদিকে নিুমানের নিউজপ্রিন্টে ছাপানো বইয়ে ভরে গেছে বাজার। নকল বইও রয়েছে বাজারে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও এনসিটিবির রিপোর্টে বিষয়টি ধরা পড়েছে। সূত্র জানায়, এনসিটিবি থেকে শিক্ষামন্ত্রীকে ৪ পৃষ্ঠার যে রিপোর্ট দেয়া হয়েছে, তার ‘জ’ কলামে বাড়তি দামে বই বিক্রি, খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের কমিশন না দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বই ছেপেও গুদামজাত করে রাখা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে জোরপূর্বক নোট-গাইড কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
প্রকাশকদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর বৈঠক
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মঙ্গলবার বিকালে প্রকাশক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সূত্র জানায়, সংকট কাটাতে প্রকাশকরা যথারীতি রয়্যালটি ছাড়া নিউজপ্রিন্টে বই ছাপানোর অনুমতি চান। তাদের বক্তব্য শোনার পর মন্ত্রী বাজারে বই সংকটসহ অন্যান্য দিকে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন, তৃতীয় কিস্তির বই ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেয়া হয়নি। ৭ ফেব্র“য়ারির মধ্যে সব বই বাজারে চাই।
সভায় শিক্ষা সচিব সৈয়দ আতাউর রহমান, অতিরিক্ত সচিব মোঃ মোজাম্মেল হক খান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর মছির উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ, র‌্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মোঃ আব্দুল মজিদ, র‌্যাব-১০ এর পরিচালক এসএম কামাল হোসেন, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মোঃ আবু তাহের, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান মোঃ রব্বানী জব্বার, সাধারণ সম্পাদক কাজি আব্দুল ওদুদ, বাংলাদেশ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিপণন সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান, উপদেষ্টা শহীদ সেরনিয়াবাত, কামরুল ইসলাম শায়ক, মোঃ হুমায়ুন কবির, মোঃ নজরুল ইসলাম (কাজল), আ. ফ. ম শাহ আলি, তওফিকুর রহমান সিদ্দিকী, মোঃ সফি-উদ-দীন, বিক্রেতা প্রতিনিধি আলী আকবর খান খোকন, আক্তার হোসেন (লাবলু) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানো, বাঁধানো, সরবরাহ, মজুদ, বিক্রয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করা হয়। মন্ত্রী বলেন, কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। প্রথম কিস্তি ও দ্বিতীয় কিস্তির বই চুক্তি মোতাবেক ছাপানো হয়েছে কিনা, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ করা হয়েছে কিনা ইত্যাদি খতিয়ে দেখার জন্য তিনি আইন-শৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করেন। তৃতীয় কিস্তির ২৪টি বইয়ের ৭৬ লাখ কপি ৭ ফেব্র“য়ারি মধ্যে বাজারজাত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা মন্ত্রীকে প্রতিশ্র“তি দেন। প্রতিশ্রতি ভঙ্গ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর ব্রিফিং
পরে মন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পাঠ্যবই নিয়ে উদ্ভূত সব সমস্যা সম্পর্কে বলেন, সরকার উদ্বিগ্ন। চূড়ান্ত সমাধানের জন্য তারা প্রকাশকদের সঙ্গে বসেছিলেন। তিনি বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির বইয়ের সংকট, নিউজপ্রিন্টে বই ছেপে বাজারে ছাড়াসহ অন্যান্য বিষয়ে খোঁজ নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে ‘টাস্কফোর্স গঠন’ করা হবে। এছাড়া দায়ীদের ধরার জন্য আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে। তারা ব্যবস্থা নেবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তারা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বই ছাপাসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন হয়। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফা বই সংকট থাকলেও তৃতীয় দফা বই ৭ ফেব্র“য়ারির মধ্যে বাজারজাত করা হবে। এর মধ্যে ছাপানোর কাজ শেষ করে বাজারজাত করার জন্য প্রকাশক এবং পরিবেশকরা প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৃতীয় দফা বই বাজারে আসার পর প্রথম ও দ্বিতীয় দফা বই সংকটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। গোয়েন্দা সংস্থাকে এজন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জড়িতরা যেখানেই থাকুক, আর যেই কালোবাজারি বা মজুদ করুক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাঠ্যপুস্তক বাজারজাত মনিটরিং কমিটির রিপোর্ট সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। উল্লেখ্য, ৯৬টি বইয়ের ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার ৭০ কপি বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১৪টি বইয়ের ৯৪ লাখ কপি ৬ জানুয়ারি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৮টি বইয়ের ৯০ লাখ ২০ জানুয়ারি এবং তৃতীয় পর্যায়ে ২৪টি বইয়ের ৭৬ লাখ ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বাজারজাত করার কথা ছিল। কিন্তু বাজারে বইয়ের চরম সংকট রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ৫০ ভাগেরও বেশি বই ছাপা ও বাজারজাত করা হয়নি।

No comments: