Wednesday, June 24, 2009

Oriana Fallaci

উপন্যাস এবং স্মৃতিকথা লিখলেও ইতালিয়ান লেখিকা ওরিয়ানা ফাল্লাচি আপসহীন রাজনৈতিক সাক্ষাতকার গ্রহণকারী হিসেবেই সবচেয়ে পরিচিত। তিনি ১৯২৯ সালের ২৯ জুন ইতালির ফোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ফ্যাসিবাদ বিরোধী একজন সক্রিয় কর্মী। দীর্ঘ পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তিনি অত্যন্ত সফল। সাংবাদিক হিসেবে ওরিয়ানা আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত রাজনৈতিক ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বের সাক্ষাতকার নিয়েছেন। তাদের মাঝে হেনরি কিসিঞ্জার, ইরানের শাহ, আয়াতুল্লাহ খোমিনি, উইলি ব্রান্ডিট, জুলফিকার আলী ভুট্টো, ওল্টার ক্রনকিট, ওমর খাদাফি, ফেডরিকো ফেলিনি, ইয়াসির আরাফাত, ইন্দিরা গান্ধী, শন কনারি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। অবসর গ্রহণের পর তিনি ইসলাম এবং আরব প্রশ্নে সহিংসতা ও অন্যান্য রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে লেখালেখি করেন। ফলে অচিরেই ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওরিয়ানা ফাল্লাচি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গণতান্ত্রিক স্বশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী 'গুইয়াসতিজিয়া ই লিবার্তা'য় যোগ দেন। তার পিতা এদোয়ার্দো ফাল্লাচি ছিলেন একজন কাঠশিল্পী ও সক্রিয় রাজনৈতিককর্মী। ইতালির ফ্যাসিস্ট বেনিটো মুসোলিনি'র বিরুদ্ধে তারা সংগ্রাম করছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছেন। তবে এর জন্যে এদোয়ার্দো ফাল্লাচিকে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। মুসোলিনির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ওরিয়ানার পিতা এদোয়ার্দো একবার ধরা পড়েন। অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় তার ওপর। ওরিয়ানার মা তোসকা ফাল্লাচি ছিলেন অসম্ভব সাহসী এক নারী। ওরিয়ানা ফাল্লাচির কথায় জানা যায়, তার পিতাকে যে কক্ষে নির্যাতন চালানো হচ্ছিল তার মা সেই কক্ষ খুঁজে বের করে সেখানো কোনো পরোয়া না করেই ঢুকে যান। সেই কক্ষে আরো দু'জনের সাথে তার পিতাও ছিলেন। সেখানকার দায়িত্বে থাকা মেজরের কাছে গিয়ে এদোয়ার্দোকে ছেড়ে দেয়ার কথা বল্লে, মেজর জানান, আগামীকাল সকাল ছ'টায় বন্দিদের মেরে ফেলা হবে, তাই কাল যেন তোসকা ফাল্লাচি কালো পোশাক পড়ে। তোসকা জবাবে বলেছিলেন, 'শুনুন মেজর, আপনার কথা অনুযায়ী আমি কাল আসবো, কালো পোশাকও পড়বো। তবে আপনিও জেনে রাখুন, কোনো মাতৃগর্ভে আপনার জন্ম হয়ে থাকলে তাকেও বলবেন কালো পোশাক পড়তে, আপনার সময়ও শেষ হয়ে আসছে।' অবশ্য তার পিতাকে শেষ পর্যন্ত মেরে ফেলা হয়নি। বিপ্লবী পিতা আর সাহসী মায়ের সন্তান ওরিয়ানা ফাল্লাচি ততদিনে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নির্মমতা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে ফেলেছেন। ১৯৫০ সালে 'এল মাতিনো দেল ইতালিয়া সেন্ট্রাল' পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে অল্প বয়সেই ওরিয়ানা ফাল্লাচি তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ভিয়েতনাম, ইন্দো-পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন যুদ্ধে বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। রাজনৈতিক ম্যাগাজিন 'এল ইউরোপীয়' তে দীর্ঘদিন বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বহু খ্যাতনামা সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনে লেখালেখি করেছেন। ১৯৬৮ সালে মেক্সিকান স্বশস্ত্র গোষ্ঠী ওরিয়ানার ওপর তিনবার বন্দুক হামলা চালায়। প্রতিবারই তিনি অল্পের জন্যে প্রাণে রক্ষা পান। ১৯৭৩ সালে সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস'র প্রেমে পড়েন তিনি। ১৯৬৭ সালের গ্রিক একনায়কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস। ১৯৭২ সালে ওরিয়ানা ফাল্লাচিকে দেয়া সাক্ষা'কারে হেনরি কিসিঞ্জার, 'ভিয়েতনাম যুদ্ধ'কে অপ্রয়োজনীয় বলে স্বীকার করে নেন। কিসিঞ্জার পরবর্তীতে এই সাক্ষাতকার সম্পর্কে লিখেছেন, 'প্রেসের সঙ্গে জড়িত কারো সঙ্গেই ইতোপূর্বে আমি এতো ভয়ঙ্কর কোনো আলোচনা করিনি।' 'লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস' এ ওরিয়ানাকে চিত্রিত করা হয়েছে এভাবে, 'কোনো বিশ্ব ব্যক্তিত্বের পক্ষেই যে সাংবাদিককে 'না' বলা সম্ভব নয়।' নিজের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল, 'আমি কখনোই নিজেকে শান্ত একটি রেকর্ডারের মতো বিবেচনা করি না, যে শুধু যা দেখে এবং শোনে সাফল্যের সঙ্গে তাই ধারণ করে রাখে। 'ওরিয়ানা ফাল্লাচির এই বক্তব্যের মধ্যে তার নিজস্ব দর্শনের কিছুটা ছাপ পাওয়া যায়। অর্থাত সবকিছুর পরও নিজের অভিমত বা সিদ্ধান্তকে তিনি মর্যাদা দিতে আগ্রহী। ওরিয়ানা তাঁর নেয়া সাক্ষাতকার সম্পর্কে বলেছেন, 'প্রতিটি সাক্ষা'কারই আমার নিজের আঁকা ছবি।' বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি যদি চিত্রকর হতাম এবং তখন তোমার ছবি আঁকতাম, তবে সে সময় আমি যেভাবে তোমাকে আঁকতে চাইতাম সেভাবে আঁকার অধিকার কি আমার থাকতো না?'

ওরিয়ানা ফাল্লাচির নিজের বিবৃতিতে জানা যায়, মাত্র ৯ বছর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেছেন। অল্প বয়সেই তার মাঝে নিজস্ব অভিব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রকৃতার্থে ১৬ বছর বয়স থেকেই লেখার প্রতি মনোযোগী হন, যখন কিনা তিনি একজন রিপোর্টার হিসেবে ফোরেন্সে কাজ শুরু করেন। সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি লেখক হতে চেয়েছিলেন। জীবনের সবচে' উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতি বা অবস্থা কী? এ বিষয়ে ওরিয়ানা জীবনের সবকিছুকে উল্লেখ করলেও কিছু কিছু বিষয়ে তার পক্ষপাত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'প্রথমত সবকিছু। প্রকৃতপক্ষে একটি উদার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত পরিবারে আমার জন্ম। সেই পরিবেশে শৈশব কাটানো, ইতালির প্রতিরোধের বীরত্বপূর্ণ দিনগুলো, যে প্রতিরোধে আমার বাবাও ছিলেন একজন সামনের সারির নেতা। ফোরেন্সের একজন নাগরিক হয়ে ওঠাও আনন্দের। এখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতি সবকিছুই।' ওরিয়ানা আরো বলেন, 'যখন তুমি একজন নারী, তখন তোমাকে অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হবে, তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি দেখতে হবে, ভাবতে হবে, সেই সঙ্গে অনেক বেশি সৃজনশীল হতে হবে। একই ভাবে যদি তুমি দরিদ্র হও, টিকে থাকাটাই অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।'

নিজের লেখালেখির প্রণোদনা সম্পর্কে জানান, 'অর্থপূর্ণ কোনো গল্প আমি শোনাতে চাই। অবশ্যই অর্থের জন্যে নয়। আমি কখনোই টাকার জন্যে লিখি না অর্থাত কোনো ফরমায়েসি বা কোনো প্রকাশকের সঙ্গে হৃদ্যতার সূত্রে আমি লিখি না।'

ওরিয়ানা ফাল্লাচির লেখার সবচে' প্রভাববিস্তারকারী বিষয় হচ্ছে, মহান আবেগ। তা মনোগত, রাজনৈতিক কিংবা জ্ঞানগর্ভ আবেগও হতে পারে। যেমন, ভিয়েতনামের ওপর লেখা তার 'নাথিং অ্যান্ড সো বি ইট' গ্রন্থ। এটি শুধুমাত্র ভিয়েতনামের ওপর লেখা কোনো গ্রন্থ নয়, এটা যুদ্ধভিত্তিক একটি গ্রন্থ। একটি অপ্রয়োজনীয়, নির্বোধ এবং নির্মম যুদ্ধই প্রতিভাত হয় 'নাথিং অ্যান্ড সো বি ইট' গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠার পরতে। 'লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন' বইটি জন্ম না নেয়া এক শিশুকে নিয়ে লেখা। এই বইয়ের জন্যেই তিনি সর্বপ্রথম সাহিত্যের আলোচনায় উঠে আসেন। বইটি 'হাত বাড়িয়ে দাও' শিরোনামে বাংলা ভাষায় ওরিয়ানা ফাল্লাচির একমাত্র অনূদিত উপন্যাস। 'এ ম্যান' গ্রন্থটি ওরিয়ানার প্রেমিক আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস কে নিয়ে লেখা। অবশ্য কেউ কেউ ওরিয়ানা ফাল্লাচির উপন্যাস বা লেখাগুলোর মূল প্রবণতায় মৃত্যুকে অধিকমাত্রায় সনাক্ত করেন। এই তিনটি বইয়ে মৃত্যু বিষয়টি বার বারই উঠে এসেছে। ওরিয়ানা বলেন, 'আমি মৃত্যুকে ঘৃণা করি। আমার যুদ্ধ মৃত্যুর বিরুদ্ধে। সবকিছুর মধ্যে মুক্তিই একমাত্র লক্ষ্য। লেখার জন্যে আমাকে সত্যিই যদি কিছু তাড়িত করে থাকে তবে সে হচ্ছে মৃত্যুর আচ্ছন্নতা।' অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারতেন তিনি। এ বিষয়ে তার নিজের বক্তব্য, 'খুব সকালেই আমি কাজ শুরু করি। ৮ থেকে ৮.৩০'র মধ্যে। কোনো বিরতি ছাড়া একটানা তা চলে সন্ধ্যা ৬ থেকে ৭ টা পর্যন্ত। তার মানে দাঁড়াচ্ছে কোনো বিশ্রাম এবং খাদ্যগ্রহণ ছাড়াই এ সময়টা আমি কাজ করি। আমি অনেক বেশি সিগারেট খাই। প্রতিদিন ৫০'র কাছাকাছি সিগারেট আমার প্রয়োজন হয়। রাতে খুব বাজেভাবে ঘুমাই। কাউকে দেখিনা। টেলিফোনের কোনো উত্তর দেই না, কোথাও যাই না। আমি রোববার, যে কোনো ছুটির দিন, ক্রিসমাস এবং নববর্ষ অপছন্দ করি। যদি আমি বেশি উতপাদন না করতে পারি তবে আমার পাগল পাগল অনুভূতি হয়, খুব অসুখী আর অতৃপ্তি বোধ করি। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। যা হোক, লেখক হিসেবে আমি খুব স্লথ। নিশ্চিত ভাবেই আমি এক লেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বার বার পরিমার্জন করি। তাই দিন দিন আমি অসুস্থ আর কুতসিত হয়ে যাচ্ছি,আমার ওজন কমে যাচ্ছে, শীর্ণ হয়ে পড়ছি।' সমসাময়িক সাহিত্যবোধ, রুচি সম্পর্কে ওরিয়ানা ভালোভাবেই জানতেন। এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, 'সমৃদ্ধ, ভীষণ সমৃদ্ধ কিছু লিখতে চাই। কতটুকু বাস্তবতায় এই সমৃদ্ধি আসে, কে জানে? একমাত্র সময়ই তা নির্ধারণ করে দিতে পারে। যাচাইয়ের জন্যে একজন লেখকের সময় প্রয়োজন, নিজের মূল্যায়নের জন্যে সময় প্রয়োজন। জীবনের সফলতা বলে কিছু নেই। সাফল্য আপামর মানুষের কাছে একটি ফ্যাশন কিংবা তেমন কিছু। মৃত্যুর পরও একজন লেখক লেখকই থাকে। আর তাই মৃত্যুর বহু বহু বছর পরেও তার গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। একজন লেখক তখনই লেখক যখন তার কাজ সামনে এগিয়ে যায়, সকল সীমাবদ্ধতা, ভাষার গণ্ডি ছাড়িয়ে সবার হয়ে উঠলে তবেই লেখকের স্বার্থকতা। লেখক অবশ্যই বৈশ্বিক। স্থান এবং কালের ঊর্ধ্বে হবে তার দৃষ্টি।'

'লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন' এ ওরিয়ানা ফাল্লাচি আপাত বাস্তবতার আবহে একজন নারী গর্ভের সন্তানের কথা বলার বিষয়টিকে সংলাপাত্মক এবং বর্ণনার ঢঙে টেনে নিয়ে গেছেন। বইটিতে গর্ভবতী একজন মাতা তার আসন্ন সন্তানের সঙ্গে কথা বলেন। প্রকৃত অর্থে মা নিজে নিজেই কথা বলেন। কিন্তু এই সন্তান সামাজিক স্বীকৃতি পাবে না কেননা সন্তানের পিতার সঙ্গে মাতার সামাজিকভাবে স্বীকৃত কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের বিয়ে হয়নি। অবশেষে অনাগত সন্তান অনাগতই রয়ে যায়, পৃথিবীর আলো দেখে না, মাতার গর্ভেই তার মৃত্যু হয়। ফাল্লাচি'র নিজের জীবনের তিনমাসের অন্তঃস্বত্তার অভিজ্ঞতার আলোকেই এই উপন্যাসের কাঠামো নির্মিত হয়েছে। মারিয়া অ্যালেনা রেমন্ড'র লেখা 'ফেমিনিস্ট রাইটার্স' এ 'লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন'র প্রসঙ্গে ওরিয়ানাকে গর্ভধারণ, অ্যাবরশন এবং আবেগি নির্যাতন বিষয়ে নিখুঁত নারীবাদী লেখক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

'এ ম্যান' গ্রন্থে ওরিয়ানা ফাল্লাচি গ্রিক কবি ও প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতা আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস'র সঙ্গে প্রেমের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। যদিও তিনি এই গ্রন্থকে উপন্যাস হিসেবে দাবি করেছেন তথাপি 'এ ম্যান' প্রকৃতার্থে গ্রিসের মুক্তির লক্ষ্যে আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস'র প্রতিরোধ যুদ্ধের সত্য কাহিনীই উঠে এসেছে, যে যুদ্ধ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস চালিয়ে গেছেন। ১৯৬৭ সালে আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস গ্রিক একনায়ক সাবেক কর্নেল জর্জিয়োস পাপাডোপোউলাসকে হত্যার চেষ্টা চালান। যে রাস্তা দিয়ে পাপাডোপোউলাস প্রতিদিন যাতায়াত করতেন সেই রাস্তায় বোমা হামলা চালিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই হত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং প্যানাগোউলিস ধরা পড়েন। তাকে কারাবন্দি করে পরবর্তী ৫ বছর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। বিপ্লবের গতি এবং লক্ষ্য নষ্ট করে দেয়ার উদ্দেশ্যেই দ্বিমাত্রিক নির্যাতন বেছে নেয়া হয়। কিন্তু এই বর্বর নির্যাতনের পরও বিপ্লবের পথ থেকে বিচ্যুত হতে অস্বীকৃতি জানান প্যানাগোউলিস। ফলে তাকে অন্ধকার ছোট্ট নির্জন কক্ষে আটক রাখা হয়। ১৯৭৩ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তির আগ পর্যন্ত প্যানাগোউলিস সেই নির্জন কক্ষেই বন্দি ছিলেন। বন্দিদশা থেকে মুক্তির দু'দিন পরই ওরিয়ানা ফাল্লাচি আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস'র সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। কিন্তু এই সাক্ষাতকারের মাধ্যমেই দু'জন দু'জনের ওপর আস্থা স্থাপণ করতে সক্ষম হন, কয়েক সপ্তাহের মাঝেই তার পরস্পরের ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে যান। পরবর্তী তিন বছর ওরিয়ানা এবং প্যানাগোউলিস একত্রে স্বপ্নের মতো দিনগুলো অতিবাহিত করেন। প্যানাগোউলিস বলতেন, 'আমি শুধুমাত্র সুখী হওয়ার জন্যে কোনো নারীকে চাই না। পৃথিবীতে অসংখ্য নারী, তুমি তাদের মতো করে সুখী হতে পার। আমি একজন সহচর চাই যে হবে আমার কমরেড, বন্ধু, শুভাকাঙ্খী, ভাই। আমি যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করা একজন মানুষ। আমি সবসময় তাই থাকবো। 'প্যানাগোউলিস'র জীবনে ওরিয়ানা সব সময় তাই হয়ে ছিলেন। তার জীবনের সকল স্বাধীনতা প্যানাগোউলিস'র কাছেই অর্পন করেছিলেন। কিন্তু পাগলাটে এই বিশাল মানুষটির সঙ্গে থাকা ভীষণ কঠিন এক বিষয় ছিল। অথচ ভবিষ্যতহীন একটি জীবন ওরিয়ানা শুধুমাত্র প্রেমের কারণেই বেছে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক শত্রুদের হাতে প্যানাগোউলিস ১৯৭৬ সালের ১ মে নিহত হন। যদিও আপাতভাবে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার আবরণ ছিল, কিন্তু আসলে তা ছিল গুপ্ত হত্যা। ১৯৭৯ সালে আলেক্সজান্ডার প্যানাগোউলিস কে নিয়ে 'এ ম্যান' গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, যাকে ওরিয়ানা নিজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ওরিয়ানার ফাল্লাচি 'ইনশাল্লাহ' উপন্যাসটি লিখেছেন ১৯৮৩ সালে ইতালিয়ান বাহিনীর লেবাননে অবস্থানের প্রেক্ষিতে। লেবাননে আমেরিকা এবং ফ্রান্সের শান্তিরক্ষী বাহিনী আত্মঘাতী ট্রাকবোমা হামলাকারীদের লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইতালিয়ান বাহিনী সব সময়েই এই ভয়ে ছিল যে তৃতীয় লক্ষ্য হয়তো তারাই। 'লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস' এ রিভিউ লিখতে গিয়ে লেখক ক্রিস্টোফার ডিকে এই উপন্যাসকে 'তৈরি হয়ে থাকা কাসিক ট্রাজেডি' আখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, 'ইনশাল্লাহ' অবশ্যই ওরিয়ানা ফাল্লাচির মেধার একটি চিহ্ন। ২০০১ সালে 'দ্য রেজ অ্যান্ড দ্য প্রাইড' এবং ২০০৪ সালে 'দ্য ফোর্স অব রিজন' নামে ওরিয়ান ফাল্লাচি'র দু'টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বই দু'টিতে ইসলাম এবং জেহাদের সমালোচনা স্থান পেয়েছে বিস্তৃত পরিসরে। ফলে বই দু'টি ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। অভিযোগ করা হয়েছে, বই দু'টিতে ইসলামকে হেয় করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে? এই গ্রন্থ দু'টি লেখার নেপথ্য কারণই বা কী। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

৭০'র দশকে ওরিয়ানা ফাল্লাচির নেয়া কয়েকজন বিশ্ব নেতার সাক্ষাতকারের কিছু কিছু বিষয়ে আলোকপাত করলে এ ব্যাপারে একটি ভাবনা-চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব।

গোল্ডা মেয়ার : আমার মনে হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ অনেক অনেক বছর ধরে চলবে, কেননা জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া আরব নেতারা অভিন্ন, কেননা মানুষের জীবনের মূল্য তাদের কাছে বেশি কিছু নয়, কেননা আরবের জনগণেরা প্রতিবাদ জানাতে অক্ষম, কেননা তারা বলতে পারছে না 'যথেষ্ঠ হয়েছে'।

ইয়াসির আরাফাত: 'না! আমরা শান্তি চাই না। আমরা যুদ্ধ চাই, চাই বিজয়। আমাদের কাছে শান্তি মানে হচ্ছে ইসরাইয়েলের ধ্বংস এর বাইরে আর কিছুই না।'

জুলফিকার আলী ভুট্টো: 'মুসলমান এবং হিন্দুরা পরস্পরের ভাই নয়। আমাদের মাঝে কখনোই সুসম্পর্ক ছিল না, কখনো হবে না।'

ওরিয়ানা ফাল্লাচি 'দ্য ফোর্স অব রিজন' গ্রন্থ প্রকাশের প্রায় বছর খানেক আগে এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তিনি জানান, 'দ্য পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন'র মার্কসবাদী নেতা জর্জ হাবাসই এসব প্রশ্নের উত্তর ১৯৭২ সালে দিয়েছেন। জর্জ হাবাস বলেন, 'আমাদের এই বিপ্লব বিশ্ব বিপ্লবেরই একটা অংশ। এটাকে শুধু প্যালেস্টাইনের স্বাধিকার অর্জনের লড়াই বিবেচনা করা ঠিক হবে না।' মার্কসবাদী কোনো আদর্শের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ না করেই হাবাস জানান, 'প্যালেস্টানিয়ানরা আরব জাতির একটি অংশ। সমগ্র আরব জাতি অবশ্যই একদিন ইউরোপ এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবে। পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে হবে সেই যুদ্ধ। সেটা চলবে। আমেরিকা এবং ইউরোপ জানে না, আমরা আরবরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। আমাদের সুবিধাজনক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করছি। শান্তি পশ্চিমাদের জন্যে নয়। দশকের পর দশক ধরে একটু একটু করে এগোচ্ছি। এটাই আমাদের কৌশল যার মাধ্যমে আমরা সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মা-েই ছড়িয়ে পড়বো।'

'দ্য ফোর্স অব রিজন' নির্মাণের পশ্চাতে ৭০'র দশকে আরব নেতাদের বক্তব্য কিছুটা প্রভাব রেখেছে। গোল্ডা মেয়ারের দেয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ফাল্লাচির প্রশ্ন এবং উত্তর খুঁজে নেয়া, 'জীবনের মূল্যহীনতার কারণ কী? কেননা ইসলামের বিধান অনুযায়ী যে ব্যক্তি আল্লাহ'র পথে হত্যা করবে কিংবা নিহত হবে তার জন্যে বেহেশতের অফুরন্ত সুখের জীবন অপেক্ষা করছে। কেন ইয়াসির আরাফাত আলোচনা কিংবা সমঝোতার ব্যাপারে সকল সম্ভাবনাকে বাতিল করে দিয়ে প্রকাশ্যে ইসরাইলের ধ্বংস কামনা করেছেন? কেননা ইসলামি আদর্শ বিবেচনা করে অমুসলিম এবং অবিশ্বাসীরা সেই স্থানে শাসন চালাতে পারবে না যে স্থান একসময় মুসলিমরা শাসন করতো। কেন জুলফিকার আলী ভুট্টো হিন্দু-মুসলিমদের একত্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে অসম্ভব আখ্যা দিয়েছেন? তার সেই কথার উত্তর ইসরাইল এবং আরবদের সম্পর্কে দেয়া ইয়াসির আরাফাতের বিবৃতির মাঝেই লুকিয়ে আছে। কেননা জিহাদের আদর্শে মুসলিম এবং অমুসলিমদের একত্রে শান্তিপূর্ণভাবে সমঅধিকার নিয়ে বসবাসের কোনো স্থান নেই।'

ওরিয়ানা ফাল্লাচি বলেন, 'আজকের বিশ্বে জেহাদিদের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থানকে সমর্থন করা হয়তো এক ধরনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের মতো ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক হামলার পরও কি তা অপরিবর্তিতই থাকবে?' তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'এ কোন ধরনের গণতন্ত্র যে গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই, পরিবর্তে শাস্তি নির্ধারিত হয়, অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়? এ কোন ধরনের গণতন্ত্র যে গণতন্ত্রে শিশুদের কণ্ঠ শোনার বদলে নিরব করে দেয়া হয়, নির্যাতন এবং পীড়ন করার জন্যে শত্রুর হাতে তুলে দেয়া হয়? এ কোন ধরনের গণতন্ত্র যে গণতন্ত্রে মোল্লাতন্ত্রকে সমর্থন করা হয়, মুক্তমনের ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হয়, খুঁটিতে বেঁধে অগ্নিদগ্ধ করা হয়? এ কোন ধরনের গণতন্ত্র যে গণতন্ত্রে সংখ্যালঘু গণণা করা হয়, এটা কি অন্যায় নয়, ভয় দেখানোর কৌশল নয়?!? আমার কাছে এসবই অগণতান্ত্রিকতা, প্রতারণা, মিথ্যা। এ কোন ধরনের স্বাধীনতা যে স্বাধীনতা আমাদের চিন্তা প্রতিরোধ করে, বাধা দেয়, আমাদের কণ্ঠরোধ করে, যে স্বাধীনতা বিরুদ্ধ মতামত দলিত করে, প্রতিবাদ সহ্য করে না? এ কোন ধরনের স্বাধীনতা যে স্বাধীনতা আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা, কামানের গোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার দেয় না? এ কোন ধরনের স্বাধীনতা যে স্বাধীনতায় নাগরিক সর্বদা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবার ভয়ে উদ্বিগ্ন থাকে? এ কোন ধরনের স্বাধীনতা যে স্বাধীনতায় মুক্তচিন্তা প্রকাশে সব সময় কর্তিত হওয়ার অনুভূতি থাকে, নির্ধারণ করে দেয় আমি কাকে ভালোবাসব এবং কাকে নিশ্চিতরূপে দেব ঘৃণার পাত্র, আর তাই যদি আমি আমেরিকাকে ঘৃণা করি তবে আমার জন্যে বেহেশতের দরোজা খোলা, যদি মুসলিমদের ঘৃণা করি তরে নিশ্চিত দোজখ আমার ভবিতব্য? এটা স্বাধীনতা নয় উপহাস, মনে করি ঠাট্টা।'
লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে ইতিবাচক সমালোচনার পাশাপাশি বিরূপ সমালোচনাও জুটেছে ওরিয়ানা ফাল্লাচির কপালে। অতিমাত্রায় বর্ণনা এবং সুবিস্তৃত প্লট ধরে লেখার কারণে পাঠক সব সময় ওরিয়ানার ভুল ত্রুটিগুলো এড়িয়ে যান এমন অভিযোগও তাঁর লেখার বিরুদ্ধে রয়েছে। তবে জটিল কিংবা বিরূপ সমালোচনা ওরিয়ানাকে মোটেও ভারাক্রান্ত করতো না। অন্তত নিজের জবানিতে দেয়া বক্তব্যে এই বিশ্বাসই জাগে। ওরিয়ানা ফাল্লাচি বলেন, 'আমি সমালোচকদের মোটেও সম্মান করি না। তারা প্রায় প্রত্যেকেই একজন ব্যর্থ লেখক, সচরাচর লেখকদের প্রতি তারা এক ধরনের ঈর্ষা বোধ করেন, আমি জানি তারা একটি বিরক্তিকর কাজের সঙ্গে যুক্ত কেননা এটা খুব অনৈতিক এবং নির্বোধের কাজ যে, একটি ছোট্ট রচনার মধ্যে একটি গ্রন্থের বিচার-বিশ্লেষণ তুলে ধরা। হয়তো যে গ্রন্থের সমালোচনা করা হচ্ছে সেটি কয়েকবছর পরিশ্রম করে নির্মাণ করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি প্রকৃত সমালোচনাকারী হচ্ছেন পাঠক। আমি আমার পাঠকদের চিঠি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করি। সারা বিশ্ব থেকেই আমি আমার পাঠকদের চিঠি পাই এবং তারা সবসময়ই তথাকথিক সমালোচকদের থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে থাকেন। এ প্রসঙ্গে ওরিয়ানা ফাল্লাচি কয়েকটি উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, একটি চিঠি এসেছিল ফোরেন্সের ৪০ বছর বয়স্ক এক দরিদ্র শ্রমিকের কাছ থেকে। তিনি লিখেছেন, 'আমি আপনার লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন বইটি তিনবার পড়েছি। কেন জানেন? কেননা এই বইয়ে আমি তাই পেয়েছি জীবন সম্পর্কে আমি যা ভাবি।' অন্য একটি চিঠি এসেছে সাংহাইয়ের এক ছাত্রের কাছ থেকে। সে লিখেছে, 'শব্দের মুক্তির মানে আমি আপনার কাছ থেকে শিখেছি।'

নিজের লেখা গ্রন্থ সম্পর্কে ওরিয়ানা ফাল্লাচির বিবেচনা, 'মানুষকে উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে, উন্নত চিন্তার সহায়ক হতে, একটু বেশি জানায় আগ্রহী করে তুলতে আমি কিছু গল্প আর ভাবনা দিয়েছি মাত্র। আর কী? আমার প্রকাশের একমাত্র পথ লেখা আর তারপর আমার প্রয়োজন। লেখকদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্য, 'ছাপানোর জন্যে ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিমার্জন, পরিমার্জন এবং পরিমার্জন করা উচিত যে কোনো লেখা।' ব্যক্তি ও লেখক সম্পর্কে ওরিয়ানা ফাল্লাচির দীপ্ত উচ্চারণ, 'আমি দেখেছি লেখক হিসেবে বড় অনেককেই ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করা যায় না, তাদের শুভাকাঙ্খী হওয়া সম্ভব হয় না। আমি ব্যক্তিস্বত্ত্বা এবং লেখক স্বত্ত্বাকে আলাদা ভাবে বিচার করতে অক্ষম।'

সাংবাদিকতায় ওরিয়ানা ফাল্লাচি দুইবার সম্মানজনক 'সেন্ট ভিনসেন্ট' পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়াও সাংবাদিকতায় এবং লেখালেখির কারণে তিনি বহু পুরস্কার অর্জন করেন। শিকাগোর কলাম্বিয়া কলেজ তাঁকে 'ডি লিট' সম্মানে ভূষিত করেছে। ওরিয়ানা ফাল্লাচি ইউনির্ভার্সিটি অব শিকাগো, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, হার্ভাড ইউনিভার্সিটি এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে লেকচার দিয়েছেন। ওরিয়ানা ফাল্লাচি’র লেখা বিশ্বের প্রায় ২১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে, এ ম্যান (১৯৭৯), দ্য সেভেন সিনস অব হলিউড (১৯৫৮), দ্য ইউজলেস সেক্স: ভয়েজ অ্যারাউন্ড দ্য ওম্যান, (১৯৬১), পেনেলোপ এট ওয়ার (১৯৬২), লাইমলাইটার্স (১৯৬৩), দ্য ইগোটিস্ট: সিক্সটিন সারপ্রাইজিং ইন্টারভিউস (১৯৬৩), কুয়েল জিওরনো সুলা লুনা (১৯৭০), ইনশাল্লাহ, ইফ দ্য সান ডাইস, ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি (১৯৭৬), লেটার টু অ্যা চাইল্ড নেভার বর্ন, নাথিং অ্যান্ড সো বি ইট, ওরিয়ানা ফাল্লাসি ইন্টারভিসতা ওরিয়ানা ফাল্লাচি (২০০৪), দ্য রেজ অ্যান্ড দ্য প্রাইড (২০০১) এবং দ্য ফোর্স অব রিজন (২০০৪) উল্লেখযোগ্য।

সাংবাদিকতা এবং লেখালেখির জন্যে ফাল্লাচিকে আদালত এবং ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠীদের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। 'দ্য রেজ অ্যান্ড দ্য প্রাইড' গ্রন্থের জন্যে ২০০২ সালের নভেম্বরে সুইস ক্রিমিনাল কোডের ২৬১ নম্বর আর্টিকেল লঙ্ঘণ করার অভিযোগ এনে ওরিয়ানা ফাল্লাচি বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন এক সুইস বিচারক। সেই সঙ্গে ইতালির সরকারের কাছে ফাল্লাচিকে গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে ইতালি সরকার বদ্ধ পরিকর। এই জন্যে সুইস আদালতের অনুরোধ রাখা ইতালির সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ২০০৫ সালের মে মাসে ইউনিয়ন অব ইতালিয়ান মুসলিমস'র প্রেসিডেন্ট আদেল স্মিথ ফাল্লাচির 'দ্য ফোর্স অব রিজন' এ ইসলামকে হেয় করে কিছু কিছু বিষয় উপস্থাপণ করা হয়েছে অভিযোগ এনে বারগ্যামো'র আদালতে মামলা করেন। এর ফলে গত জুন মাসে মামলার তারিখ নির্ধারণ করে তাঁকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক। কিন্তু ফাল্লাসি আদালতে হাজির হতে অস্বীকৃতি জানান। এ প্রসঙ্গে ফাল্লাচি বলেন, 'আমি এখনো জানি না আগামী বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবো কি না। ক্যান্সার খুব বাজে পরিস্থিতি ধারণ করেছে। আমার মনে হচ্ছে জীবন পথের শেষ সীমায় আমি চলে এসেছি। আমি জীবন ভালোবাসি বলেই কেবল বেঁচে থাকতে চাই তা নয়। আমি এই বিচারের ফলাফলও দেখতে চাই। মনে হয় আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে।' ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার সর্বশেষ সুযোগ দেয়া হয় ফাল্লাচিকে। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ব্রেস্ট ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি। জীবনের শেষ বছরটি তিনি কাটিয়েছেন নিউইয়র্কে। সেখানে তিনি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিতসা নিচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি আর টিকে থাকেননি। ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর , ৭৭ বছর বয়সে নিজ শহর ইতালির ফোরেন্সে চিরঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আমৃত্যু সংগ্রামী ওরিয়ানা ফাল্লাচি ।

শারিরীক বাস্তবতায় তিনি আর নাই। কিন্তু সাহসের মূর্ত প্রতীক হিসাবে ওরিয়ানা ফাল্লাচি নিশ্চিতই টিকে থাকবেন আমাদের চিন্তায় আর মননে।

সাংবাদিকতায় ওরিয়ানা ফাল্লাচি :mujib

(ব্লগে ওরিয়ানা ফালাচির নেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়া অনেক কথা হইছে। অনেক নিন্দা করা হইছে তাকে। কিন্তু আমার ধারণা খুব কম ব্লগারই সাক্ষাৎকারটি পড়েছেন। আমি ও ব্রাত্য রাইসু যখন যায়যায়দিন পত্রিকায় কাজ করতাম তখন ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে ওরিয়ানা ফালাচির ওপর একটি সংখ্যা প্রকাশ করছিলাম। সেই সংখ্যায় ফালাচির নেওয়া মুজিবের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হইছিল। সাক্ষাৎকারটি পুরাটা স্থান অভাবে প্রকাশ করা যায় নাই। সাক্ষাৎকারটির যায়যায়দিনে প্রকাশিত অংশের সফট কপি আমার কাছে আছিল। সেইটা এইখানে পোস্ট করলাম। ওরিয়ানা ফালাচি ২০০৬ এর ১৫ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন। সাক্ষাৎকারটি নেয়া হইছিল আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর অনুবাদ করা ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি বই থেকে। ফালাচি সাক্ষাৎকার নিছিলেন ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারিতে।)

রবিবার সন্ধ্যা : আমি কলকাতা হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করেছি। সত্যি বলতে কি, ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী তাদের বেয়নেট দিয়ে যে যজ্ঞ চালিয়েছে তা প্রত্যক্ষ করার পর পৃথিবীতে আমার অন্তিম ইচ্ছা এটাই ছিল যে, এই ঘৃণ্য নগরীতে আমি আর পা ফেলবো না। এ রকম সিদ্ধান্ত আমি নিয়েই ফেলেছিলাম। কিন্তু আমার সম্পাদকের ইচ্ছা যে, আমি মুজিবের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। ভুট্টো তাকে মুক্তি দেয়ার পর আমার সম্পাদকের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল। তিনি কি ধরনের মানুষ? আমার সহকর্মীরা স্বীকৃতি দিল, তিনি মহান ব্যক্তি, সুপারম্যান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দেশকে সমস্যামুক্ত করে গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত করতে পারেন।
আমার স্মরণ হলো, ১৮ ডিসেম্বর আমি যখন ঢাকায় ছিলাম, তখন লোকজন বলছিল, ‘মুজিব থাকলে সেই নির্মম, ভয়ঙ্কর ঘটনা কখনোই ঘটতো না। মুজিব প্রত্যাবর্তন করলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না’। কিন্তু গতকাল মুক্তিবাহিনী কেন আরো ৫০ জন নিরীহ বিহারিকে হত্যা করেছে? ‘টাইম’ ম্যাগাজিন কেন তাকে নিয়ে বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে হেডলাইন করেছে? আমি বিস্মিত হয়েছি, এই ব্যক্তিটি ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে সাংবাদিক অ্যালডো শানতিনিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার দেশে আমি সবচেয়ে সাহসী এবং নির্ভীক মানুষ, আমি বাংলার বাঘ, দিকপাল ... এখানে যুক্তির কোনো স্থান নেই ...।’ আমি বুঝে উঠতে পারিনি, আমার কি ভাবা উচিত।
সোমবার বিকাল : আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এবং আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দ্বিগুণের অধিক। ঘটনাটা হলো, আমি মুজিবকে দেখেছি। যদিও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। সাক্ষাৎকার নেয়ার আগে তাকে একনজর দেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এই কয়েকটা মুহূর্তই আমার চিত্তকে দ্বিধা ও সংশয়ে পূর্ণ করতে যথেষ্ট ছিল। যখন ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করি, কার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল? তিনি আর কেউ নন, মি. সরকার। আমার শেষবার ঢাকা অবস্থানকালে এই বাঙালি ভদ্রলোক আমার দোভাষী ছিলেন। তাকে দেখলাম রানওয়ের মাঝখানে। আমি ভাবিনি, কেন? সম্ভবত এরচেয়ে ভালো কিছু তার করার ছিল না। আমাকে দেখামাত্র জানতে চাইলেন, আমার জন্য তিনি কিছু করতে পারেন কি না? তাকে জানালাম, তিনি আমাকে মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন। তিনি সোজা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন এবং পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা একটা গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম। গেটে মেশিনগানধারী মুক্তিবাহিনীর কড়া প্রহরা। আমরা রান্নাঘরে প্রবেশ করে দেখলাম, মুজিবের স্ত্রী খাচ্ছেন। সঙ্গে খাচ্ছে তার ভাগনে ও মামাতো ভাইবোনেরা। একটা গামলায় ভাত-তরকারি মাখিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মুখে পুরে দিচ্ছে সবাই। এ দেশে খাওয়ার পদ্ধতি এ রকমই। মুজিবের স্ত্রী আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন।
ঠিক তখনই মুজিব এলেন। সহসা রান্নাঘরের মুখে তার আবির্ভাব হলো। তার পরনে এক ধরনের সাদা পোশাক, যাতে আমার কাছে তাকে মনে হয়েছিল একজন প্রাচীন রোমান হিসেবে। পোশাকের কারণে তাকে দীর্ঘ ও ঋজু মনে হচ্ছিল। তার বয়স একান্ন হলেও তিনি সুপুরুষ। ককেশীয় ধরনের সুন্দর চেহারা। চশমা ও গোফে সে চেহারা হয়েছে আরো বুদ্ধিদীপ্ত। যে কারো মনে হবে, তিনি বিপুল জনতাকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি স্বাস্থ্যের অধিকারী।
আমি সোজা তার কাছে গিয়ে পরিচয় পেশ করলাম এবং আমার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলাম। মি. সরকার ভূমিতে পতিত হয়ে মুজিবের পদচুম্বন করলেন। আমি মুজিবের হাতটা আমার হাতে নিয়ে বললাম, ‘এই নগরীতে আপনি ফিরে এসেছেন দেখে আমি আনন্দিত, যে নগরী আশঙ্কা করছিল যে আপনি আর কোনোদিন এখানে ফিরবেন না।’ তিনি আমার দিকে তাকালেন একটু উষ্মার সঙ্গে। একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, ‘আমার সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলো।’
আমার দ্বিধা ও সন্দেহের কারণ উপলব্ধি করা সহজ। মুজিবকে আমি জেনে এসেছি একজন গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী হিসেবে। যখন আমি দম নিচ্ছিলাম, একজন যুবক আমার কাছে এসে বললো, সে ভাইস সেক্রেটারি। বিনয়ের সঙ্গে সে প্রতিশ্রুতি দিল, বিকাল চারটার সময় আমি ‘সরকারি বাসভবনে’ হাজির থাকতে পারলে আমাকে দশ মিনিট সময় দেয়া হবে। তার সঙ্গে যারা সাক্ষাৎ করতে চায় তাদের সঙ্গে সেখানেই তিনি কথা বলেন। বিকাল সাড়ে তিনটায় নগরী কান্ত, নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত মধ্যাহ্নের বিশ্রাম নিচ্ছে। রাস্তায় কাধে রাইফেল ঝুলানো মুক্তিবাহিনী টহল দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে এক মাসেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এখনো তাদের হাতে অস্ত্র আছে। তারা রাত-দিন টহল দেয়। এলোপাতাড়ি বাতাসে গুলি ছোড়ে এবং মানুষ হত্যা করে। হত্যা না করলে দোকানপাট লুট করে। কেউ তাদের থামাতে পারে না, এমনকি মুজিবও না। সম্ভবত তিনি তাদের থামাতে সক্ষম নন। তিনি সন্তুষ্ট এজন্য যে, নগরীর প্রাচীর তার পোস্টার সাইজের ছবিতে একাকার। মুজিবকে আমি আগে যেভাবে জেনেছিলাম, তার সঙ্গে আমার দেখা মুজিবকে মেলাতে পারছি না।
সোমবার সন্ধ্যা : আমি যে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি এটা ছিল একটা দুর্বিপাক। তার মানসিক যোগ্যতা সম্পর্কে আমার সন্দেহ ছিল। এমনকি হতে পারে যে, কারাগার এবং মৃত্যু সম্পর্কে ভীতি তার মস্তিষ্ককে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে? তার ভারসাম্যহীনতাকে আমি আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারি না। একই সময়ে আমি বলতে চাচ্ছি, কারাগার এবং মৃত্যুর ভয় ইত্যাদি... সম্পর্কে কাহিনীগুলো... আমার কাছে এখনো খুব স্পষ্ট নয়। এটা কি করে হতে পারে যে, তাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হলো, সে রাতে সব পর্যায়ের লোককে হত্যা করা হলো? কি করে কি করে এটা হতে পারে যে, তাকে কারাগারের একটি প্রকোষ্ঠ থেকে পলায়ন করতে দেয়া হলো, যেটি তার সমাধিসৌধ হতো? তিনি কি গোপনে ভুট্টোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিলেন? আমি যতো তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, ততো মনে হয়েছে, তিনি কিছু একটা লুকাচ্ছেন। এমনকি তার মধ্যে যে সার্বক্ষণিক আক্রমণাত্মক ভাব, সেটাকে আমার মনে হয়েছে আত্মরক্ষার কৌশল বলে।
ঠিক চারটায় আমি সেখানে ছিলাম। ভাইস সেক্রেটারি আমাকে করিডোরে বসতে বললেন, যেখানে কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোকে ঠাসাঠাসি ছিল। তিনি অফিসে প্রবেশ করে মুজিবকে আমার উপস্থিতি সম্পর্কে জানালেন। আমি একটা ভয়ঙ্কর গর্জন শুনলাম এবং নিরীহ লোকটি কম্পিতভাবে আবার আবির্ভূত হয়ে আমাকে প্রতীক্ষা করতে বললেন। আমি প্রতীক্ষা করলাম, এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা, চার ঘণ্টা; রাত আটটা যখন বাজলো, তখনো আমি সেই অপরিসর করিডোরে অপেক্ষমাণ। রাত সাড়ে আটটায় আমাকে প্রবেশ করতে বলা হলো। আমি বিশাল এক কক্ষে প্রবেশ করলাম। একটি সোফা ও দুটো চেয়ার সে কক্ষে। মুজিব সোফার পুরোটায় নিজেকে বিস্তার করেছেন এবং দুজন মোটা মন্ত্রী চেয়ার দুটো দখল করে বসে আছেন। কেউ দাড়ালো না। কেউ আমাকে অভ্যর্থনা জানালো না। কেউ আমার উপস্থিতিকে গ্রাহ্য করলো না। মুজিব আমাকে বসতে বলার সৌজন্য প্রদর্শন না করা পর্যন্ত সুদীর্ঘক্ষণ নীরবতা বিরাজ করছিল। আমি সোফার ক্ষুদ্র প্রান্তে বসে টেপ রেকর্ডার খুলে প্রথম প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু আমার সে সময়ও ছিল না। মুজিব চিৎকার শুরু করলেন, ‘হারি আপ, কুইক, আন্ডারস্ট্যান্ড? নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। ইজ দ্যাট কিয়ার?... পাকিস্তানিরা ত্রিশ লক্ষ লোক হত্যা করেছে, ইজ দ্যাট কিয়ারÑ আমি বললাম, ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার...।’ মুজিব আবার চিৎকার শুরু করলেন, ‘ওরা আমার নারীদেরকে তাদের স্বামী ও সন্তানদের সামনে হত্যা করেছে। স্বামীদের হত্যা করেছে তাদের ছেলে ও স্ত্রীর সামনে। মা-বাপের সামনে ছেলেকে, ভাইবোনের সামনে ভাইবোনকে ... ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার... আমি বলতে চাই...’
‘তোমার কোনো কিছু চাওয়ার অধিকার নেই, ইজ দ্যাট রাইট?’
‘আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো। কিন্তু একটা বিষয় সম্পর্কে আমি আরো কিছু জানতে চাই।’ বিষয়টা আমি বুঝতে পারছিলাম না। ‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, গ্রেফতারের সময় কি আপনার ওপর নির্যাতন করা হয়েছিল।’
‘নো, ম্যাডাম নো। তারা জানতো, ওতে কিছু হবে না। তারা আমার বৈশিষ্ট্য, আমার শক্তি, আমার সম্মান, আমার মূল্য, বীরত্ব সম্পর্কে জানতো, আন্ডারস্ট্যান্ড?’
‘তা বুঝলাম। কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন যে তারা আপনাকে ফাসিতে ঝোলাবে? ফাসিতে ঝুলিয়ে কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়?’
‘নো, নো ডেথ সেনটেন্স।’
এই পর্যায়ে তাকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো এবং তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন, ‘আমি এটা জানতাম। কারণ ১৫ ডিসেম্বর ওরা আমাকে কবর দেয়ার জন্য একটা গর্ত খনন করে।’
‘কোথায় খনন করা হয়েছিল সেটা?’
‘আমার সেলের ভেতরে।’
‘আমাকে কি বুঝে নিতে হবে যে গর্তটা ছিল আপনার সেলের ভেতরে?’
‘ইউ মিস আন্ডারস্ট্যান্ড।’
‘আপনার প্রতি কেমন আচরণ করা হয়েছে মি. প্রাইম মিনিস্টার?’
‘আমাকে একটা নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছিল। এমনকি আমাকে সাক্ষাৎকারের অনুমতি দেয়া হতো না, সংবাদপত্র পাঠ করতে বা চিঠিপত্রও দেয়া হতো না, আন্ডারস্ট্যান্ড?’’
‘তাহলে আপনি কি করেছেন?’
‘আমি অনেক চিন্তা করেছি, পড়াশোনা করেছি।’
‘আপনি কি পড়েছেন?’
‘বই এবং অন্যান্য জিনিস।’
‘তাহলে আপনি কিছু পড়েছেন।’
‘হ্যা, কিছু পড়েছি’।
‘কিন্তু আমার ধারণা হয়েছিল, আপনাকে কোনো কিছুই পড়তে দেয়া হয়নি।’
‘ইউ মিস আন্ডারস্টুড।’
‘তা বটে মি. প্রাইম মিনিস্টার। কিন্তু এটা কি করে হলো যে, শেষ পর্যন্ত ওরা আপনাকে ফাসিতে ঝোলালো না।’
‘জেলার আমাকে সেল থেকে পালাতে সহায়তা করেছেন এবং তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন।’
‘কেন, তিনি কি কোনো নির্দেশ পেয়েছিলেন?’
‘আমি জানি না। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমি কোনো কথা বলিনি এবং তিনিও আমার সঙ্গে কিছু বলেননি।’
‘নীরবতা সত্ত্বেও কি আপনারা বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন?’
‘হ্যা, আমাদের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আমাকে সাহায্য করতে চান।’
‘তাহলে আপনি তার সঙ্গে কথা বলেছেন?’
‘হ্যা, আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি।’
‘আমি ভেবেছিলাম, আপনি কারো সঙ্গেই কথা বলেননি।’
‘ইউ মিস আন্ডারস্টুড।’
‘তা হবে মি. প্রাইম মিনিস্টার। যে লোকটি আপনার জীবন রক্ষা করলো আপনি কি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন না?’
‘এটা ছিল ভাগ্য। আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি।’
এরপর তিনি ভুট্টো সম্পর্কে কথা বললেন। এ সময় তার কথায় কোনো স্ববিরোধিতা ছিল না। বেশ সতর্কতার সঙ্গেই বললেন তার সম্পর্কে। আমাকে মুজিব জানালেন, ২৬ ডিসেম্বর ভুট্টো তাকে খুজতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে নেয়া। তার ভাষায়, ‘ভুট্টো একজন ভদ্রলোকের মতোই ব্যবহার করলেন। তিনি সত্যিই ভদ্রলোক।’ ভুট্টো তাকে বলেছিলেন, একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। অবশ্য মুজিব ব্লাকআউট ও যুদ্ধ বিমানের গর্জন থেকে বরাবরই যুদ্ধ সম্পর্কে আচ করেছেন। ভুট্টো তার কাছে আরো ব্যাখ্যা করলেন যে, এখন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং তার কাছে কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চান।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘কি প্রস্তাব মি. প্রাইম মিস্টার?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘হোয়াই শুড আই টেল ইউ? এটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। প্রাইভেট অ্যাফেয়ার।’
‘আমার কাছে বলার প্রয়োজন নেই মি. প্রাইম মিনিস্টার, আপনি বলবেন ইতিহাসের কাছে।’
মুজিব বললেন, ‘আমিই ইতিহাস। আমি ভুট্টোকে থামিয়ে বললাম, যদি আমাকে মুক্তি দেয়া না হয়, তাহলে আমি আলাপ করবো না। ভুট্টো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উত্তর দিলেন, আপনি মুক্ত, যদিও আপনাকে শিগগির ছেড়ে দিচ্ছি না। আমাকে আরো দুই বা তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। এরপর ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্কে তার পরিকল্পনা তৈরি করতে শুরু করলেন। কিন্তু আমি অহঙ্কারের সঙ্গেই জানালাম, দেশবাসীর সঙ্গে আলোচনা না করে আমি কোনো পরিকল্পনা করতে পারি না।’ এই পর্যায়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘তাহলে তো কেউ বলতেই পারে যে, আপনাদের আলোচনা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে হয়েছিল।’

‘তা তো বটেই। আমরা পরস্পরকে ভালোভাবে জানি। খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। কিন্তু তা হয়েছিল আমার জানার আগে যে, পাকিস্তানিরা আমার জনগণের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নিপীড়ন করেছে। আমি জানতাম না, তারা বর্বরোচিতভাবে আমার মা-বোনকে হত্যা করেছে।
আমি তাকে থামিয়ে বললাম, ‘আমি জানি মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি জানি।’ তিনি গর্জে উঠলেন, ‘তুমি কিছুই জানো না; আমি তখন জানতাম না যে, তারা আমার স্থপতি, আইনবিদ, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, আমার চাকরকে হত্যা করেছে এবং আমার বাড়ি, জমি, সম্পত্তি ধ্বংস করেছে, আমার...।’

তিনি যখন তার সম্পত্তির অংশে পৌছলেন, তার মধ্যে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যা থেকে তাকে এ প্রশ্নটা করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলাম যে, তিনি সত্যিই সমাজতন্ত্রী কি না? তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যা...’। তার কণ্ঠে দ্বিধা। তাকে আবার বললাম, সমাজতন্ত্র বলতে তিনি কি বোঝেন? তিনি উত্তর দিলেন, ‘সমাজতন্ত্র’। তাতে আমার মনে হলো, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার যথার্থ ধারণা নেই।
এরপর ১৮ ডিসেম্বর হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি রাগে ফেটে পড়লেন। নিচের অংশটুকু আমার টেপ থেকে নেয়া:
‘ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?’
‘ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ঘটনাটি।’
‘ঢাকা স্টেডিয়ামে কোনো ম্যাসাকার হয়নি। তুমি মিথ্যে বলছো।’
‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, আমি মিথ্যেবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও পনেরো হাজার লোকের সঙ্গে আমি হত্যাকা- প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে আমি আপনাকে তার ছবিও দেখাবো। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।’
‘মিথ্যেবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়।’
“মি. প্রাইম মিনিস্টার, দয়া করে ‘মিথ্যেবাদী’ শব্দটি আর উচ্চারণ করবেন না। তারা মুক্তিবাহিনী। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী এবং তারা ইউনিফর্ম পরা ছিল।”
‘তাহলে হয়তো ওরা রাজাকার ছিল যারা প্রতিরোধের বিরোধিতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছে।’
‘মি. প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমাণ করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং কেউই প্রতিরোধের বিরোধিতা করেনি। তারা ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। হাত-পা বাধা থাকায় তারা নড়াচড়াও করতে পারছিল না।’
‘মিথ্যেবাদী।’
“শেষবারের মতো বলছি, আমাকে ‘মিথ্যেবাদী’ বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।”
‘আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে?’
‘আমি নিশ্চিত হতাম যে, ওরা রাজাকার ও অপরাধী। ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং এভাবেই এই ঘৃণ্য হত্যাকা- এড়াতাম।’
‘ওরা ওভাবে করেনি। হয়তো আমার লোকদের কাছে বুলেট ছিল না।’
‘হ্যা তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল। এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলি ছোড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলি ছোড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য।
এরপর কি ঘটলো : যে দুই মোটা মন্ত্রী ঘুমুচ্ছিলেন গোটা সাক্ষাৎকারের সময়টায়, সহসা তারা জেগে উঠলেন। আমি বুঝতে পারলাম না মুজিব কি বলে চিৎকার করছেন। কারণ কথাগুলো ছিল বাংলায়।
সোমবার রাত : গোটা ঢাকা নগরী জেনে গেছে, মুজিব ও আমার মধ্যে কি ঘটেছে। শমশের ওয়াদুদ নামে একজন লোক ছাড়া আমার পক্ষে আর কেউ নেই। লোকটি মুজিবের বড় বোনের ছেলে। এই যুবক নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছে তার মামার কাছে। তার মতে মুজিব ক্ষমতালোভী এবং নিজের সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণাসম্পন্ন অহঙ্কারী ব্যক্তি। তার মামা খুব মেধাসম্পন্ন নয়। বাইশ বছর বয়সে মুজিব হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করেছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতির সচিব হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এছাড়া আর কিছু করেননি তিনি। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, মুজিব একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন। ওয়াদুদের মতে, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণ এটা নয়। আসলে একমাত্র ওয়াদুদের মাকেই মুজিব ভয় করেন। এই দুঃখজনক আচরণের জন্য তিনি পারিবারিকভাবে প্রতিবাদ জানাবেন। সে আরো জানালো, আমার সঙ্গে যে ব্যবহার করা হয়েছে তা সে তার মাকে জানাবে, যাতে তিনি এ ব্যাপারে মুজিবের সঙ্গে কথা বলেন। সে আমাকে আরো বললো, সরকারি দফতরে গিয়ে এ ব্যাপারে আমার প্রতিবাদ করা উচিত এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ প্রেসিডেন্ট খাটি ভদ্রলোক।
মুজিব সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যাবলী তার জন্য বিপর্যয়কর। ১৯৭১ এর মার্চে পাকিস্তানিদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকা-ের কিছুদিন আগে ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকায় এসেছিলেন। ইয়াহিয়া খান যথাশিগগির ফিরে যান। কিন্তু ভুট্টো ঢাকায় রয়ে যান। তাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রাখা হয়। তার অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ৯১১-৯১৩।
ইন্টারকন্টিনেন্টালের সর্বোচ্চ তলায় তখন ভুট্টোর ভূমিকা ছিল নিরোর মতো। নগরী যখন জ্বলছিল এবং এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ চলছিল, ভুট্টো তখন মদপান করছিলেন আর হাসছিলেন। পরদিন সকাল ৭টায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। আমি দেখেছি, যারা এক সময় পাকিস্তানিদের ভয়ে ভীত ছিল, তারা এখন মুজিবকেই ভয় করে। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রচুর কথাবার্তা চলে এ দেশে। কিন্তু সবসময়ই তা বলা হয় ফিসফিসিয়ে, ভয়ের সঙ্গে। লোকজন বলাবলি করে যে, এই সংঘাতে মুজিব খুব সামান্যই হারিয়েছেন। তিনি ধনী ব্যক্তি। অত্যন্ত ধনবান। তার প্রত্যাবর্তনের পরদিন তিনি সাংবাদিকদের হেলিকপ্টার দিয়েছিলেন। কেউ কি জানে কেন? যাতে তারা নিজেরা গিয়ে মুজিবের সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি অবলোকন করে আসতে পারে। এখনো তিনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন, জাতীয়তাবাদের কথা বলেন। তিনি কি তার জমিজমা, বাড়ি, বিলাসবহুল ভিলা, মার্সিডিজ গাড়ি জাতীয়করণ করবেন?
ভুট্টোর সঙ্গে মুজিবের প্রথম সাক্ষাৎ হয় ১৯৬৫ সালে, যখন তিনি ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তকে অরক্ষিত রাখার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেন। একজন নেতা হিসেবে তার মূল্য ছিল খুবই কম। তার একমাত্র মেধা ছিল মূর্খ লোকদের উত্তেজিত করে তোলার ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন কথামালার জাদুকর ও মিথ্যার জাদুকর; কিছুদিন আগে এক জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি বলেছিলেন, করাচির রাস্তাগুলো সোনা দিয়ে মোড়া। তা দিয়ে হাটলে চোখ ধাধিয়ে যায়। অর্থনীতির কিছুই বুঝতেন না তিনি। কৃষি ছিল তার কাছে রহস্যের মতো। রাজনীতি ছিল প্রস্তুতিবিহীন। কেউ কি জানে ১৯৭০ এর নির্বাচনে তিনি কেন বিজয়ী হয়েছিলেন? কারণ সব মাওবাদী তাকে ভোট দিয়েছিল। সাইকোনে মাওবাদীদের অফিস বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং তাদের নেতা ভাসানী আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জনগণকে যদি আবার ভোট দিতে বলা হয়, তাহলে মুজিবের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্নতর হবে, যদি তিনি বন্দুকের সাহায্যে তার ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিতে না চান। সেজন্যই তিনি মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্রসমর্পণের নির্দেশ দিচ্ছেন না এবং আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, রক্তপিপাসু কসাই, যে ঢাকা স্টেডিয়ামে হত্যাযজ্ঞ করেছিল, সেই আবদুল কাদের সিদ্দিকী তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা। ইনডিয়ানরা তাকে গ্রেফতার করেছিল; কিন্তু মুজিব তাকে মুক্ত করেন।
এখন আমরা গণতন্ত্রের কথায় আসতে পারি। একজন মানুষ কি গণতন্ত্রী হতে পারে, যদি সে বিরোধিতা সহ্য করতে না পারে? কেউ যদি তার সঙ্গে একমত না হয়, তিনি তাকে ‘রাজাকার’ বলেন। বিরোধিতার ফল হতে পারে ভিন্নমত পোষণকারীকে কারাগারে প্রেরণ। তার চরিত্র একজন একনায়কের, অসহায় বাঙালিরা উত্তপ্ত পাত্র থেকে গনগনে অগ্নিকু-ে পতিত হয়েছে। বাঙালি রমণীদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের সম্পর্কে কথা না বলাই উত্তম। তিনি নারীদের পাত্তাই দেন না...।
বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট আমাকে আবার মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। সব ব্যবস্থা পাকা।
প্রেসিডেন্ট যে প্রচেষ্টা করেছিলেন তা খুব একটা সফল হয়নি। তিনি দুজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তার নির্দেশ পালন করা হয়। মুজিবের কাছে একটা হুঙ্কার ছাড়া তারা আর কিছু পায়নি। তবে এবার একটা করিডোরের বদলে একটা কক্ষে অপেক্ষা করার অনুমতি পেলাম। আমি বিকাল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। একজন বয় আমার চায়ের কাপ পূর্ণ করে দিচ্ছিল এবং এভাবে আমি আঠারো কাপ চা নিঃশেষ করলাম। উনিশ কাপের সময় আমি চা ফোরে ছুড়ে ফেলে হেটে বেরিয়ে এলাম। আমাকে অনুসরণ করে হোটেলে এলো মুজিবের সেক্রেটারি ও ভাইস সেক্রেটারি। তারা বললো, মুজিব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
পরদিন সকালে ঠিক সাতটায় আমি হাজির হলাম এবং সকাল সাড়ে নয়টায় মার্সিডিজযোগে মুজিবের আগমন পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। একটা কথাও না বলে তিনি অফিসে প্রবেশ করলেন। আমিও অফিসে ঢুকলাম। আমার দিকে ফিরে তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘গেট আউট’। আমি কক্ষ ত্যাগ করতে উদ্যত। তিনি বললেন, ‘গেট ইন হিয়ার।’ আমি ফিরলাম এবং তখনই তিনজন লোক পোস্টার আকৃতির একটি ছবি নিয়ে এলো। দেখে তিনি বললেন, ‘চমৎকার’। এরপর তিনি বললেন, এই মহিলা সাংবাদিককে দেখাও। আমি ‘চমৎকার’ শব্দটি উচ্চারণ করলাম। এ ছিল এক মারাত্মক ভুল। তিনি বজ্রের মতো ফেটে পড়লেন। তিনি ক্ষিপ্ত। ছবিটি ফোরে ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা চমৎকার নয়’। আমি কিছু না বুঝে নিশ্চুপ থাকলাম।
আমি তার উত্তেজনা হ্রাস করতে সক্ষম হলাম। যেহেতু আমি ভুট্টোর সঙ্গে তার সত্যিকার সম্পর্কটা খুজে পেতে চাই, সে জন্য ভুট্টো সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। নামটা বলার মুহূর্তেই তিনি জ্বলে উঠলেন এবং বললেন, তিনি শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে চান। আমি প্রশ্ন করলাম, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গকে যুক্ত করার সম্ভাবনা আছে কি না?’ খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়ে তিনি বললেন, ‘এ সময়ে, আমার আর কোনো আগ্রহ নেই।’ এই বক্তব্যে ইন্দিরা গান্ধীকেও বিস্মিত হতে হবে যে, মুজিব কলকাতা করায়ত্ত করতে চায়। আমি বললাম, তার মানে আপনি বলতে চান, অতীতে আপনার আগ্রহ ছিল এবং ভবিষ্যতে পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা আছে।’ ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করলেন, আমি তাকে একটা ফাদে ফেলতে চাচ্ছি। নিজের ভুল সংশোধন করার বদলে তিনি টেবিলে মুষ্টাঘাত করে বলতে শুরু করলেন, আমি সাংবাদিক নই বরং সরকারি মন্ত্রী। আমি তাকে প্রশ্ন করছি না, দোষারোপ করছি। আমাকে এখনই বের হয়ে যেতে হবে এবং আবার আমি যেন এ দেশে পা না দিই।
এই পর্যায়ে আমি নিজের ওপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম এবং আমার মাঝে উত্তেজনার যে স্তূপ গড়ে উঠেছিল তা বিস্ফোরিত হলো। আমি বললাম, তার সবকিছু মেকি, ভুয়া। তার পরিণতি হবে খুবই শোচনীয়। যখন তিনি মুখ ব্যাদান করে দাড়ালেন, আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম এবং রাস্তায় প্রথম রিকশাটায় চাপলাম। হোটেলে গিয়ে বিল পরিশোধ করলাম। স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে যখন বেরুতে যাচ্ছি, তখন দেখলাম মুক্তিবাহিনী নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা এ কথা বলতে বলতে আমার কাছে এলো যে, আমি দেশের পিতাকে অপমান করেছি এবং সেজন্য আমাকে চরম মূল্য দিতে হবে। তাদের এ গোলযোগের মধ্যে পাচজন অস্ট্রেলিয়ানের সাহায্যে পালাতে সক্ষম হলাম। তারা এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে প্রবেশ করছিল। এয়ারপোর্টে দুজন ইনডিয়ান কর্মকর্তা আমাকে বিমানে উঠিয়ে নিলেন এবং আমি নিরাপদ হলাম।
(২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২)
ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরী থেকে
অনুবাদ : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু